ব্যাংকে গ্রাহক হয়রানি বেড়েছে

অর্থনীতির ৩০ দিন প্রতিবেদক :
দেশের অন্যতম একটি বেসরকারি ব্যাংকে নিয়মিত লেনদেন করেন রবিউল ইসলাম (ছদ্মনাম)। সম্প্রতি একটি জরুরি প্রয়োজনে ব্যাংকটির এটিএম বুথে টাকা তুলতে গিয়ে দেখেন তার অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই। অথচ সর্বশেষ লেনদেনের তথ্যানুযায়ী তার অ্যাকাউন্টে পাঁচ হাজার টাকা ছিল। পরে ব্যাংকটির কল সেন্টারে জানানো হলে গ্রাহকের টাকা ঠিক আছে বলে নিশ্চয়তা দেওয়া হয় এবং শাখা থেকে টাকা উত্তোলনের জন্য অনুরোধ করা হয়। ব্যাংকটির শাখায় গিয়েও ব্যর্থ হন ওই গ্রাহক। তাকে জানানো হয়, তার অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই। জরুরি প্রয়োজনে টাকা তুলতে পারেননি রবিউল ইসলাম। অবশেষে তিন দিন পরে টাকা তুলতে পেরেছেন তিনি। ব্যাংকটির এমন হয়রানিতে হতাশ রবিউল ইসলাম।
বেশ কয়েক বছর আগে চতুর্থ প্রজšে§র একটি ব্যাংকে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) করেছিলেন রহিমা বেগম (ছদ্মনাম)। এফডিআরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখায় টাকা তুলতে যান ওই গ্রাহক। শাখা থেকে তাকে জানানো হয়, ব্যাংকে তারল্য সংকট রয়েছে। তাই এফডিআরের টাকা বেশ কয়েকটি কিস্তিতে ভেঙে ভেঙে নিতে হবে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট শাখার ম্যানেজারের সঙ্গে তর্কে জড়ান তিনি। ব্যাংক কোনোভাবেই একসঙ্গে এফডিআরের সব টাকা দিতে রাজি নয়। অবশেষে উপায় না পেয়ে কিস্তিতেই অল্প অল্প করে এফডিআরের টাকা তোলেন গ্রাহক।
রবিউল ইসলাম কিংবা রহিমা বেগমের মতো এমন হয়রানির শিকার হচ্ছেন শত শত গ্রাহক। বিশেষ করে চেক জালিয়াতি, অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ কর্তন, মিথ্যা তথ্য দিয়ে ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলন, স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) অর্থ ফেরত না দেওয়া, স্বীকৃত বিলের মূল্য পরিশোধ না হওয়া, ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড, রেমিট্যান্স, মোবাইল ব্যাংকিং, ঋণ ও অগ্রিম, নোটস ও কয়েনস, ব্যাংক গ্যারান্টিসহ বিভিন্ন ধরনের সেবায় হয়রানির অভিযোগ বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত এক মাসের ব্যবধানেই ব্যাংক খাতে হয়রানির অভিযোগ বেড়েছে ৫৮টি। চলতি বছরের মে মাসে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে গ্রাহকদের অভিযোগের পরিমাণ ছিল ৪০৫টি। জুনে এই অভিযোগের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬৩টিতে। অভিযোগের শীর্ষে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। জুনে এ ব্যাংকের বিরুদ্ধেই সর্বোচ্চ ৩৯টি করে অভিযোগ এসেছে। এর পরেই রয়েছে সিটি ব্যাংক, যার বিরুদ্ধে গ্রাহকদের ৩১টি অভিযোগ এসেছে গত জুনে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত জুনে সাধারণ ব্যাংকিং নিয়ে অভিযোগ এসেছে ১৪১টি, ঋণ ও অগ্রিম নিয়ে ৫৭টি, এলসি-সংক্রান্ত ৩৯টি, কার্ডসংক্রান্ত ৫৩টি, নোট ও কয়েন-সংক্রান্ত ১০টি, সেবা নিয়ে ৪৪টি, ফি ও চার্জ নিয়ে ১০টি, রেমিট্যান্স নিয়ে সাতটি, ব্যাংক গ্যারান্টি নিয়ে ৪৭টি, মোবাইল ব্যাংকিং নিয়ে দুটি এবং অন্যান্য অভিযোগ ৫৩টি।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, মানুষ ব্যাংকের প্রতি আস্থা রেখে টাকা রাখে। অন্যদিকে ব্যাংকের দায়িত্ব সেবা দেওয়া। ব্যাংকিং সেবা হবে গ্রাহকবান্ধব; কিন্তু গ্রাহকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন, যা দুঃখজনক। গ্রাহক হয়রানি বন্ধে অফিসার ও ডেস্কের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন তারা।
জানা গেছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১১ সালের ১ এপ্রিল গ্রাহক স্বার্থসংরক্ষণ কেন্দ্র (সিআইপিসি) গঠন করে। পরিধি বাড়তে থাকায় পরে একে ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস (এফআইসিএসডি) নামে পূর্ণাঙ্গ বিভাগে রূপ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বাড়ছে অভিযোগ। ব্যাংকের সেবা পেতে কোনো ধরনের হয়রানি বা প্রতারণার শিকার হলেই গ্রাহকরা বাংলাদেশ ব্যাংকের এফআইসিএসডি বিভাগে অভিযোগ করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিআইপিসি চালুর পর থেকে গত বছর পর্যন্ত এফআইসিএসডিতে অভিযোগ করেছেন ২৫ হাজার ৬৫৬ গ্রাহক। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ২৫ হাজার ৬৪৮টি অভিযোগ। অভিযোগ নিষ্পত্তির হার ৯৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
এ সময় লিখিত অভিযোগের সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৮৬১টি, যার মধ্যে ১৪ হাজার ৮৫৩টিই নিষ্পত্তি হয়েছে। অন্যদিকে একই সময়ে টেলিফোনে আসা অভিযোগ ছিল ১০ হাজার ৩৯৬টি, যার সবই নিষ্পত্তি হয়েছে। একই সময়ে অনলাইনে প্রাপ্ত অভিযোগের সবকটি নিষ্পত্তি হয়েছে। এ সময় পর্যন্ত অনলাইনে আসা প্রাপ্ত অভিযোগ ছিল ৩৯৯টি।