ব্রোকার হাউস মালিকদের অনৈতিক মনোভাব বাজার ধ্বংশের অন্যতম কারন।
খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
ব্যবসা বলেন আর চাকুরিই বলেন অথবা যেকোন কাজের প্রতি অনিশ্বয়তায় ভুগতে ভুগতে মানুষ এক সময় ঐ কাজের প্রতি আস্তা হারিয়ে ফেলে। মানুষ কতবার ঘুরে দাড়াতে পারে বলে প্রশ্ন করা হলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যার যার মনের কষ্ট, তিক্ততা, হতাসা, পারিবারিক বিচ্ছেদ এবং সয্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নেয়াসহ নানা ধরনের অনিশ্চয়তায় পর্যবসিত হয়। এসবের মধ্যে অন্যান্য কাজের বা সম্পদের লস হওয়ার ঘাত প্রতিঘাত অনেকটা সয্য করতে পারলেও সরাসরি আর্থিক লসটা অনেকেই সয্য করতে পারেন না। তারমধ্যে পুঁজিবাজারের পতনের সাথেসাথে ব্রোকারেজ হাউজ মালিকদ্বয় কর্তৃক বিনিয়োগকারিদের পুর্ণ অর্থ লুটপাট ও আত্মস্বাৎ দেশের পুঁজিবাজারকে আস্তাহীন ও দরপতনের দোর গোড়ায় এনে দাড় করিয়েছে।
স্বাধিনতার পর সুদীর্ঘ সময় প্রায় ২১ বছর অতিবাহিত করে বর্তমান সরকার ১৯৯৬ সালে প্রথম ক্ষমতায় আসার পরপরই ১৯৯৬ সালে তাদের ছত্রছায়ায় পুঁজিবাজারে প্রথম লুটপাট ও অনাকাঙ্খিত দরপতন ঘটানোর মাধ্যমে অনেকেই পুঁজি হারা হন। এই লুটপাটের বিচার আজও ফাইল বন্ধি হয়ে আছে, লুটেরারা দিব্বি ক্ষমতায় আছেন বহাল তবিয়তে। পরবর্তিতে মার্কেট আবারো পা পা করে ঘুরে দাড়াতেই বর্তমান সরকার তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পরপরই ২০১০সালে ৬ ডিসেম্বর সেই একই কায়দায় চলে পুজিবাজারসহ অন্যান্য আর্থীক প্রতিষ্ঠানের লুটপাটের মহাযজ্ঞ, এ তারিখে একদিনে ৬০০ এরও বেশি সূচকের পতন দিয়ে শুরু করে পতনের ধারাবাহিকতায় পুঁজিবাজারের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। নগদ পুঁজি হারিয়ে আত্মহত্যাসহ প্রায় ৩৭ জনেরমত লোক প্রান হারান। লুটেরারা কৌশলে সরকারের ভিতর আরেকটি অদৃশ্য সরকার তৈরি করে দেশের বাইরে বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার বাড়ী কেনা সহ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা দেউলিয়ার এমন কোন অপকর্ম বাদ রাখেন নাই, এর পরেও রয়েছেন ধরাছোয়াঁর বাইরে। প্রবাদে আছে,“প্রকৃতভাবে জবাবদিহীতা ও বিচার হীনতার সাংস্কৃতি অন্যায় এবং অপকর্মকে উসকে দেয়।”
বর্তমানে পুঁজিবাজার সাধারন অস্থিরতায় থাকলেও সরকার ব্যাংক আমানতের সুদের হার কমিয়ে দেয়া এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আর্থীক কেলেঙ্কারির কারন, যেমন হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিসহ বিভন্ন অনিয়মের কারণে ব্যাংক ছেড়ে পুঁজিবাজারে দিকে ঝুঁকেছেন গ্রাহকেরা। পাশাপাশি আমানতে সুদের হার কমে যাওয়ায় পুঁজিবাজার মুখী হয়েছেন অনেকে।
বর্তমানে ব্যাংকে আমানতে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে যাওয়াতে নিয়ম মেনে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করলে বছর শেষে এখান থেকে ব্যাংকের চেয়ে ভালো মুনাফা করা সম্ভব। বিষয়টি মাথায় রেখে পুঁজিবাজারে এলেও স্বস্থি পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। বারবার ব্রোকারেজ হাউস থেকে অর্থ আত্মসাৎ করার ঘটনায় পুঁজিবাজারকে একদিকে যেমন নিরাপত্তাহীনতার দোর গোড়ায় দাড় করিয়েছে অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরাও পড়েছেন দুর্চিন্তায়।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত দুই বছরে ব্রোকারেজ হাউস থেকে বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৩০০ কোটি টাকারও বেশি আত্মসাৎ করেছেন মালিক কর্তৃপক্ষ। ডুপ্লিকেট সফটওয়্যার করে তারা হাতিয়ে নিয়েছে গ্রাহক বা বিনিয়োগ কারীর বিপুল পরিমান অর্থ। পাশাপাশি গ্রাহককে না জানিয়ে শেয়ার বিক্রি করে সে অর্থ লুটে নেওয়ার ঘটনাও ঘটিয়েছেন তারা।
