সব প্রতিষ্ঠানে শিশু দিবাযতœ কেন্দ্র চালু করা উচিত

নিজস্ব প্রতিবেদন
বাংলাদেশ ব্যাংকে ১৯৮৮ সালে সহকারী পরিচালক পদে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করি। সে সময় আমাদের ব্যাচে ১১ জন নারী একই পদে যোগ দেন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে আমি পদোন্নতি পেয়ে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। এর আগে আরও দুজন নারী কর্মকর্তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। আশা করা যায়, ২০২০ সালের মধ্যে বেশ কয়েকজন নারী কর্মকর্তা এ পদে আসতে সক্ষম হবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকে একজন কর্মকর্তাকে কর্মকর্তা হিসেবেই মূল্যায়ন করা হয়, নারী কিংবা পুরুষ কর্মকর্তা হিসেবে নয়। কর্মজীবনে আমি এমন অনেক বিভাগে কাজ করেছি যেখানে বিভিন্ন স্থান ও প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে পরিদর্শনে যেতে হয়েছে। কাজের প্রয়োজনে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী অফিসের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে নারী কর্মকর্তাকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখলে বিস্তৃত পরিসরে এসব কাজ করার সুযোগ হয়ত পেতাম না। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অনেক নারী কর্মকর্তা মহাব্যবস্থাপক (জিএম) হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন।
গত ৩০ বছরে আমাদের সমাজ ও কাজের পরিবেশে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। অতীতে যৌথ পরিবারে বসবাস না করলে চাকরি করা নারীদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল। ১৯৮৮ সালে মোবাইল ফোন তো দূরে থাক, টিএন্ডটি ফোনই দুর্লভ ছিল। সন্তানকে গৃহকর্মীর কাছে রেখে এলে সারাদিন কোনো খবর নেওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। সন্তানের দেখাশোনা ও নিরপত্তার বিষয়টি নারীর কর্মজীবনে বড় অন্তরায় হয়ে দেখা দিত। শিশু দিবাযতœ কেন্দ্রের বিষয়টি তখন কল্পনা করা যেত না। ব্যক্তিগতভাবে আমি সন্তান পালন ও পরিবারের সব কাজে স্বামীর সর্বাত্মক সহযোগিতা পেয়েছি। ফলে যৌথ পরিবারে বসবাস না করেও ক্যারিয়ারে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি। তবে পরিবার ও পেশা জীবনে ভারসাম্য রক্ষায় শুধু যৌথ পরিবার বা স্বামীর আনুকূল্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে কিছু বিকল্প পদ্ধতি প্রচলনের সময় এসেছে। এখন সব প্রতিষ্ঠানে শিশুর জন্য নির্ভরযোগ্য দিবাযতœ কেন্দ্র চালু করা উচিত। এটা খুবই দরকারি, দিবাযতœ কেন্দ্রে শিশুকে রেখে মা বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন। এছাড়া মানসম্পন্ন দিবাযতœ কেন্দ্রের নিশ্চয়তা নারীকে প্রশান্তিতে কর্মক্ষেত্রে মনোনিবেশ করতে উৎসাহিত করবে। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশের স্কুলগুলোয় ‘আফটার স্কুল’ প্রোগ্রামের প্রচলন দেখি, যেখানে কর্মজীবী মায়েরা স্কুল সময়ের পরও একটু বড় শিশুদের রাখতে পারেন। আমাদের দেশেও এ ধরনের ব্যবস্থা প্রচলন করার প্রয়োজন আছে।
আমাদের সমাজে নারীদের বিভিন্ন ভূমিকা ও দায়িত্বে অবতীর্ণ হতে হয়। ফলে পরিবার ও পেশা জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে। যেসব নারী এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারেন, তারাই ক্যারিয়ারে এগিয়ে যান। সুদীর্ঘ কর্মজীবনে দেখেছি, অনেক মেধাবী নারী কর্মকর্তা দেশে ও বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণ বা উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাতিল করেন পরিবারের কথা ভেবে। ফলে তারা প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা লাভের সুযোগ হারান এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েন।
সরকার নারীর ক্ষমতায়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিদ্যালয়ে মেয়েদের অবৈতনিক পড়াশুনা ও বৃত্তির ব্যবস্থা করেছে, চাকরিতে ১০ শতাংশ কোটার ব্যবস্থা রেখেছে। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটিতে (এমআরএ) কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, প্রচুর নারী ঋণ নিচ্ছেন, স্বনির্ভর হচ্ছেন ও আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত হচ্ছেন। এসএমইতেও অবদান রাখছেন। তবে এখনও প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার কিংবা নেতৃত্বের স্থানে নারী শূন্যতা চোখে পড়ার মতো। প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে সচেতন পদক্ষেপ নেওয়ার সঙ্গে সবার সহযোগিতার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি।