অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) আসন্ন ২০২০-২০২১ অর্থ বছরের বাজেটে অন্তর্ভূক্তির জন্য বাজেট প্রস্তাবনা প্রনয়ন করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ সরকারের বিভিন্ন মহলে পেশ করেছে। বিসিআই সভাপতি, জনাব আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ), বিসিআই এর বাজেট প্রস্তাবনার সংক্ষিপ্তসার নিম্নে পেশ করেন-
বিসিআই সভাপতি বলেন,
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) দেশের শিল্প খাত প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র জাতীয় সংগঠণ। বিসিআই তরুণ শিল্প উদ্যোক্তা সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়নের প্রসার, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা এবং বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র বিমোচন কাজ করে চলেছে।
মুজিব শতবর্ষ ২০২০-২০২১ এর অন্যতম লক্ষ্য অনুযায়ী সকল তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে এবং স্বাবলম্বী তরুণ সমাজ গঠন করতে ‘তরুণ উদ্যোক্তা নীতি, একটি দক্ষ ও কর্মঠ যুবসমাজ তৈরি করতে প্রতি উপজেলায় যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে স্বল্প ও অদক্ষ তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। মাইক্রো ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতে তরুণ শিল্প উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার জন্য নিম্নলিখিত সুপারিশ করা হল-
১. তরুণদের উদ্যোগে অর্থায়নের জন্য বাজেটে পুনরায় বিশেষ তহবিল গঠন এবং সুষ্ঠু নীতিমালা প্রনয়নের মাধ্যমে বিতরন নিশ্চিত করা;
২. বিনা জামানতে এবং সর্বনিম্ন সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা, যা বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্ন বিদেশি ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানকে নিশ্চয়তা প্রদান করা;
৩. রপ্তানী বহুমুখীকরনের অংশ হিসেবে বিশেষ করে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কৃষি ভিত্তিক শিল্প খাতকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চিহ্নিত করে এর উন্নয়নে বিশেষ শুল্ক-কর সুবিধা প্রদান;
৪. ২০ কর্ম দিবসের মধ্যে সকল প্রকার ইউটিলিটি সংযোগ প্রদান এবং রেয়াতি হারে সংযোগ ও সরবরাহের সংস্থান করা;
৫. মাইক্রো ও ক্ষুদ্র শিল্প এবং তরুণ শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য নূন্যতম ৫ বছর কর অবকাশ প্রদান করা পরবর্তিতে বিশেষ কর সুবিধা প্রদান করা;
৬. কোন শিল্প প্রতিষ্ঠানে শতকরা ৫% শারিরিক প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের শ্রমিক নিয়োগ করলে বিশেষ কর সুবিধা;
৭. বেজা, বিসিক ও অন্যান্ন সেক্টরে তরুণ শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ মূল্যে জমি বরাদ্দ রাখা;
৮. প্রতিষ্ঠান আধুনিকায়নের জন্য সব ধরনের বিনিয়োগে বিশেষ কর সুবিধা;
৯. স্কিল ডেভেল্পমন্টের জন্য সব ধরনের বিনিয়োগ করমূক্ত রাখা;
১০. অপ্রচলিত বা নতুন পণ্য রপ্তানীর ক্ষেত্রে বিশেষ কর সুবিধা ও নগদ প্রনোদনার ব্যবস্থা করা।
১১. ক্ষুদ্র শিল্প এবং নারী উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে খাত ভিত্তিক যৌথ প্রতিষ্ঠানগুলিকে বন্ডেড-ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রদান করা;
১২. রপ্তানিপণ্য প্রস্তুতকরণে ব্যবহৃত আমদানিকৃত এবং দেশীয় উপকরণের উপর পরিশোধিত সকল শুল্ক ও কর মওকুফ গণ্য করে ফেরত প্রদান করা;
লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের উন্নয়নে বিসিআই-এর সুপারিশ :
ক্স কাঁচামাল আমদানিতে উৎসে কর প্রত্যাহার এবং উৎপাদিত পন্যের উপর উৎসে কর প্রত্যাহার করা;
ক্স স্থানীয় উৎপাদিত মূলধন যন্ত্রপাতি ও খুচরা যন্ত্রাংশ বিক্রয় ভ্যাট এবং বিক্রয় কর প্রত্যাহার করা;
ক্স সমস্ত ইউটিলিটি (বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি) বিল থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার;
ক্স সাব-কন্ট্রাক্টিং বিধি: পিপিআর ২০০৮ এ অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবর্তনসমূহ যা সরকারী মন্ত্রনালয়, বিভাগ এবং সেক্টর কর্পোরেশনগুলিকে সাব-কন্ট্রাক্টিং সিস্টেমের অধীনে লাইট ইঞ্জিনিয়রিং এসএমইগুলি থেকে তাদের প্রয়োজনীয়তার কমপক্ষে ২০% সংগ্রহ করতে বাধ্য থাকবে;
ক্স বিশেষ ক্রেডিট ফান্ড স্কিম ডেভেলপমেন্ট করা;
ক্স লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে এসএমই ও স্টার্ট-আপ এর উন্নয়নে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল;
