আমার জীবনের প্রথম এ্যালম্নাই

খোন্দকার জিল্লুর রহমান
সংবাদটা শোনার পর থেকেই মনের ভিতর আনন্দ লাগছে। বুঝতে পারলাম জীবনে বহুদিনের জমিয়ে রাখা স্বপ্ন পূরণ হতে যাইতেছে। বুঝতে পারতেছি না যে কিভাবে কি করব।
অন্যান্য দিনের চেয়ে একটু তাড়াতাড়ি (রাত ৮টার দিকে) বাসায় চলে আসি। নিজের পত্রিকা অর্থনীতির ৩০ দিন এর অফিস, তাই একটু টেনশন কম। বাসায় এসে পরিধেয় কাপড় চোপড় পরিবর্তন করে হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসি। রাতে খাবার অভ্যাস একটু কম থাকলেও তড়িগড়ি করে একটু হালকা খাবার খেয়ে নেই। ঢাকার বাসাবোতে ছোট্ট একটা বাসায় দুই মেয়েকে নিয়ে সংসার। ২০১৭ সালের ২৬শে জুলাই খুব ভোরে আমার পরিবার অভিমান করে আমার থেকে চিরবিদায় নিয়ে যায়, তাকে কখনো ফেরাতে পারিনি। আসলে জীবনটা এমনই, ভাগ্যের জন্য দুর্ভাগ্যকেতো দায়ী করা যায় না, যাক সে কথা। এ্যালমনাই এর কথাটা কিভাবে মেয়েদের বলব আর ধৈর্য রাখতে পারি না বিড়বিড় করতে করতে মেয়েদের রুমে পায়চারি করতে থাকি। আমার পায়চারি করতে দেখে মেয়েরা বলল বাবা তোমার কি হয়েছে, বিড়বিড় কর কেন। বললাম আমার স্কুলে এ্যালুমুনিয়াম (এ্যালমনাই) হবে। মেয়েরা একই সাথে বলে উঠল, বাবা কি হবে আমি আবার একই কথা বল্লাম। মেয়েরা হাসতে হাসতে পড়ে যাওয়ার অবস্থা বাবা তুমি যে কি বল। ইংরেজিটা শব্দটা এ্যালুমুনিয়াম নয় এটা হল এ্যালম্নাই, অর্থাৎ প্রাক্তন ছাত্র ছাত্রি পুনঃমিলনী। আমি এবার মুছকি হেসে বললাম ঐ হল এ্যালুমুনিয়াম আর এ্যালম্নাই এক কথাই। আসলে আমি মেয়েদের নিয়ে পারিবারিকভাবে বন্ধুর মত সময় কাটাই। বড় মেয়ের ডাক্তারি পড়া প্রায় শেষের পথে, ছোট মেয়ে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজে বিজ্ঞান ২য় বর্ষের ছাত্রি। অনেক সময় কিছু কিছু শব্দের ব্যতিক্রম বলে বলে মেয়েদের সাথে আনন্দ করি, মেয়েরাও অনেক সময় ব্যতিক্রম কিছু বলে আমাকে আনন্দ দেয় আর বলে তুমিইতো শিখিয়েছ। এ্যালমনাই এর কথা শুনে বড় মেয়ে বলল বাবা তুমি যাবে না, আমি না বলতেই দুই মেয়ে একই সাথে বলল তুমি অবশ্যই যাবে এবং তোমাকে যেতেই হবে। আমার মুখে সহপাঠীদের অনেক গল্প তারা শুনেছে। শুনেছে স্কুলের যে কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরান তেলওয়াতের পর আমার ত্রিবিটক পাঠ করা, এক সহপাঠীর কবর কবিতা আবৃত্তিতে আমার নাতির ভূমিকায় অভিনয় করাসহ স্কুলমাঠে ফুটবল খেলার সময় আমি সবছেয়ে ছোট ছাত্র হওয়ার কারণে পুরু খেলার টাইমে দুই একবার ছাড়া আমার পায়ে বল না লাগার কথায় সহপাঠীদের হাসাহাসিসহ এমন অনেক আনন্দের গল্প।

বর্তমান প্রধান শিক্ষক : এ কে এম আবুল কালাম আজাদ

