৭ই মার্চের ভাষণ এখন বিশ্ব সম্পদ : ফজলুল হক খান

যুগে যুগে বিশ্বের নির্যাতিত, নিষ্পেষিত, অধিকার বঞ্চিত মানুষের ত্রানকর্তা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছেন জনা কয়েক মহাপুরুষ। যাঁরা ক্ষনজন্মা, দশকে জন্মায় না, শতকেও নয়, সহ¯্রাব্দে হয়তবা দু’চারজন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তাদেরই একজন। যাঁরা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত অসহায় মানুষগুলোকে সংগঠিত করেছেন, রাজনৈতিকভাবে সচেতন করেছেন, অধিকার আদায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। শাসকের রক্তচক্ষু, নির্যাতন, জেল-জুলুম এমনকি মৃত্যুকে উপেক্ষা করে তাঁরা কেবল সংগ্রামই করেননি তাঁদের অপূর্ব বক্তৃতার দ্বারা মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন। তাঁদের সংগ্রামী আহবানে নির্যাতিত, নিষ্পেষিত মানুষগুলো জীবন দিতেও কুন্ঠাবোধ করেনি। তাঁদের একটি ভাষণ পাল্টে দিয়েছে একটি দেশের মানচিত্র, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত। এসব মহাপুরুষদের অসংখ্য কথার মাঝে দু’একটি কথা যেমন বানীতে রূপান্তরিত হয়েছে তেমনি অসংখ্য বক্তৃতার মাঝে কোন একটি বক্তুতা ঐতিহাসিক ভাষণ হিসাবে ঠাই করে নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। তবে এর সংখ্যা খুব বেশী নয়, হয়তবা দশের মত হবে।

এসব ভাষণের মধ্যে একটি পেট্রিক হেনরির “আমাকে স্বাধীনতা দাও, নয়তো মৃত্যু।” ১৭৭৫ এর ২৩ শে মার্চ তৎকালীন ভার্জিনিয়া রাজ্যের শাসক পেট্রিক হেনরি রিমেন্ডের সেন্ট জন চার্চে উপস্থিত স্থানীয় নেতা আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন ও জর্জ ওয়াশিংটন এবং সর্বস্তরের জনগনের উদ্দেশ্যে ব্রটিশ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ডাক দেন। যুগ যুগ ধরে বিপ্লবের যে চেতনা ভার্জিনিয়াবাসীর হৃদয়ে ছাইচাপা আগুনের মত জ্বলছিল, তাই যেন স্ফুলিঙ্গ হয়ে ধরা দেয় পেট্রিক হেনরির সাহসী এক উচ্চারনে। তাঁর ভাষনের শেষ পর্যায়ে তিনি ছুড়ে দেন এক ঐতিহাসিক প্রশ্ন, “জীবন কি এতই প্রিয় আর শান্তি কি এতই মধুর যে, শিকল আর দাসত্বের দামে তাকে কিনতে হবে?” এ প্রশ্নের সঘোষিত উত্তরই যেন তাঁর অমর বানী। আমি জানিনা অন্যরা কোন পথ বেছে নেবে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে বলব “আমাকে স্বাধীনতা দাও, নয়তো মৃত্যু।” পেট্রিক হেনরির এই আবেদনে ব্যাপক সাড়া ফেলে উপস্থিত জনতার মাঝে। বৃথা যায়নি হেনরির সাহসী উচ্চারন।

