যানজট স্বাভাবিক জীবনকে অস্বাভাবিক করে তোলে

খোন্দকার জিল্লুর রহমান

সময় ক্ষেপন, কাজের আস্থিরতা, মানষিক বিষন্নতা ও অনাকাঙ্খিত অপেক্ষা মানুষের উদ্দমি কর্মজীবনের গতিকে ম্লান করে আবার কখনো কখনো পুরোপুরি নষ্টও করে ফেলে। এটা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। যানজটে বসে থাকলে মানসিক চাপ তৈরি হয়। নানা রকম দুশ্চিন্তা ভর করে। ব্যক্তির কর্মদক্ষতা ও কর্মস্পৃহা নষ্ট হয়ে যায়। জাতীয়ভাবে মানুষ হারায় স্বাবাভিক জীবন চলার মানষিক শক্তি, আসে জীবনের প্রতি দীক্কার, নষ্ট হয় আত্মবিশ্বাস।
যানজটে আটকে থেকে ৭৩ শতাংশ মানুষই নানা ধরনের স্বাস্থ্য-সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে। যানজটের কারণে আর্থিক ক্ষতি এবং সময় অপচয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চোখের রোগ, শব্দ ও বায়ুদূষণ। এতে শারীরিক ও মানসিক দিক থেকেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শহর ও নগরবাসী। উচ্চশব্দের কারণে বিপুলসংখ্যক শিশুর শ্রবণশক্তি হ্রাস পাচ্ছে। তবে যাজটের কারনে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে স্কুলগামী শিশু আর ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা।
দীর্ঘক্ষণ যানজটে আটকে থাকায় প্রথমিকভাবে প্রচণ্ডভাবে মানসিক চাপ তৈরি হয়। সেখান থেকে নানা দুশ্চিন্তা ভর করে। এতে ব্যক্তির কর্মদক্ষতা ও কর্মস্পৃহা ভিষনভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ যানজটে আটকে থাকায় সন্দেহ, পারিবারিক কলহ,স্মৃতিভ্রমসহ অনেক সময় পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যওয়ার মত ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। যানজটের প্রভাবে ধৈর্য্যহারা হতেহতে একটা সময়ে মানুষ পারিবারিক কলহের জেরে বিবাহ বিচ্ছেদ মারামারিসহ খুনাখুনের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। এ ছাড়াও কোমর ব্যথা, গিটে ব্যথা, মাথায় যন্ত্রণা, বমিভাব স্বাসকষ্টসহ নানা রকম স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও পড়ছে বেশিরভাগ কর্মজীবি মানুষ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারাহ্থ দীবা বলেন, যানজটের কারণে মানসিক অশান্তি তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে পরিবারসহ বিভিন্ন সামাজিক সম্পর্কে। ব্যক্তির কর্মদক্ষতা ও কর্মস্পৃহা নষ্ট হয়ে যায়। যে চালকেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটানা গাড়ি চালান, তাদের দুর্ঘটনা ঘটানোর আশঙ্কা বেশি থাকে। আর উচ্চমাত্রার শব্দদূষণের ফলে দীর্ঘস্থায়ী বধিরতা তৈরি হতে পারে।
সম্প্রতি বুয়েটের এআরআই ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখাগেছে, যানজটের ফলে মানসিক স্বাস্থ্যে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করছে। যানজট ৯ ধরনের মানবিক আচরণকে প্রভাবিত করছে। দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব থেকে শুরু করে সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মতো বিষয়গুলো যানজটে প্রভাবিত হচ্ছে। যানজটে সময় এবং আনষিক চাপের কারনে মানুষের জীবনের ঊৎপুল্লতা ও ঊদ্ভাবনি সম্বাবনার যে প্রয়োজন তা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সামাজিক অবক্ষয় ক্রমান্ময়ে গ্রাসকরে পেলেছে পুরো জাতীকে। পর্যাপ্ত অবসর, স্থির চিন্তাভাবনা, চিত্তবিনোদন সহ শারিরিক ও মানষিক অবস্থান