
খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
দুর্নীতির বরপুত্র নামেখ্যাত দেশের আর্থিক খাতের আলোচিত সমালোচিত নাম চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের বিরুদ্ধে শেয়ারবাজার লুটপাট ব্যাংক দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নাফিজ সরাফাত ছাড়াও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ এবং এস আলম গ্রুপের ইসলামী ব্যাংক দখল করে নেওয়ার অভিযোগেরও সুষ্ঠ তদন্ত শুরু করেছে। আজ ১৫ অগাষ্ট ২০২৪ বৃহস্পতিবার এসব তথ্য জানা গেছে দুদক সূত্রে।
সুত্র জানায়, সাবেক ব্যাংকার চৌধুরী নাফিজ সরাফাত পদ্মা ব্যাংক (সাবেক ফারমার্স ব্যাংক) এর প্রক্তন চেয়ারম্যান। তিনি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান রেইসের মালিকানায় যুক্ত। তাঁর মোবাইল টাওয়ার কোম্পানি, বিদ্যুৎ কোম্পানি, তারকা হোটেল ব্যবসা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মিডিয়াসহ নানা ব্যবসা রয়েছে।
আত্মপ্রকাশ না করে দুদকের এক পরিচালক আজ ১৫ অগাষ্ট ২০২৪ বৃহস্পতিবার বলেন, চৌধুরী নাফিজ সরাফাত পুলিশ ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সহায়তা নিয়ে পদ্মা ব্যাংক দখল করেছিলেন। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে শেয়ারবাজার থেকেও ৮০০ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ আছে। চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের বিরুদ্ধে পদ্মা ব্যাংক দখল ও শেয়ারবাজার থেকে টাকা লুটপাটের অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। ইতিমধ্যে তাঁর এসব অনিয়ম নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
সাবেক ফারমার্স (বর্তমানে পদ্মা) ব্যাংক গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে ২০১৭ সালে পদ ছাড়তে বাধ্য হন ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান (মখা) আলমগীর। এরপরই ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন চৌধুরী নাফিজ সরাফাত। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকটির নাম পাল্টিয়ে পদ্মা ব্যাংক রাখা হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেন চৌধুরী নাফিজ সরাফাত।
চৌধুরী নাফিজ সরাফাত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দণ্ড-সুদ, জরিমানা মওকুফসহ বিভিন্ন ছাড় পাওয়ার পরও ব্যাংকটির দুরবস্থা কাটেনাই। ২০২৩ সালের শেষে পদ্মা ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা, যার খেলাপি ঋণই ৩ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। ফলে ঋণ থেকে যে আয় হয়, তা দিয়ে আমানতের সুদ পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। ব্যাংকটি বড় অর্থের লোকসান গুনছে বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধান শুরু এস আলমের ইসলামী ব্যাংকের অনিয়ম
গত বছরের নভেম্বর মাসে ইসলামী ব্যাংক থেকে ২ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগের তদন্ত শুরু করে দুদক। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় এস আলম গ্রুপ। এখন ব্যাংকটির এক-তৃতীয়াংশ ঋণই গ্রুপটির স্বার্থসংশ্লিষ্ট।
ওই নভেম্বর মাসে ইসলামী ব্যাংক থেকে নানা উপায়ে ৮টি প্রতিষ্ঠান ২ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা তুলে নেয়। এ জন্যই ব্যাংকটির কর্মকর্তারা ওই মাসকে ‘ভয়ংকর নভেম্বর’ হিসেবে বর্ণনা করেন। গত বছর ডিসেম্বর মাসেও ব্যাংকটির চট্টগ্রামের তিনটি শাখা থেকে তিন হাজার কোটি টাকা ঋণসুবিধা দেওয়া হয়। এর মধ্যে মেসার্স মুরাদ এন্টারপ্রাইজের ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৫৪ কোটি টাকা, ইউনাইটেড সুপার ট্রেডার্সের ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৮৪ কোটি টাকা ও সেঞ্চুরি ফুড প্রোডাক্টসের ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংকের রাজশাহীর কয়েকটি শাখা থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়।
পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদছাড়া নিয়ৈ যা বললেন নাফিজ সরাফাত,
ইসলামী ব্যাংক থেকে অনিয়ম-দুর্নীতি করে টাকা তুলে নেওয়ার বিষয়টির দুদক আগেই অনুসন্ধান শুরু করেছিল। সদ্য পতন হওয়া স্বৈরাচারি আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকায় সেই অনুসন্ধান বন্ধ হয়ে যায়। দুদক সূত্রে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চার দফা ইসলামী ব্যাংকের বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তখন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দুদককে কোনো তথ্য দিয়ে সাহায্য না করায় অনুসন্ধান বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সম্প্রতি দেশথেকে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারি শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর ইসলামী ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা তুলে নেওয়ার বিষয়টির নতুন করে সামনে চলে আসে এবং শুরু হয় অনুসন্ধান। সুত্রের খবর, দুদকের অনুসন্ধানি কর্মকর্তা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ইয়াসির আরাফাত জানান, ১২ অগাষ্ট বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে, তথ্য পাওয়ার পর পরবর্তি পদক্ষেপ ।












