এবিএম সামছুদ্দিনকে প্যানেল লিডার মনোনয়ন
খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
আসন্ন বিজিএমইএ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট(ফাইন্যন্স) এবিএম সামছুদ্দিনকে প্যানেল লিডার হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে পোশাক ব্যাবসায়ীদের শীর্ষ জোট ‘ফোরাম’। শনিবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত হোটেল দ্যা ওয়েস্টিন ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাকে এ পদে মনোনয়ন দেয়া হয়। এসময় আরো জানানো হয়, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ড.রুবানা হক আসন্ন নির্বাচনে ফোরামের প্যানেল সদস্য হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
ফোরামের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পারভেজ), বিজিএমইএ’র বর্তমান প্রেসিডেন্ট ড. রুবানা হক, সাবেক প্রেসিডেন্ট আনিসুর রহমান সিনহা,সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট বেনজীর আহমেদ, ডিরেক্টর খন্দকার বেলায়েত হোসেনসহ ফোরামের শীর্ষ নেতা, সদস্য এবং শিল্প উদ্যোক্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে ড. রুবানা হকের নেতৃত্বাধীন বিজিএমইএ বোর্ডের বিভিন্ন সাফল্য নিয়ে ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশন দেয়া হয়। এসব সাফল্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পোশাক শিল্পকে বাঁচাতে ক্রয়াদেশ বাতিল মনিটরিং পোর্টাল চালু ও ৩১৮ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া, অ্যাকর্ডকে প্রতিস্থাপনে আরএমজি সাসটেইনাবিলিটি কাউন্সিল (আরএসসি) গঠন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শিল্পের দুর্দশা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে সচেতনতা তৈরি, প্রথমবারের মত বিজিএমইএ সাসটেইনাবিলিটি রিপোর্ট প্রকাশ এবং করোনাকালে সরকারের সথে সমন্বয় করে সহায়তা ও প্রণোদনা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা ইত্যাদি। এসময় উপস্থিত পোশাক শিল্প উদ্যোক্তারা সাফল্যের এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
ফোরামের প্যানেল লিডার এবিএম সামছুদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের পোশাকখাত এখন ক্রন্তিলগ্নে উপস্থিত আশার কথা হলো, করোনা ভ্যাকসিন ইতোমধ্যে চলে এসেছে। কিন্তু ২০২১ সাল আমাদের চলে যাবে ঝড় সামলাতে সামলাতে। এ ঝড় মোকাবেলা করতে গিয়ে আমাদের কিছু বাস্তবতারও মুখোমুখি হতে হবে। প্রথম যে বৈরিতার মোকাবেলা আমাদের করতে হবে, তা হলো পোশাকের ক্রমা্মাগত দরপতন। আমাদের সংঘবদ্ধ হয়ে এই প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে হবে, যাতে ক্রেতারা আমাদের কোন ধরনের দুর্বলতার সুযোগ নিতে না পারে। তিনি বলেন, গত চার বছরে গড়ে আমাদের পণ্যের দরপতন হয়েছে ৪.৭৫ শতাংশ। ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র, এমনকি নন-ট্রেডিশনাল মার্কেটেও আমাদের দরপতনের মুখে পড়তে হয়েছে। এর বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। এত গ্রিন ফ্যাক্টরি থাকার পরেও আমরা সে অনুযায়ী দাম পাচ্ছি না। যতই আমরা টেকসই শিল্পের কথা বলি না কেন, টেকসই শিল্প শুধু স্থাপনা দিয়ে হয় না। এজন্য দরকার টেকসই শ্রমিক-মালিক এবং টেকসই বায়িং প্রাকটিস। আমরা যেন যথাযথ দাম পাই তা ক্রেতাদের বোঝাতে হবে। কারখানা সবুজ করার পাশাপাশি শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক এবং ক্রেতাদের পারচেজিং প্রাকটিসকেও সবুজ করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আগামী দিন গুলো আমাদের। কারণ ইথিওপিয়া রাজনৈতিক সংকটাপন্ন। কম্বোডিয়া জিএসপি সুবিধা হারিয়েছে। মায়ানমারে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে। ভিয়েতনাম রাতারাতি ফ্যাক্টরি করতে পারবে না। কাজেই যে যতই বলুক ব্যবসা বাংলাদেশে আসবে। ব্যাবসার একমাত্র গন্তব্য হবে বাংলাদেশ।
এবিএম সামছুদ্দিনের পরিচিতি
প্যানেল লিডার হিসেবে মনোনয়নপ্রাপ্ত এবিএম সামছুদ্দিন হান্নান গধুপের চেয়ারম্যান। তিনি ১৯৫৮ সালের পহেলা মার্চ তার পৈত্রিক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে জন্মগ্রহণ করেন। আরএমজি খাতের সফল এই ব্যবসায়ী কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৭৭ সালের ২১শে মার্চ, বিজেএমসিতে স্টাডি অফিসার হিসেবে। দীর্ঘ ১৬ বছরের চাকরি ছেড়ে ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে তিনি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এমএন সোয়েটারস লিমিটেড নামে একটি কোম্পানির সথে যুক্ত হন।
১৯৯৮ সালে তিনি ঢাকায় ফ্যান্সি ফ্যাশন সোয়েটারস লিমিটেড নামে প্রথম কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন, ওই বছরের ৬ ফেবধুয়ারি কারখানাটিতে বাণিজ্যিক উৎপ্যাদন শুরু হয়। ওই ৩০০ মেশিন কেনার সক্ষমতা থাকা স্বত্তেও তিনি মাত্র ৬০টি মেশিন নিয়ে কারখানা চালু করেন। কারণ তিনি শ্রমিকদের ৪ মাসের মজুরি নিজের কাছে জমা রাখেন। ব্যবসার পরিধি বাড়ার সথে সথে এবিএম সামছুদ্দিন বিদেশী ক্রেতার সন্ধানে ইউরোপে যাতায়াত শুরু করেন। তিনি রাস্তÍয় রাস্তÍয় ঘুরে বিভিন্ন আউটলেটে নিজে স্যাম্পল নিয়ে যেতেন। তার অধ্যবসায়, একাগ্রতা ও কর্মনিষ্ঠা দেখে ইউরোপীয় ক্রেতারা অর্ডার দিতে শুরু করে।
২০০৩ সালে এবিএম সামছুদ্দিন গাজীপুরে হান্নান ফ্যাশনস লিমিটেড নামে আরেকটি কারখানা স্থাপন করেন। ২০০৪ সালে ফ্যান্সি ফ্যাশনকে গাজীপুরে স্থানান্তর ও ২০০৯ সালে হান্নান নিট অ্যান্ড টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ২০১১ সালে গাজীপুরেই হান্নান ফ্যাশন এক্সটেনশন-১ নামের আরেকটি কারখানা সহ ২০১৫ সালে স্থাপন করেন হান্নান নিটওয়্যারস লিমিটেড। পরে এ.এইচ প্যাকেজিং অ্যান্ড এক্সেসরিজ নামেও একটি কারখানা স্থাপন করেন। ব্যবসা শুরুর পর থেকে পোশাক ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করা শুরু করেন এবিএম সামছুদ্দিন। ১৯৯৬ সাল থেকে তিনি সরাসরি ট্রেড পলিটিক্সে ক্তুক্ত হন। ১৯৯৯ সালে তিনি আনিসুর রহমান সিনহার নেতৃত্বাধীন বিজিএমইএ বোর্ডে কাস্টমস ও আরবিট্রেশনসহ ছয়টি স্ট্যান্ডিং কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩-০৪ সালে তিনি বিজিএমইএর বোর্ড ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং ২০০৭-০৮ সালে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট (ফাইন্যান্স) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৬ সালে প্রথম মজুরি কমিশন গঠনের পর মাত্র শতাংশ কারখায় নূন্যতম মজুরি কার্যকর হয়। ফলে আরএমজি খাতজুড়ে দেখা দেয় অস্থিরতা। ২০০৭ সালের মার্চে ফাইন্যান্সের দায়িত্ব নেয়ার পর তিন মাসের মধ্যে ৯৮ দশমিক ২৬ শতাংশ কারখানায় নূন্যতম মজুরি কার্যকর করেন। একই সালে বন্যা এবং সিডরে মারাত্মকক্ষতিগ্রস্তÍ শ্রমিকদের বিভিন্ন কারখানা, ক্রেতাদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করে বিতরণসহ বৈশ্বিক মন্দার সময় বিজিএমইএর হাল ধরে ছিলেন এবিএম সামছুদ্দিন। ফলে দেশের পোশাক খাতকে বড় কোন সংকটে পড়তে হয়নি। ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে আরএমজি খাতের অস্থিরতা মোকাবেলায় পুলিশ ভ্যানে করে কারখানায় যান তিনি। সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে তিনি সংকটের সময় বিজিএমইএ সদস্যদের পাশে দাঁড়ান এবং সংকট মোকাবেলায় টানা ৪ দিন এবং ৪ রাত বিজিএমইএ ভবনে অবস্থান করেন। ২০০৭ সালে প্রথমবারের মত গঠিত ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেলের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। এনএসআই, এসবি, ডিএমপি, সেনা সদর দফতর, ডিজিএফআইয়ের সমন্বয়ে এই গঠন করা হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সথে সমন্বয় করে দক্ষতার সথে তিনি শ্রমিক অসন্তোষসহ বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবেলা করেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই সব পক্ষকে নিয়ে মধ্যস্থতায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তার পারদর্শিতায় এসব ক্ষেত্রে শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক পুনঃ স্থাপন করা সম্ভব হয়।
মনোনয়ন প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন(বাম থেকে) ক্লিফটন গ্রুপ-এর ডিরেক্টর এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, এজে গ্রুপ-এর প্রেসিডেন্ট আনোয়ার এইচ চৌধুরী, ইন্ট্রাম্যাক্স গ্রুপ-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর এনায়েত উল্লাহ, বিজিএমইএ-এর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট বেনজীর আহমেদ, ফোরাম-এর প্রেসিডেন্ট আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী(পারভেজ), ফোরাম-এর প্যানেল লিডার এবিএম সামছুদ্দিন, বিজিএমইএ-এর প্রেসিডেন্ট ড. রুবানা হক, বিজিএমইএ-এর সাবেক প্রেসিডেন্ট আনিসুর রহমান সিনহা, ডিবিএল গ্রুপ- এর চেয়ারম্যান আবদুল ওয়াহেদ, বিশ্বাস গ্রুপ- এর চেয়ারম্যান মঈনুদ্দিন বিশ্বাস এবং ফোরাম-এর সেক্রেটারি জেনারেল আসিফ ইব্রাহিম।