টিকিয়ে রাখার জন্য মানুষ প্রয়োজনীয় বিশ্রামের সময় পাচ্ছে না। স্বজন এবং অন্যের সাথে ‘ন্যায্য’ আচরণের পরিবর্তে দুর্ব্যবহার করছে ভুক্তভোগীরা। আবার দুর্ঘটনায় আহত বা সঙ্কটনাপন্ন রোগীদেরও সময় মতো হাসপাতালে নিতে না পারার কারনে পথেই মৃত্যু হচ্ছে অনেক মানুষের, যার কারনে সাধারন জনগন প্রশাসন, সামাজিক অবস্থানে থাকা ও রাষ্ট্রিয় দায়িত্বশীল নীতি নির্ধারকদের প্রতি দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়াশিল হয়ে উঠে। গত বছর সারা দেশে সাড়ে ছয় হাজার দুর্ঘটনায় উদ্ধার করা ১১ হাজার ৫০০ জনের মধ্যে আড়াই হাজার মানুষের মৃত্যুর পেছনেও অন্যতম কারণ হিসেবে যানজট দায়ী। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, যানজটের কারণে ঢাকায় দৈনিক ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা, এটা একটা উন্নয়নশীল দেশের ও জাতীয় উন্নয়নের পথে অশনি সংকেত বা অন্তরায় হিসাবে কাজ করে, যা কখনোই কাম্য নয়।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মানসিক রোগ বিভাগের প্রধান ডা: অধ্যাপক আব্দুল্লাহ্ আল মামুন বলেন, প্রতিদিন একজন শিক্ষক ধানমন্ডি থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে আসার জন্য বাসা থেকে ৯টায় বের হন। আসতে তার সময় লাগে আধা ঘণ্টা। রাস্তায় বেরহয়ে হয়ে দেখলেন, শাহবাগে যেকোনো কারণে হোক প্রচণ্ড যানজট লেগে আছে। ওই দিন ওই শিক্ষকের ১০টায় পরীক্ষার ডিউটি আছে। ওই সময় উনার অবস্থা কী হবে! তিনি আরো বলেন, একজন শিক্ষার্থীর পরীক্ষা সকাল ১০টায় শুরু হবে। যেতে আধা ঘণ্টা সময় লাগবে। এক ঘণ্টা সময় হাতে নিয়ে বাসা থেকে বের হলো। কিন্তু রাস্তায় গিয়ে দেখল স্বাভাবিকের চেয়ে প্রচণ্ড যানজট লেগে আছে, তখন ওই শিক্ষার্থীর মনের অবস্থা কী হবে! এখন প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রায় এ রকম অবস্তা। এতে প্রচণ্ডভাবে মানসিক চাপ তৈরি হয়। ওই মানসিক চাপ থেকে নানা জটিল রোগের সৃষ্টি হয়।
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র ‘নিটোর’ সাবেক পরিচালক ডা:অধ্যাপক মুহম্মদ সিরাজ-উল-ইসলাম বলেন, যানজটের কারণে সব রোগই হতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, কেহ কেহ যানজটে এসি গাড়িতেও ঘামছে। এগুলি তাদের টেনশন এবং চিন্তার, কারণযে সময় মতো কাজে পৌঁছাতে পারবে কিনা আর এর প্রভাব পড়ে তার শরীরে ও মনে। যানজটে বসে থাকলে মানসিক চাপ তৈরির ফলে নানা রকম দুশ্চিন্তা ভর করে এই দুশ্চিন্তা মানসিক চাপ সব ধরনের রোগের সুত্র, এর ফলে মানুষের মেজাজ খিটখিটে ও যুদ্ধংদেহী মনোভাব তৈরি হয়। প্রকৃতভাবে যানজট আমাদের জীবনকে খুব জটিল করে দিচ্ছে। সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই, থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতে মানুষ অসুস্থ হলে তাকে তিন মিনিটে সেবা দেয়। কিন্তু আমাদের দেশে ৩০০ মিনিটেও সেটি পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ আছে।
সর্বশেষ এহেন পরিস্থিতি থেকে উত্তরন পেতেহলে সরকার, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহীনি, বিভিন্ন সেবামুলক সংস্থাসহ দেশের স্বচেতন জনগুষ্টি একত্রিত হয়ে যদি সুন্দরভাবে কাজ করে যায়, তবেই সুস্থ-স্ববল, সুশৃঙ্খল ও একটি উন্নত জাতী হিসাবে আমাদের প্রত্যাশা পুরণ হবে।
লেখক : সম্পাদক প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন ও মানবাধিকার কর্মী।