১৫ই সেপ্টেম্বর ২০১৮ সকালে আমার ছোট বোন বিএনপির সাবেক এমপি এডভোকেট ফেরদৌস আক্তার ওয়াহিদা রিনার পল্টনের বাসায় আমরা ৪ ভাই বোন একত্রিত হই। সবার ছোট বোন দেশের বাইরে থাকাতে ৫ জনের টিম গঠন করতে পারি নাই ৪ জন গাড়িতে উঠে বসি, পেট্রোল পাম্প থেকে গাড়িতে ফুয়েল লোড করে যাত্রা শুরু করি যাতে পথে কোন অসুবিদা না হয়। গাড়িতে বসার ব্যাপারটাও বেশ আনন্দের, আমি সামনের সিটে ড্রাইবারের পাশে বসার কথা বলতেই ছোটভাই মশিহুর রহমান বলে উঠল, আপনি স্কুলের পথ চিনবেন না আমি সামনের সিটে বসে ড্রাইবারকে পথ চিনিয়ে নিয়ে যাব, আমার অনেক অভিজ্ঞতা আছে, যাক আমরা তিনজন পেছনে গিয়ে বসি, এমপি বোন বলল থাক মেজভাই আপনে আসতে বসবেন, ছোট ভাই আস্তে আস্তে বলল না না যারযার সিটে সে সেই বসবে। সকালে আল্লার নাম নিয়ে গাড়ি ছাড়ল। গাড়ি গুলিস্তান ফ্লাইওভার দিয়ে শনিআখড়া হয়ে কাঁচপুর ব্রিজ পার হচ্ছে আর গান বাজছে, তোমার খোলা হাওয়া.. লাগিয়ে প্রাণে.. মনযে আমার র…। যানজট বিহীন রাস্তা গাড়ি দ্রুত চললেও আনন্দ আর উদ্বিগ্নতায় দূরত্বটা মনে হয় বেড়ে গেছে, গাড়ির এসিটা ফুল পাওয়ারে চললেও গন্তব্যে পৌঁছানোর আনন্দে সবাই গেমে যাচ্ছি, মনে হয় এসিটা কাজ করছে না। সকালে নাস্তা না করে রওনা দেওয়ায় কুমিল্লা ক্যাণ্টনমেন্টের একটু আগে হোটেল মিয়মিতে গাড়ি দাঁড় করাল। সবাই নেমে হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা সেরে নেই। একটা আনন্দঘন সময় কাটছে। গাড়ি চলছে বিশ্বরোড দিয়ে চাঁদপুর রোডে, বিজয় নগর, লালমাই, মগবাড়ি হয়ে গ্রামের রোড দিয়ে স্কুলের দিকে। সময় তখন ১০টা পেরিয়ে আধাঘন্টা বেশি, কি আর করা বর্ষার কারণে রাস্তা ভাঙ্গা, ২/৩ বার গাড়ি থেকে নামতে হয়েছে কিন্তু তবুও কারো কোন বিরক্তির কারণ নাই। দূর থেকে প্যান্ডেল দেখেই বুঝলাম স্কুলের নিকটে এসে গেছি। জীবনের লম্বা সময় সহপাঠীদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ কম হওয়ায় সবকিছুই একটু নতুন আর রোমান্টিকই মনে হচ্ছে।
গাড়ি এসে থামল স্কুলের গেটে, সবকিছু খুবই সুন্দরভাবে সাজানো গুছানো মনে হল। গাড়ি থামতেই সিকিউরিটি এসে দরজা খুলে ফুলের শুভেচ্ছা দিয়ে প্যান্ডেলের ভিতর নিয়ে বসার ব্যবস্থা করে দিল । আমাদের গাড়ি চলে গেল পার্কিংয়ে। সব এত সুন্দর সাজানো গুছানো দেখে জীবনের মূল্যবোধের কথা মনে পড়ে গেল। মনেমনে প্রাউড ফিল করলাম যে আমি এই স্কুলেরই একজন প্রাক্তন ছাত্র। পুরাতন ও নতুনদের বিশাল উপস্থিতিতে এত আনন্দগণ পরিবেশ সৃষ্টি হয় যা না দেখে বুঝার কোন উপায় ছিল না।