নিগ্রোদের অধিকার আদায়ে আপোষহীন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন আফ্রিকান মার্কিন মানবাধিকার কর্মী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। আমেরিকায় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অহিংস আন্দোলনের জন্য ১৯৬৪ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। তাঁর বিখ্যাত ভাষন “আই হ্যাভ এ ড্রিম” ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ভাষনগুলোর একটি। তিনি তাঁর ভাষণের এক পর্যায়ে বলেছেন, “ আমি স্বপ্ন নিয়ে এসেছি। একদিন অ্যালাবামায় ছোট ছোট কৃষ্ণাঙ্গ বালক-বালিকারা শ্বেতাঙ্গ বালক-বালিকাদের হাত মেলাবে, ভাইবোনের মত। একদিন প্রতিটি উপতক্যা উন্মুক্ত হবে। জানি মুক্তি আমাদের আসবেই। সেই দিন খুব বেশী দুরে নয় এবং সেই দিন ইশ্বরের সকল সন্তান গেয়ে উঠবে ‘এ আমার দেশ, স্বাধীনতার স্বর্গভূমি। স্বাধীনতার ঘন্টা বাজতে থাকুক সমগ্র আমেরিকা জুড়ে।” তাঁর এ স্বপ্ন সফল হয়েছে, স্বার্থক হয়েছে তাঁর সংগ্রাম।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৬তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন। ১৮৬১ সালে গৃহযুদ্ধ কালে তাঁর অবদানের কারনে দ্বিখন্ডিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায় আমেরিকা। ১৮৬৩ সালের ১৮ নভেম্বর গেটিসবার্গে তিনি যে ভাষণ দেন সেটিই ঐতিহাসিক গেটিসবার্গের ভাষন নামে খ্যাত- যা আমেরিকার জন্য এক মুল্যবান দলিল। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তাঁর ভাষণে স্বাধীনতার জন্য আত্মউৎসর্গকারীদের অবদানকে স্মরন করে বলেন, “আমরা এখানে যাই বলিনা কেন পৃথিবী হয়তো সেটি বেশিদিন স্মরন রাখবেনা। দৃষ্টিও দেবে খুব সামান্য। কিন্তু আমাদের বীর সন্তানদের কার্যকলাপ কখনও স্মৃতির পাতা থেকে বিস্মৃত হবে না। বরং তাদের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার জন্য আমাদের বেচে থাকতে হবে। নিজেদের উৎসর্গ করতে হবে প্রতিনিয়ত। আমাদের বীর সন্তানরা নিষ্ঠার জন্য চরম মুল্য দিয়ে গেছেন। আমাদের উচিৎ সেই নিষ্ঠা মনের মধ্যে লালন করা।” এখান থেকে আজ আমরা দৃঢ় সংকল্প গ্রহন করব যাতে করে তাদের আত্মত্যাগ বৃথা না যায়। যেন এই জাতি বিধাতার কৃপায় স্বাধীনতার নবজন্ম লাভ করে। তাঁর বিখ্যাত উত্তি “এড়াবৎহসবহঃ ড়ভ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব, নু ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব, ভড়ৎ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব” গেটিসবার্গের ভাষনেরই অংশ।

মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন.এফ.কেনেডীর সংসদে উদ্বোধনী ভাষণ মার্কিনীদের কাছে আর এক মুল্যবান দলিল। মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করতে গিয়ে তিনি বলেন, আজ আমাদের এটা ভুলে যাওয়ার স্পর্ধা করা উচিৎ নয় যে আমরা সেই প্রথম বিপ্লবের উত্তরাধিকারী। আজ এই সময় এই স্থান থেকেই বন্ধু শত্রু উভয়ের নিকটেই এই বার্তা সমানভাবে পৌছে যাক যে সেই মশাল এমন এক নতুন প্রজন্মের আমেরিকানদের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে যারা এই শতাব্দীতে জন্মেছেন, যুদ্ধের আগুনে দ্বগ্ধ হয়ে দৃঢ় হয়েছেন, একটি কঠোর ও তিক্তাতাপূর্ণ শান্তির দ্বারা শৃংখলাবদ্ধ হয়েছেন এবং যারা প্রাচীন ঐতিহ্যের বিষয়ে গর্ববোধ করেন———। তিনি আরও বলেন, বিশ্বের অর্ধেক স্থানের গ্রামে ও কুঠীরে বসবাসরত যে সকল মানুষ গনদুর্দশার বন্ধন ছিড়ে বেরিয়ে আসতে লড়াই করেছেন তাদের উদ্দেশ্যে আমরা অঙ্গীকার করছি যে, যত সময়ের প্রয়োজন হোক না কেন তারা যাতে নিজেরাই নিজেদের সাহায্য করতে পারেন সেই জন্য আমরা তাদের সাহায্য করার সেরা প্রয়াস করব-যত সময় ধরেই প্রয়োজন হোক না কেন? কমিউনিষ্টরা তাদের সাহায্য করেছে সেই কারনে নয়, কিংবা তাদের ভোট চাওয়ার জন্যও নয়, কারন এটা তাদের অধিকার। একটি স্বাধীন সমাজ যদি অগনিত দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করতে না পারে, তাহলে তারা ধনী ব্যক্তিদেরও বাচাতে পারবেনা।

