আজাহার খান:
রাত এগারোটায় রাজশাহীগামী পদ্মা এক্সপ্রেসে উঠে আমার সিট নম্বর ধরে এগিয়ে গেলাম, দেখি জানালার পাশে আমার সিটে মেয়েটি বসা। আমার কাছে একটু ইতস্তত লাগলো, কিভাবে বলি ওটা আমার সিট। বললাম, তোমার সাথে কেউ আছে? ও গম্ভীর হয়ে অন্য দিকে মুখ করে জবাব দিল, না। ওর মুড দেখে আমি আর বলতে পারলাম না যে, ওটা চমার সিট, অগত্যা পাশের সিটে বসে পড়লাম। ট্রেন চলতে শুরু করলো।
বর্তমানে যে যুগ পড়েছে তাতে মানুষ বই পড়া বলতে গেলে ছেড়েই দিয়েছে। এখন হাতে হাতে মোবাইল আর কানে হেডফোন থাকা চাই , কিন্তু এই মেয়েটি দেখলাম একটু ব্যতিক্রম, ট্রেন ছাড়ার পরে কাকে যেন ফোন দিল, সম্ভবত মাকে ফোন দিয়ে জানিয়ে দিল, মা ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে, তুমি কোনো টেনশন করো না, তুমি এখন ঘুমাও, আমি পৌঁছে তোমাকে কল দিব। হতে পারে এটা আমার নেহাৎ কল্পনা । মেয়েটি এবার মোবাইলটি ব্যাগে রেখে দিয়ে একটা বই বের করে পড়তে শুরু করল। পাতা ওলটাচ্ছে আর পড়ছে, সেই সাথে চোখ মুখের নানা অভিব্যক্তি প্রকাশ করছে। একবার দেখলাম টিস্যু দিয়ে চোখ মুছছে, আমি তাকিয়ে তাকিয়ে তার অভিব্যক্তি লক্ষ করছি। বইটির প্রতি মেয়েটির একাগ্রতা আর অভিব্যক্তি দেখে বইটির নাম দেখার জন্য বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছি।
এবার বইটি দেখে আমি চিনতে পারলাম, একটু
অবাক হলাম, এই মেয়ে এই বই পেল কোথায়?
আমার জানতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু মেয়ের যে মুড জিজ্ঞেস করতে হেজিটেশন ফিল করছি। প্রায় ঘন্টা দুই পড়ে মেয়েটি বই বন্ধ করল, এবার ব্যাগে রেখে দিবে। এখনই জিজ্ঞেস করতে হবে, আমি বললাম, মামুনি একটা কথা বলবো? মেয়েটি গম্ভীর হয়ে জবাব দিল, বলেন, কী বলবেন? আমি বললাম বইটি তুমি কোথায় পেলে?
মেয়েটি উত্তেজিত হয়ে বললো, কেনো? কি বলতে চান? বইটি আপনার? আমি চুরি করেছি? আমি চোর?
আমি স্মিথ হাসি মুখে বললাম, আহা ক্ষেপে যাচ্ছ কেন, এমনি জিজ্ঞেস করলাম।
ও এবার বললো, আমি প্রথম থেকেই লক্ষ্য করছি
আপনার চোখ সবসময় আমার দিকে, এই বয়সে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে কি দেখেন? লজ্জা করেনা আপনার? দেখতে তো ভদ্রলোক বলেই মনে হয়।
এরই মধ্যে আশপাশের দুই তিন জন যাত্রি ঘটনা জানার জন্য দাঁড়িয়ে গেল। একজন যাত্রী জিজ্ঞেস করল, আঙ্কেল কী হয়েছে?
আমি একটু লজ্জা পেলেও অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বললাম, দেখুন আমি একজন লেখক, বছর খানেক ধরে লিখছি, তবে লেখক হিসেবে তেমন একটা পরিচিত নই, এই মেয়েটি যেই বইটা পড়ছিল ওইটি আমারই লেখা, এই বছরের বইমেলায় প্রকাশিত প্রথম বই “টান”। মেলায় পরিচিত জনেরা ছাড়া তেমন একটা বিক্রি হয়নি, তাই জানতে চেয়েছিলাম বইটি ও কোথায় পেয়েছে? আর ও যখন বইটি পড়ছিল, তখন ওর চোখ মুখের অভিব্যক্তি লক্ষ করছিলাম আর বইটির নাম দেখার চেষ্টা করছিলাম।
দাঁড়িয়ে যাওয়া একজন যাত্রী বললেন, এই মেয়ে তুমি কেমন মানুষ, মুরুব্বিদের সম্মান করতে জান না?
মেয়েটি দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল, স্যার আমাকে মাফ করবেন, আমি রাজশাহী ভার্সিটিতে পড়ি, প্রায়ই একা যতায়াত করতে হয়। পুরুষ মানুষ পাশে বসলেই প্রথমে খাতির জমাবে তারপরে ইচ্ছে করে এসে গায়ে পড়বে, সুযোগ নিতে চাইবে। আমার বান্ধবী রুয়েটে পড়ে, ওর কাছ থেকে বইটি পেয়েছি। বুঝতে আর বাকি রইলো না আমার মেয়ে তো রুয়েটেই পড়ে।