আমদানী শুল্ক
ক্স সকল মূসক নিবন্ধিত শিল্প প্রতিষ্ঠানের মুসক ফরমে ঘোষিত সমূদয় মূলধনি যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশের উপর আরোপতি ১% এর অতিরিক্ত সকল প্রকার শুল্ক-করাদি মওকুফ করা;
ক্স সকল মূসক নিবন্ধিত শিল্প প্রতিষ্ঠানই যেন তাদের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে সরকার প্রদত্ত সুবিধা ভোগ করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। সিকেডি অবস্থায় আমদানি করে সংশ্লিষ্ট পণ্যের সংযোজনকারি প্রতিষ্ঠাণ ব্যতিত ভ্যাট রেজিস্টার্ড সকল শিল্প প্রতিষ্ঠান কর্তৃক মূসক-দলিলে অন্তর্ভুক্ত উপকরণ এবং কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ৩% এর অতিরিক্ত শুল্ক মওকুফ করার অনুরোধ করছি। যে সমস্ত পণ্যে সম্পূরক শুল্ক প্রযোজ্য আছে শিল্পখাতে সে সমস্ত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে নির্ধারিত সম্পূরক শুল্ক হারের ৫০% প্রযোজ্য হবে মর্মে বিধান করা;
ক্স যে সকল ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে তার একটি জরীপ পরিচালনা করতে হবে। ঐ সকল বন্ধ ফ্যাক্টরি -এর অনুকুলে প্রদত্ত ইড়হফ খরপবহপব বাতিল করা;
ক্স আন্ডার ইনভয়েস এবং মিস ডিক্লারেশন-এর মাধ্যমে পণ্য আমদানি বন্ধের ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য নিয়মিতভাবে মূল্যের খাত ভিত্তিক ডাটা আহরণ এবং সকল বন্দরে স্ক্যানার ও স্বয়ংক্রিয় পরিমাপক স্থাপন করা;
মূল্য সংযোজন কর (মূসক)
ক্স মূলধনী যন্ত্র আমদানী পর্যায়ে যেহেতু মূসক অব্যাহতি দেয়া আছে সেহেতু স্থানীয় ভাবে উৎপাদিত মূলধনী যন্ত্র এর উপর মূসক আরোপ রহিত করা ;
ক্স শিল্প খাতের বার্ষিক টার্নওভারের ঊর্দ্ধসীমা বর্তমানের ৩ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৬ কোটি টাকায় উন্নীত করে শিল্প খাতে টার্ন-ওভার কর ৪% থেকে ৩% নির্ধারণ করা অত্যাবশ্যক। টার্নওভার করের সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী অর্থবছরের আয়কর নির্ধারণকালে অনুমোদিত টার্নওভারের ভিত্তিতে দাখিলপত্রে প্রদর্শিত টার্নওভারের পরিমাণ হিসাবে গন্য করা অত্যাবশ্যক।
ক্স উপকরন কর রেয়াত গ্রহনে অসমর্থ ব্যক্তির করযোগ্য পন্য উৎপাদন, ও সরবরাহের ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন ৩০% হিসাবে গননা করে তার উপর ১৫% অর্থাৎ সরবরাহ মূল্যের উপর ৪.৫% হারে মূসক আরোপ করা অত্যাবশ্যক।
ক্স উপকরন কর রেয়াত গ্রহনে অসমর্থ ব্যক্তির করযোগ্য সেবার ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন ৪০% হিসাবে গননা করে তার উপর ১৫% অর্থাৎ সরবরাহ মূল্যের উপর ৬ % হারে মূসক আরোপ করা অত্যাবশ্যক।
ক্স আমদানীকৃত কাঁচামালের উপর আরোপিত ৫% আগাম কর প্রত্যাহারের করা আবশ্যক।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর, মূসক ও শুল্ক সম্পর্কিত সকল অভিযোগ, বিরোধসহ মামলা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির আওতায় আনার ব্যবস্থা গ্রহন করা আবশ্যক।
রপ্তানী খাত সংক্রান্ত প্রস্তাবাবলী
১। রপ্তানী খাতে উৎসে কর ০.০১% এ নির্ধারণ করার প্রস্তাব করছি।
২। সকল রপ্তানী খাতে করপোরেট কর হার সমতায়ন না করে বিদ্যমান বৈষম্য বহাল রাখা হয়েছে যা কর নীতির পরিপন্থী। আমরা সকল রপ্তানি খাতের করপোরেট কর হার সমান ১০% হারে ধার্য্য করার প্রস্তাব করছি।
আয়কর:
(১) “উন্নয়নশীল দেশগুলোতে করমুক্ত আয়সীমা সাধারনত মাথাপিছু আয়ের সমান বা এর কম হয়ে থাকে । কিন্তু বাংলাদেশে করমুক্ত আয়ের সীমা প্রায় দ্বিগুণের মত” আমরা এই করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করছি ।
(২) শিল্প ক্ষেত্রে মূসক ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশী। শিল্প খাত রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মূদ্রা আয় এবং আমদানি হ্রাসের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করে দেশের অর্থনীতিতে অধিক ভূমিকা রাখে বিধায় তাদের প্রণোদনা প্রদান এবং ট্রেডিং কোম্পানীর তুলনায় নিম্নহারে কর্পোরেট কর আরোপ করার প্রস্তাব করছি ।
(৩) সুষম আঞ্চলিক উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রগতি অব্যাহত রাখার জন্য শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রাম কেন্দ্রীক না করে দেশের উত্তরাঞ্চল সহ প্রত্যন্ত ও অনুন্নত অঞ্চলে বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন উৎসাহিত করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য বিশেষ রেয়াতি সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করছি।