উইনষ্টল চার্চিল সামরিক ও রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্যবার ভাষণ দিলেও ১৯৪০ সালের ১৩ই মে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ভাষনটি উইনষ্টল চার্চিলকে স্মৃতির পাতায় অমর করে রেখেছে। এই ভাষণ ইংল্যান্ডের রাজনীতিতে আমুল পরিবর্তন আনে। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে উইনষ্টল চার্চিলের আগ্রাসী ভুমিকা এবং জার্মানির প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের কারনে জার্মানির সঙ্গে যেকোন আপোষের ক্ষেত্রে সরাসরি বিপক্ষে অবস্থান করেন। তার ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন, যারা এই সরকারে মন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছেন তাদের আমি বলেছি আর এই মহান সংসদকেও বলছি, দেওয়ার মত আমার কিছু নেই। আছে শুধু রক্ত, কষ্ট, শ্রম আর ঘাম। আমাদের সামনে অগ্নিপরীক্ষা, আমাদের মাসের পর মাস যুদ্ধ করতে হবে আর কষ্ট করতে হবে। ——- যদি প্রশ্ন কর আমাদের লক্ষ্য কি, তবে শুনে রাখ একমাত্র বিজয় ছাড়া আমাদের আর কোন লক্ষ্য নেই। পথ যতই দীর্ঘ কিংবা কঠিন হোক বিজয় ছাড়া আমরা অন্য কিছু ভাবছি না। বিজয় ছাড়া আমাদের কোন পথ খোলা নেই। তার এ ভাষন ইংল্যান্ডবাসীকে এমনভাবে উদ্ধুদ্ব করেছিল জার্মানদের পরাজিত না করে তারা ঘরে ফিরেনি।

১লা সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে শুরু হওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন মাঝপথে। বিশ্বযুদ্ধের দাবানলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে মানবসভ্যতা, বাজছে যুদ্ধের দামামা। কেউ লড়ছে গনতন্ত্র রক্ষায়, কেউ নিজ ভূখন্ড রক্ষায়, আগ্রাসী শক্তি লড়ছে একের পর এক দেশ জয়ের নেশায়। এমন এক প্রেক্ষাপটে তৎকালীন ভারতবর্ষে দেখা গেল এক বিপরীত চিত্র। হিংসা নয়, বিদ্বেষ নয়, আক্রমন নয়- ত্যাগ আর ভালবাসাকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে এক অভূতপূর্ব সংগ্রামের ডাক দিলেন মহাত্মা গান্ধী। ব্রিটিশপন্য বর্জনের উদাহরন সৃষ্টি করতে ইংল্যান্ডের স্যুটকোট ফেলে গায়ে তুলে নেন দেশীয় চরকায় বোনা তাতের ধুতি আর চাদর। অনেকেই তখন ভেবেছিলেন গান্ধীর দর্শনে মহাপরাক্রমশালী ব্রিটিশদের কখনও বিতাড়ন করা যাবে না। তারা মনে করতেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রমের বিকল্প নেই। কিন্তু গান্ধী তার অহিংস আন্দোলনের প্রতি ছিলেন অবিচল। শত সহ¯্র প্রতিকুলতা এবং হুমকির মুখেও নিজ দর্শন থেকে এক চুলও নড়েননি মহাত্মা গান্ধী। ১৯৪৭ সালের ৮ই আগষ্ট তৎকালীন বোম্বের গাওলিয়া ট্যাক ময়দানে তিনি ব্রিটিশদের ভারত ছেড়ে যাওয়ার আহবান জানান-যা ভারত ছাড় বা কুইট ইন্ডিয়া বক্তৃতা নামে ইতিহাসে ঠাই করে নিয়েছে।

নেলসন ম্যান্ডেলা সর্বগ্রাসী বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সফল সংগ্রামের এক নাম। কৃষ্ণাঙ্গ এই নেতার মুল সংগ্রাম ছিল কৃষ্ণাঙ্গদের উপর শেতাঙ্গের বর্ণবাদী আচরনের বিরুদ্ধে। শাসকের রক্তচক্ষু, নির্যাতন, জেল-জুলুম এমনকি মৃত্যুকে উপেক্ষা করে তিনি কেবল নিজেই সংগ্রাম করেননি বরং তার অপূর্ব বক্তৃতার দ্বারা উজ্জীবিত করেন পৃথিবীর সব শোষিত মানুষকে। তাই ম্যান্ডেলা কেবল দক্ষিন আফ্রিকার নেতা নন, যেকোন অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের এক সার্থক প্রতীক, এক অনন্য প্রতিষ্ঠান। রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহু ভাষন দেন যা একাধিকবার শাসকদের ভিত কাপিয়ে তোলে। কখনও সংগ্রাম, কখনও আত্মত্যাগ, কখনও বা একাত্মতার জন্য ক্ষমা করার আহবান সংবলিত তার প্রতিষ্ঠিত ভাষণ ইতিহাসের মুল্যবান সম্পদ। তবে ১৯৫৩ সালের ২১ শে সেপ্টেম্বর আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের সভাপতি হিসাবে নেলসন ম্যান্ডেলার বক্তৃতাটি ইতিহাসে স্মরনীয় হয়ে আছে। ছন্দময় এবং কাব্যিক এই বক্তৃতায় ম্যান্ডেলা শত প্রতিকুলতার মাঝেও জনগনের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিজেদের শক্তি সম্পর্কে সচেনতাকে তাদের জন্য এক বিজয় বলে উল্লেখ করেন। সবচেয়ে বড় বিজয় বা স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে ম্যান্ডেলা উল্লেখ করেন তার অমর বানী “স্বাধীনতা অর্জনের কোন সহজ পথ নেই।”

ইতিহাসবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে পৃথিবীর সাড়া জাগানো ভাষণগুলোর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসাবে বিবেচিত। ১৮ মিনিটের সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি ছিল যেমন ছন্দময় এবং কাব্যিক তেমনি ছিল হৃদয়গ্রাহী ও মর্মস্পর্শী। ১৯৭১ এর ৭ই মার্চের ভাষণটি বিশ্লেষন করে মার্কিন ম্যাগাজিন নিউজ উইক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে ‘রাজনৈতিক কবি’ উপাধি দিয়েছেন। ১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চের ৭ তারিখে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া সেই ঐতিহাসিক ভাষণকে ‘বিশ্বের প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেসকো)। ফলে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ ইউনেসকোর ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার’ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটা বাঙালী জাতির জন্য এক পরম পাওয়া। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ আজ শুধু বাঙালী জাতির সম্পদ নয়, বিশ্বসম্পদ। বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষণের শুরুতেই বলেন, “আজ দু:খ ভরাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সকলেই জানেন এবং বুঝেন আমরা জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দু:খের বিষয় আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ অধিকার চায়।” এরপর পাকিস্তান শাসনামলের ২৩ বছরের বাংলার মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করা ইতিহাস, বাংলার মুমূর্ষ নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি ‘৫২ এর ভাষা আন্দোলন ‘৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট ‘৫৮ এর সামরিক শাসন ‘৬৬ এর ছয় দফা ‘৬৯ এর গনঅভ্যুত্থান ‘৭০ এর নির্বাচনে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ষড়যন্ত্রের কথা তুলে ধরেন তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণটি ছিল মুলত: স্বাধীনতার প্রস্তুতিমুলক ভাষন। বঙ্গবন্ধু ভাল করেই জানতেন, সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতায় হস্তান্তর করবেনা। তাই গনতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কোন বিকল্প নেই। সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষনা করলে বঙ্গবন্ধুকে বিছিন্নতাবাদী নেতা হিসাবে আখ্যায়িত করে ইয়াহিয়া খান বিশ্বজনমত তাদের পক্ষে নেয়ার চেষ্টা করবে। বঙ্গবন্ধু সে সুযোগ দেননি। অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় বিজ্ঞ রাজনীতিকের মত জাতিকে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেছেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে পাল্টে গেলো বাংলাদেশের দৃশ্যপট। বাংলাদেশ পরিচালিত হতে লাগলো ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সেদিনের ভাষন রেডিও, টেলিভিশনে প্রচার না করায় কোন বাঙ্গালী রেডিও, টেলিভিশনে যায়নি। কর্মকর্তা, কর্মচারীদের দাবীর মুখে পাকিস্তান সরকার পরের দিন বঙ্গবন্ধুর ভাষন রেডিও, টেলিভিশনে প্রচার করতে বাধ্য হয়। অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেলো কোট-কাচারী, আদালত-ফৌজদারী, অফিস, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান। এদেশের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হলো খাজনা, ট্যাক্স সবকিছুই। স্বৈরাচারী সরকারে বিরুদ্ধে গনতান্ত্রিক আন্দোলনের পাশাপাশি স্বশস্ত্র সংগ্রামের নির্দেশনা দিলেন এভাবে “প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে আমি যদিও হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।———-প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলুন এবং আমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এর কয়েকদিন আগে মতিঝিলের হোটেল পূর্বানীতে আওয়ামীলীগ পার্লামেন্টারী বৈঠক শেষে ক্ষুদ্ধ বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আগামী ৭ই মার্চ পর্যন্ত প্রত্যেকদিন সমগ্র পূর্ব বাংলায় দু’টো পর্যন্ত হরতাল অব্যাহত থাকবে। আর এর মধ্যে যদি ষড়যন্ত্রকারীরা বাস্তব অবস্থাকে স্বীকার করতে ব্যর্থ হয় তাহলে ৭ই মার্চ আমি এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করব। সত্যি বঙ্গবন্ধু সেদিন সৃষ্টি করলেন এক অনন্য ইতিহাস। সেই ইতিহাসের হাত ধরেই জন্ম নিলো স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ, একটি জাতীয় পতাকা, একটি জাতীয় সংগীত।
লেখক : গীতিকার, প্রাবন্দিক, কলাম লেখক