বিদ্যুতে আসছে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ

অর্থনীতির ৩০ দিন প্রতিনিধি :
বিদ্যুৎ খাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হচ্ছে। এ জন্য দুটি আলাদা সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। একটিতে ৩৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি, অন্যটিতে ২৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হবে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), দেশের বেসরকারি কোম্পানি সামিট পাওয়ার, মার্কিন কোম্পানি জেনারেল ইলেক্ট্রিক (জিই) এবং জাপানের মিতসুবিসি কর্পোরেশন যৌথভাবে এই বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। দুটি ভিন্ন প্রকল্পে মহেশখালীতে মোট ছয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির জন্য স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
সম্প্রতি রাজধানীতে পৃথক দুটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে সামিট এবং জিইর মধ্যে প্রথম এমওইউটি সই হয়। সামিট পাওয়ার জিইর সঙ্গে দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করবে। সামিট এবং জিইর সঙ্গে প্রকল্পটিতে জাপানের মিতসুবিসি কর্পোরেশন অংশীদার হিসেবে থাকছে। দ্বিতীয় এমওইউটি সই হয়েছে একই দিন বিকেলে রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে। যেখানে জিইর সঙ্গে পিডিবি যৌথভাবে তিন হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি করে।
উভয় এমওইউ সই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বীরবিক্রম। এছাড়া অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ বিভাগ, পিডিবি, সামিট, জিই এবং মিতসুবিসির পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পিডিবি-জিই এমওইউ
চুক্তি সই অনুষ্ঠানে জানানো হয়, তিন হাজার ৬০০ মেগাওয়াট প্রকল্পের ৫১ শতাংশ অংশীদারিত্ব থাকবে পিডিবির হাতে। বাকি শেয়ারের মধ্যে ৩০ ভাগের মালিকানা পাবে জিই। এছাড়া ১৯ ভাগ পিডিবি এবং জিইএর সমাঝোতার ভিত্তিতে অন্য কোম্পানিকে দেয়া হবে। মূল কাজের মধ্যে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা জরিপের সঙ্গে মহেশখালীতে পাঁচ হাজার ৬০০ একর ভূমি উন্নয়ন। তিন হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রর নির্মাণ ও পরিচালনা, এলএনজি আমদানি অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। তবে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ভূমি উন্নয়ন করা যাবে।
অনুষ্ঠানে ১৯ ভাগ শেয়ার অন্য কোম্পানিকে হস্তান্তরের কথা বলা হলেও পিডিবি বলছে এখনও সেই কোম্পানি নির্ধারণ করা হয়নি। প্রকল্পটির ভূমি উন্নয়নে এক দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলার এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে দুই দশমিক আট বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হবে। দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। জিই পাওয়ারের প্রেসিডেন্ট ও সিইও রাসেল স্ট্রোকস এবং পিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ স্ব স্ব পক্ষে এমওইউতে সই করেন।
ভূমি উন্নয়ন এবং সমীক্ষার পর মূল চুক্তি সই হবে। মূল চুক্তি সইয়ের পর ৩৬ মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে আসবে। তবে এমওইই সইয়ের পর মূল চুক্তি সই করতে বেশি সময় নেয়া হয়। সম্প্রতি পিডিবি একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য যৌথ মূলধনী কোম্পানি গঠন চুক্তি করেছে। চীনা হুদিয়ান হংকং কোম্পানি (সিএইচডিএইচকে) এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ২০১২ সালে এমওইউ সই করে। আর চলতি বছর ৬ মে যৌথ মূলধনী কোম্পানি গঠন চুক্তি হয়।
চুক্তি সই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, এলএনজির পাশাপাশি কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো এগিয়ে নিতে হবে। তিনি বলেন, আমরা আশাকরি ১০ বছর পর বাংলাদেশ গ্যাস টার্বাইন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারবে। এ জন্য তিনি দেশীয় প্রকৌশলীদের উৎকর্ষ সাধনে জিইর সহায়তা চান।
যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া স্টিফেনস বার্নিকার্ট বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক এই সমঝোতার মাধ্যেম আরও জোরালো হবে। বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর অধীনে ভারসাম্য রেখে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে নানাভাবে চেষ্টা করছে। জিইর সঙ্গে এই অংশীদারিত্ব সরকারের লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখবে। এটি সরাসরি সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ আমেরিকার।
অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস, জিই পাওয়ারের প্রেসিডেন্ট ও সিইও রাসেল স্ট্রোকস এবং পিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ বক্তব্য রাখেন।
সামিট-জিই সমঝোতা
অন্যদিকে রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে দেশের বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সব থেকে বড় কোম্পানি সামিট পাওয়ার জেনারেল ইলেক্ট্রিক (জিই) কোম্পানি ও জাপানের মিতসুবিসি কর্পোরেশন মিলে তিন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি করেছে। দেশীয় মুদ্রায় এই বিনিয়োগের পরিমাণ ২৪ হাজার কোটি টাকা।
প্রকল্পের আওতায় জিইর প্রধান পণ্য ৯এইচএ গ্যাস টারবাইন ব্যবহার করে ৬০০ মেগাওয়াট করে মোট দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার চারটি ইউনিট নির্মাণ করা হবে। এখানে মোট তিন লাখ ৮০ হাজার ঘনমিটার গ্যাস মজুদ ক্ষমতার দুটি এলএনজি টার্মিনাল, এক লাখ মেট্রিক টন ক্ষমতার একটি তেলের সংরক্ষণাগার এবং ৩০০ মেগাওয়াটের একটি ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান, মিতসুবিসি কর্পোরেশনের ইনফ্রাস্ট্রাকচার বিজনেস ডিভিশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তেতসুজি নাকাগাওয়া, জিই পাওয়ারের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রাসেল স্টোকস স্ব স্ব কোম্পানির পক্ষে চুক্তিতে সই করেন।
অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বেসরকারি অন্য কোম্পানিকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সঞ্চালন এবং বিতরণে বেসরকারি অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাই। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী ছাড়াও সামিট, জিই এবং মিতসুবিসির কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, সরকার মহেশখালীতে বিদ্যুৎ হাব নির্মাণ করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। শুরুতে মহেশখালীতে ১০ হাজার মেগাওয়াটের কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ঘোষণা দেয়া হয়। তবে পরবর্তীতে কয়লার পাশাপাশি সেখানে এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৫০ ভাগ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসাতে এলএনজিকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে মাতারবাড়িতে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি একটি ১২০০ মেগাওয়াটের কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু করেছে।