এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে

সিপিডির সংলাপে বক্তারা
নিজস্ব প্রতিবেদক :
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের জন্য নিজস্ব উেসর ওপরই জোর দিতে হবে। এক্ষেত্রে রাজস্ব আদায়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। গতকাল বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক সংলাপে এমন মত উপস্থাপন করেন তারা।
রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘ফিন্যান্সিং ফর এসডিজিস ইমপ্লিমেন্টেশন ইন এশিয়া-প্যাসিফিক রিজিওন’ শীর্ষক সংলাপের আয়োজন করে সিপিডি। আলোচ্য বিষয়ে প্রেজেন্টেশন তুলে ধরেন ইউএনএসক্যাপের ম্যাক্রোইকোনমিক পলিসি অ্যান্ড ফিন্যান্সিং ফর ডেভেলপমেন্ট ডিভিশনের ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স অফিসার ভ্যাচারিন সিরিমানিথাম। সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি বাস্তবায়ন-বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব কাজী শফিকুল আযম এবং সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও মোস্তাফিজুর রহমান। সঞ্চালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
সংলাপে অর্থনীবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলেন, জাতিসংঘ ঘোষিত ১৫ বছর মেয়াদি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৭টি অভীষ্ট ও ১৬৯টি লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদেশনির্ভরতা ফলপ্রসূ হবে না। বরং আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের ওপর জোর দিতে হবে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৪৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশে জিডিপির অনুপাতে কর আদায়ের হার সবচেয়ে কম। আমাদের এ হার মাত্র ১০ শতাংশ। অথচ নেপালের মতো দেশেও রাজস্ব আদায়ের হার জিডিপির ১৮ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের হার বাড়াতে করের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রস্তাবিত ভ্যাট আইন দ্রুত কার্যকরের আহ্বান জানান তারা।
বক্তারা দেশে বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অসমতা কমাতে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। একই সঙ্গে অর্থ পাচার রোধ ও বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনতে হবে। এছাড়া দুর্নীতি কমানো ও সরকারি কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বাড়ানোরও তাগিদ দেয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. বরকত-ই-খুদা বলেন, দেশে অসমতা বাড়ছে। শুধু শহর নয়, গ্রামেও এখন বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করছে। সরকারকে এ বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৬০০ থেকে ৯০০ কোটি ডলার পাচার হচ্ছে। এ অর্থ দিয়ে তিনটি পদ্মা সেতু করা সম্ভব। বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার বন্ধ হচ্ছে না। এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে না। একদিকে অর্থ পাচার বাড়ছে, অন্যদিকে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। এসডিজি বাস্তবায়নে অর্থায়ন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারিভাবে আগে যেভাবে টাকা আসত, সেটি কমে গেছে। তাই সরকারের উচিত এখন অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের দিকে বিশেষ মনোযোগ দেয়া।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে রাজস্ব আহরণের হার সুখকর নয়। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে রাজস্ব আহরণের হার সবচেয়ে কম। এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। আমাদের দেশে অনেক মানুষ এখনো করের আওতার বাইরেই রয়ে গেছেন। করজালে তাদের যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি দুর্নীতির হারও কমাতে হবে। তার মতে, উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাগুলোর দিকে তাকিয়ে না থেকে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের দিকে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। তিনি অসমতা ও জলবায়ু পরিবর্তনকে বাংলাদেশের জন্য বড় সমস্যা বলে উল্লেখ করেন।
আবুল কালাম আজাদ বলেন, ১৫ বছর মেয়াদি এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশের আগামী ১২ বছরে বাড়তি ৯২ হাজার ৮০০ কোটি ডলার অর্থায়ন লাগবে। এর মধ্যে ৮৫ শতাংশ অর্থ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহের আশা করছে সরকার। বাকি ১৫ শতাংশ উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এ টাকা কে দেবে? জাতিসংঘের অধিভুক্ত ১৯৪টি দেশই এসডিজি বাস্তবায়ন করছে। তাই আমাদের নিজস্ব টাকা দিয়েই এসডিজি বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের কিছু সম্ভাবনাময় খাত রয়েছে। এসব খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ পাল্টে যাবে। তার মতে, এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের হার বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।