“ইন্স্যুরেন্স সেক্টরের বেহাল অবস্থা, আইডিআরএ কাগুজে বাঘের ভুমিকায়, অর্থমন্ত্রনালয়ের নেই মাথাব্যাথা”


চেয়ারম্যান, পরিচালক এবং এমডি/ সিইওদের অতিলোভ এবং অনৈতিকতাই এর জন্য দায়ী !!!
খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে দেশ, আর হারাবেনা বাংলাদেশ, ঠিক উন্নয়নের জোয়ারে ভাসতে ভাসতে সরকার যখন আত্মহারা, তখন সেই সুযোগে এক শ্রেনীর ধুর্ত কিছু কোম্পানীর চেয়ারম্যান, পরিচালক এবং মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মিলে লেজুড় বিত্তির মাধ্যমে সরকার এবং প্রশাসনের নির্বাহী কর্মকর্তদের কে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে সরকারের ভিতর আরেকটি অদৃশ্য শক্তিশালী সরকার ঘঠন করে সততা ও নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে দুনীতি, লুটপাট, এবং অর্থ পাচারের মাধ্যমে নিজেদের রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা করে তুলেছে। তাদের ভিত এতই শক্ত যে, তারা একটা দেশের সরকার তথা, বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগসহ কোন কিছুকেই কোন রকম পরোয়া না করে পরিপুর্নভাবে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে চলেছেন, অবস্থা দেখে মনে হয় সরকারও এদের নিকট অসহায়।
যদিও আমাদের বাংলাদেশের আয়তনের তুলনায় ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সংখ্যা লাইফ নন-লাইফ মিলিয়ে অনেক বেশী সেই তুলনায় যোগ্য ও অভিজ্ঞ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সংখ্যা নিতান্তই কম বলা যায়। এখানে টেকনিকেল যে ব্যাপারটা উল্লেখ্য না করলেই নয়, একটা কোম্পানির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি)পর্যন্ত ক্ষমতাশীল স্থায়ী পদ, যদিও এএমডি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক(এমডি)’র নিকট দায়বদ্ধ। এরপর কোম্পানিগুলির ব্যবস্থাপনা পরিচালক/ মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিএফও) যেটাই বলি এ পদটা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হলেও প্রকৃত পক্ষে এ পদটা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী পদ নয়, তার কারন হল কোম্পানিগুলির ব্যবস্থাপনা পরিচালক/ মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিএফও) পদে যারা বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)‘র থেকে নিয়োগ অনুমোদন পান তা চুক্তিভিত্তিক এবং নবায়নযোগ্য পদ। আর এ পদে কোম্পানিগুলির চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্যদ কৌশলে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য নিজেদের বলয়ের লোককে সিলেকসন দিয়ে নিয়োগ অনুমোদনের জন্য বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ(আইডিআরএ)‘র নিকট পাঠান। বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষও অনেক সময় নিয়োগ অনুমোদনের সবশর্ত যাচাই বাচাই না করে ভিন্ন কিছু সুবিধা আদায় করে নিয়োগ অনুমোদন গ্রহন করেন। পরবর্তিতে শুরু হয় চেয়ারম্যান, পরিচালক এবং এমডি/ সিইওদের যোগসাজসে দুর্নীতি ও লুটপাটের মহাউৎসব। কখনো কখনো আবার কোন কোন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নীতির সাথে আপোষ করতে না পারলে তিনি সইচ্ছায় পদত্যাগ করেন অথবা কোম্পানির পরিচালনা পর্যদের চাপের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হন।
বীমা খ্যাতের অব্যবস্থাপনা, লুটপাট এবং হযবরল চিত্র, বিশেষ করে নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোপানীগুলির ছেয়ে লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোপানীগুলির কর্মকর্তারা বেশি এগিয়ে আছে, এটা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোপানীগুলির কর্মকর্তাদের অবস্থা থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। আর বর্তমানে বীমা খাতের অভিভাবক হিসাবে আইডিআরএ কতটুকু দায়িত্বশীল তা নিয়ে বিভিন্ন মহলের বিভিন্ন কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে তার প্রমান পাওয়া যায়। এটা আরো অতি মাত্রায় প্রমানিত হয়েছে যে, দুর্নীতির দায়ে দুদকের জালে আটকা পড়া, ঘুষ, অবৈধ আয়সহ নানান অপকর্মের কারনে অর্থনীতির ৩০ দিন বিডি ডটকমে ৭/৮পর্বের ধারাবাহিকসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকার ধারাবাহিক নিউজের কারনে গত ১৪ জুলাই বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কতৃপক্ষ(আইডিআরএ)’র চেয়ারম্যান ড, মোশারফ হোসেন পদত্যাগে বাধ্য হওয়া। এখানে সুক্ষ চিন্তার বিষয় হল, বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষের অবকাঠামো, ক্ষমতা এবং নীতির পরিবর্তন না করে একের পর এক পরিচালক, চেয়ারম্যান পরিবর্তন বিমাখাতের জন্য কতটুকু উপযোগি হবে এবং সাবেক পদত্যাগি চেয়ারম্যান ড, মোশারফ হোসেনের স্থলাবিসিক্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারী বেহাল বিমাখাতকে কতটুকু উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রনে আনতে পারবেন তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ-??