এছাড়া হাউস কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনসহ রয়েছে নানা অভিযোগ। এসব কারণে ব্রোকারেজ হাউসে অর্থ রেখে স্বস্থি পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। তাদের মতে, রক্ষক যখন ভক্ষক হয়েযায় তাহলে নিরাপত্তা হীনতায় থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
নাম না বলে একজন বিনিয়োগকারী বলেন, ব্রোকারেজ হাউসে যদি টাকা বা শেয়ার রেখে অনিরাপত্তায় থাকতে হয় তাহলে আমরা ব্যবসা করব কীভাবে। ব্যাংকের মতো পুঁজিবাজার থেকেও অর্থ চুরির ঘটনায় পুঁজিবাজারের প্রতিও মানুষের অনাস্থা তৈরি হবে। তাই পুঁজির নিরাপত্তার ব্যাপারে বিএসইসিসহ এখাতে সংশ্লিষ্ট যারা রয়েছেন তাদের আরো বেশি সর্তক থাকা দরকার।
ব্রোকারেজ হাউস থেকে সর্বশেষ অর্থ চুরির ঘটনা ঘটিয়েছে তামহা সিকিউরিটিজ লিমিটেড। হাউস কর্তৃপক্ষ জালিয়াতি করে ডুপ্লিকেট সফটওয়্যারের মাধ্যমে দুই শতাধিক বিনিয়োগকারীর প্রায় শত কোটি টাকা লুটে নিয়েছে ডিএসইর সদস্য প্রতিষ্ঠানটি। ইতোমধ্যে হাউসটির লেনদেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে এসব কার্যক্রমের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) গাফিলতিকে দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ফখরুল ইসলাম বলেন, তামহা সিকিউরিটিজের মালিক ডুপ্লিকেট সফটওয়্যার ব্যবহার করে বিনিয়োগকারীদের সব শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন। বিএসইসি ওই সিকিউরিটিজের শেয়ার লেনদেন স্থগিত করে দেওয়ার পর আমরা সিডিবিএলে যোগাযোগ করে জানতে পারি আমাদের হিসাবে কোনো শেয়ার নেই।
তামহা কর্তৃপক্ষ আমাদের দুই শতাধিক বিনিয়োগকারীর মোবাইল নম্বর পরিবর্তন করে ডুপ্লিকেট সফটওয়্যার ব্যবহার করে শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের তথ্য আমাদের ফোনে এসএমএস ও মেইল পাঠাত। এ কারণে আমরা তাদের জালিয়াতি বুঝতে পারিনি। সিকিউরিটিজ হাউসটির মালিকসহ তার দুই বোন প্রায় শত কোটি টাকা লুটপাট করে নিয়েছেন।এর আগে একই ধরনের ঘটনা ঘটান ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ নামের একটি ব্রোকারেজ হাউস। বিনিয়োগ কারীদের টাকা সরানোর পর ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ তাদের হেড অফিসসহ সমস্ত ব্রাঞ্চ অফিস বন্ধ করে দেয়। ভুক্তভোগীরা জানান, এ হাউস থেকে তাদের প্রায় শত কোটি টাকা সরিয়েছে কর্তৃপক্ষ। একইভাবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সদস্যভুক্ত ব্রোকারেজ হাউস বানকো সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারীদের সম্মিলিত গ্রাহক অ্যাকাউন্ট থেকে ৬৬ কোটি ৫৯ লাখ ১৯ হাজার ১৩৩ টাকা সরিয়ে নেয়। বিষয়টি নিয়ে কথা বললে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএসইসির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা সারাক্ষণই বাজার মনিটরিং করে থাকি। তার মধ্যে থেকে কীভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটে তা আমার জানা নেই। বিচ্ছিন্ন সব ঘটনা যেন আর না ঘটে সে বিষয়ে আমরা আরো বেশি সতর্ক।’
অন্যদিকে সিকিরিউটিজ আইন লঙ্ঘন করার দায়ে গত দুই বছরে রূপালী ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেড, এএইচসি সিকিউরিটিজ লিমিটেড, ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেড, এএনএফ ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড, গেটওয়ে ইক্যুইটি রিসোর্স লিমিটেড, ইউনিক্যাপ সিকিউরিটিজ লিমিটেড, তামহা সিকিউরিটিজ লিমিটেড, মেঘনা লাইফ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, এমিনেন্ট সিকিউরিটিজ লিমিটেড, এনআরবিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেড, ব্যাংক এশিয়া সিকিউরিটিজ লিমিটেড এবং ডিএলআইসি সিকিউরিটিজ লিমিটেড, বিডি ফাইন্যান্স সিকিউরিটিজ লিমিটেডসহ প্রায় ৫০টি হাউসকে সর্তক করেছে বিএসইসি। প্রকৃতভাবে বলতে গেলে অর্থ চুরি ও আত্মস্বাতের ঘঠনায় বলতে গেলে এক কথায় ডিএসসি এবং বিএসইসির দায়িত্বহীনতাকে দায়ী করব আমরা।










