
অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
বীমা খাতের দেশের এক সময়ের শীর্ষস্থানীয় বীমা প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি এখন গ্রাহকের বীমা দাবি মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। ২০২৫ সালের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটির বকেয়া বীমা দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ২২৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। বিপুল অঙ্কের এই পাওনা পরিশোধ না হওয়ায় লাখ লাখ গ্রাহকের মধ্যে চরম আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটির মোট বীমা দাবির সংখ্যা ৬ লাখ ২৪ হাজার ৬৯২টি। এর মধ্যে মাত্র ৫৮ হাজার ২১৫টি দাবি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বাকি ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৪৭৭টি দাবি এখনো অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে।
টাকার অঙ্কে মোট দাবির পরিমাণ ৩ হাজার ৪৪২ কোটি ২৮ লাখ টাকা হলেও পরিশোধ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ২ হাজার ১৪৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। জানা যায়, দাবির বড় একটি অংশই এখনো পরিশোধ করেনি কোম্পানিটি।
আর্থিক সংকটের মধ্যেও কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে লাগাম টানা যাচ্ছে না। আইন অনুযায়ী যেখানে কোম্পানিটির সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা ব্যয় ৫২ কোটি ১৫ লাখ টাকার মধ্যে থাকার কথা, সেখানে বাস্তবে ব্যয় করা হয়েছে ৮০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। নির্ধারিত সীমার চেয়ে প্রায় ২৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় কোম্পানির আর্থিক ভিত্তিকে আরও নড়বড়ে করে তুলেছে।
ফারইস্ট লাইফের আর্থিক প্রতিবেদনের সবচেয়ে আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে এর ‘লাইফ ফান্ড’ বা বীমা তহবিলে। বর্তমানে কোম্পানিটির লাইফ ফান্ড বা বীমা তহবিল ৮৪৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ঋনাত্মক। সাধারণত গ্রাহকদের প্রিমিয়ামের টাকা দিয়ে এই তহবিল গঠিত হয়, যা থেকে পরবর্তীতে দাবি মেটানো হয়। তহবিল ঋনাত্মক হওয়ার অর্থ হলো, গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ করার মতো পর্যাপ্ত নগদ অর্থ বা সম্পদ কোম্পানিটির হাতে নেই। বর্তমানে কোম্পানিটির মোট সম্পদের পরিমাণ ৩ হাজার ১৬২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং বিনিয়োগ রয়েছে ১ হাজার ৮৪৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
ফারইস্ট লাইফের বর্তমান দুর্দশার মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের নজিরবিহীন দুর্নীতি ও অনিয়ম। বীমা আইডিআরএ এবং বিএসইসি’র বিভিন্ন সময়ের তদন্তে উঠে এসেছে যে, কোম্পানিটির সাবেক চেয়ারম্যান এম এ খালেক এবং সাবেক পরিচালক নজরুল ইসলামসহ একটি প্রভাবশালী চক্র গ্রাহকের কয়েক হাজার টাকা আত্মসাত ও পাচার করেছেন।
ভুয়া জমি ক্রয়, উচ্চমূল্যে ভবন কেনা এবং বিভিন্ন নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের নামে এই অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়। বিশেষ করে জমি কেনার নামে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম খুঁজে পেয়েছিল নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাটের কারণেই মূলত কোম্পানিটির লাইফ ফান্ড শূন্য হয়ে পড়ে এবং সাধারণ গ্রাহকরা তাদের জমানো টাকা ফেরত পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে থাকেন।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি বীমা কোম্পানির লাইফ ফান্ড ঋনাত্মক হওয়া এবং হাজার কোটি টাকার দাবি বকেয়া থাকা চরম অব্যবস্থাপনার লক্ষণ। এতে শুধু একটি কোম্পানি নয়, বরং পুরো বীমা খাতের ওপর সাধারণ মানুষের অনাস্থা তৈরি হচ্ছে।
বীমা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত বীমা দাবি নিষ্পত্তি না হলে এবং আইন বহির্ভূত ব্যবস্থাপনা ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কোম্পানিটি দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ-র কঠোর হস্তক্ষেপ এবং আত্মসাতকৃত অর্থ উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ৫ লাখেরও বেশি গ্রাহকের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আব্দুর রহিম ভূঁইয়া একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার একটি সূত্র দাবি করেছে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফের কার্যক্রমের ওপর বিশেষ নজরদারি রয়েছে।