বিশেষ করে লেজুড়বিত্তি, অযোগ্যতা, অদক্ষতা, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাসহ বড় বড় পদ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগন এবং নিয়ন্ত্রনকারী সংস্থার প্রধানদের কারন-ই বীমা খাতে এ অবস্থার জন্য দায়ী বলে বিশিষ্টজনরা মতামত দেন। কেহ কেহ বলেন, সরকারের জবাব দিহিতা না থাকার কারনে নিয়ন্ত্রনকারী সংস্থার প্রধানরা নিজেদের মধ্যে কৌশলে আরেকটি গোপন সিন্ডিকেট তৈরি করে নিজেদের রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছেন। অনেক সময় এদের কাউকে কাউকে চিহ্নিত করা গেলেও অদৃশ্য শক্তির কারণে এরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, সুযোগ সন্ধানীরা তখন সুকৌশলে সেই সরকারের ভেতরে ঢুকে রাষ্ট্রের চলমান অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করে নিজেরা স্বার্থ হাসিলে তৎপর হয়ে ওঠে, এদের অবস্থান খুবই শক্ত। যা একটা উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। সরকারও নাকি এদের থেকে সুযোগ সুবিধা (আর্থিক ও রাজনৈতিক) আদায় করে থাকে, যার ফলে সরকার প্রকৃত অপরাধীদের বের করে শাস্তির আওতায় আনতে পারে না।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েসন(বিআইএ)’র অফিসে এসোসিয়েশন অব ইন্স্যুরেন্স এক্সিকিউটিভস (এআইই) আয়োজিত অভিষেক অনুষ্ঠানে মালিক ও ব্যবস্থাপকদের স্বীকারোক্তি তুলে দেওয়া হল…
বীমা খাতকে কমিশন ভিত্তিক না করে সেবা ভিত্তিক বীমা খাত গড়তে হবে বলে মন্তব্য করেছেন এসোসিয়েশন অব ইন্স্যুরেন্স এক্সিকিউটিভস (এআইই) আয়োজিত অভিষেক অনুষ্ঠানের আলোচকরা। নন-লাইফ বীমা খাতে অবৈধ কমিশন দেয়ার বিষয়টি তুলে ধরে বক্তারা বলেন, নিজের টাকা অন্যকে দিয়ে আমরা কেন মিথ্যা ঘোষণা দিচ্ছি, কেন মিথ্যাকে প্রশ্রয় দিচ্ছি। এই মিথ্যা ঘোষণা থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাদের নিজস্ব স্বীকারোক্তি দেখে হবুচন্দ্র রাজা এবং গবুচন্দ্র মন্ত্রী’র কবিতার কথাই মনে করিয়ে দিল…
নন-লাইফ বীমা খাতে অবৈধ কমিশন দেয়ার বিষয়টি তুলে ধরে ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পনীর লিঃ এর চেয়ারম্যান মোজাফফর হোসেন পল্টু বলেন, নিজের টাকা অন্যকে দিয়ে আমরা কেন মিথ্যা ঘোষণা দিচ্ছি, কেন মিথ্যাকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিচ্ছি। তিনি মুখ্য নির্বাহীদের মিথ্যা আশ্রয় প্রশ্রয় না দেয়ার অনুরোধ জানান। বলেন, এই মিথ্যা ঘোষণা থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। বীমা খাতকে কমিশন ভিত্তিক না করে সেবা ভিত্তিক করতে হবে অর্থ্যাৎ প্রকৃতভাবে তিনি অবৈধ কমিশনের কথা স্বীকার করে নিলেন।
বিআইএ’র প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদ (পাভেল) বলেন, নন-লাইফ বীমা খাতের সমস্যার সমাধান করার অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু পুরোপুরি সমাধান হয়নি। কোথাও কোন একটা সমস্যা রয়েই গেছে। এ জন্য আমাদের সবাইকে এক সাথে কাজ করতে হবে। বিআইএ’র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও নিটল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির চেয়ারম্যান এ কে এম মনিরুল হক বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী শিল্প হলো বীমা। পৃথিবীর সব দেশের বড় বড় বিল্ডিংগুলো বীমা কোম্পানির। তিনি বলেন, এক একা বড় হওয়া যায়, তবে এক সাথে বড় হওয়ার মধ্যে আনন্দ বেশি। তিনি নিজেদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার কথা বললেও নিজের কোম্পানীতেই কমিশন বানিজ্যের তালিকায় নাম উঠে আসে।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম (বিআইএফ)’র প্রেসিডেন্ট বি এম ইউসুফ আলী বলেন, দেশে জাতীয় দিবসগুলোর মধ্যে বীমা দিবস চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও মাতৃভাষা দিবসের পরেই জাতীয় বীমা দিবস। প্রশাসনের সহায়তায় দিবসটি সারাদেশে মহোৎসবে পালিত হয়। একটি আমাদের জন্য সৌভাগ্য। এই শিল্পের স্বার্থে আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। অথচ গত বেশ কিছুদিন ধরে পত্রপত্রিকায় ফারইষ্ট ইসলামি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের লুটপাট, দুর্নীতির চিত্র দেখে দেশের সাধারন মানুষ আতঙ্কিত হলেও লাইফ বীমা খাতের গ্রাহকদের অবস্থা জ্ঞান হারিয়ে ফেলার মতই। অন্যান্য পত্র-পত্রিকাসহ অর্থনীতির ৩০দিন বিডি ডটকম এ ফারইষ্ট লাইফের লুটপাট, দুর্নীতি নিয়ে ৯/১০ খন্ডের ধারাবাহিক চিত্রে তা প্রমানিত হয়েছে।