কোরান তেলাওআত এবং গীতা পাঠের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হল, জাতীয় সঙ্গিত, পরিচয় পর্ব ও অতিথিদের বরণ করার মাধ্যমে সঞ্চালক অত্যন্ত সুন্দর আর মধুর কণ্ঠস্বরের অধিকারী একজন প্রাক্তন ছাত্র সফিকুল ইসলাম শামীম অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করে যাচ্ছেন হৃদয়ের আবেগ দিয়ে। আমার সহপাঠীদের চারজন এই স্কুলের শিক্ষকতায় আছে দেখে মনে হল সামাজিক দায়বদ্ধতার সবটুকুই নিজ দায়িত্বে পালন করছে। গরমের তীব্রতাও যেন আজকের এই মিলন মেলার নিকট হার মেনেছে। স্টেজ অলংকৃত করে আছেন যেকজন মনে হল এরা সবাই যেন এদেশের একএকটা ঊজ্জ্বল নক্ষত্র। আছেন নুরুল ইসলাম মিলন এমপি, এডভোকেট ফেরদাউস আকতার ওয়াহিদা সাবেক এমপি, মো: আব্দুল হক, (দেশের একজন স্বনামধন্য ব্যবসায়ী) তফাজ্জল হোসেন মজুমদর, এডভোকেট রুস্তুম আলি মজুমদার এবং আমার সহপাঠীবন্ধু ও প্রিয় মানুষ, যার ব্যবস্থাপনায় স্কুলে এই মহারণের আয়োজন সেই স্মরণীয় বরণীয় ব্যক্তি এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক এ কে এম আবুল কালাম আজাদ। যার সুদূর প্রসারি পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় এমন একটি মিলন মেলার সফল বাস্তবায়ন তার প্রতি এই শ্রদ্ধাবোধ যেন আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সহপাঠীদের সাথে দীর্ঘসময় পর দেখার যে কি আনন্দ বেদনা তার প্রকাশ আমাকে ষ্টেজে ডেকে বন্ধুবর কালাম, মালেক, জুলফু, মতিন, মোহম্মদউল্লাসহ সকলের সাথে বুকে বুক মিলিয়ে কোলাকোলি আনন্দ আর আবেগের কান্না যেন একটা ভাষাহীন পরিবেশ কিছুক্ষণের জন্য হলেও অনুষ্ঠানে আগত সকলের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। আজ এই সৃষ্টি সুখের ঊল্লাস শিলমুড়ী রাজ রাজেশ্বরী উচ্চ বিদ্যালয় এর প্রাক্তন ছাত্র ছাত্রী মিলনমেলা-২০১৮ সৌহার্দ্য এর বাস্তব রূপ। আনুষ্ঠানিক পর্বশেষে সাংস্কৃতিক অনষ্ঠানের পূর্বে দুপুরে খাবার টেবিলে আমাদের জন্য সহপাঠীদের সুন্দর আয়োজন এবং আলদাভাবে দেখাশোনা খাবার আনন্দকে বেশ তৃপ্তিদায়ক করেছে যেন পারিবারিক আনন্দ। সকল পর্ব শেষে বিদায়ের পালা, মন থেকে বিদায় নিতে না পারলেও বাস্তবে বিদায় নিতে হয়েছে চোখের নোনাজলে নানা রঙ্গের ছবি আঁকতে আঁকতে। ইচ্ছে হচ্ছিল যেন আরো কয়েকটা দিন এভাবে কাটিয়ে দেই। আমাদের গাড়ি গন্তব্যের পথে যাত্রা শুরু, গাড়িটা যেন বলছে ‘যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়’…। আমি পেছনে পিরে তাকিয়েছি আর মনে মনে বলেছি,
গিয়ছি চলিয়া ধীরে। পু®পশূন্য দিগন্তের পথে,
তোমাদেরই মনে পড়ে, পারি না ভুলিতে কোনমতে…।
লেখক : শিলমুড়ী স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র