ড. শাহ্ মো. আহসান হাবীব
টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং খাতের বাস্তবায়ন একটি সময়োচিত পদক্ষেপ। টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত এ ক্ষেত্রগুলোকে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা যথেষ্ট গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার দিয়ে আসছেন। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এখন দেশের ব্যাংকিং খাতের ঋণ ও ব্যাংকিং সুবিধা মূলত ব্যবহার করছে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী এবং বড় ও মাঝারি শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। নিম্নবিত্ত সাধারণ জনগণ এবং ছোট শিল্প ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এখন পর্যন্ত ব্যাংকের ঋণ ও অন্যান্য সুবিধা যথেষ্ট পরিমাণে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের প্রচেষ্টায় এবং কিছু ব্যাংকের বিশেষ দক্ষতায় সামগ্রিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। বিশেষত সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক খাত সম্পর্কিত সব নীতিমালায় এ বিষয়গুলো যথাযথভাবে প্রতিস্থাপন করেছে এবং বাংলাদেশে নিম্ন আয়ের মানুষ ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং খাতের সেবার আওতায় আনার জন্য উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের বেশকিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেশের পশ্চাত্পদ জনগণকে আর্থিক সেবার আওতায় আনার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের এসব কার্যক্রম ও পদক্ষেপ এরই মধ্যে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, পরিবেশ সম্পর্কিত সচেতনতা ও গ্রামীণ উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। এক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় পরিবর্তন এনেছে ব্যাংকিং সেবায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার। মনে করা হচ্ছে, ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিংয়ের বিকাশে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক সেবার দ্রুত উন্নয়নে এবং স্বল্প আয়ের মানুষদের কাছে আর্থিক সেবা নিয়ে পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং সেবাকে উৎসাহিত করতে হবে। সেলফোনের ব্যাপক ব্যবহার মোবাইলভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রকে সহজসাধ্য করলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এ ধরনের আর্থিক সেবাকে ব্যাংকের সঙ্গেই সম্পৃক্ত থাকতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে মোবাইল এজেন্টের মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রবণতা এ-সংক্রান্ত ঝুঁকিকে নীতিনির্ধারকদের মুখোমুখি করেছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, যদিও মোবাইল বা ব্যাংকিং এজেন্টের মাধ্যমে খুব সহজে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী এবং প্রত্যন্ত এলাকার মানুষদের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছানো সম্ভব, তবে এ ধরনের সার্বিক কর্মকাণ্ডকে আর্থিক সেবা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার নজরদারিতে থাকার প্রয়োজন আছে। বিশেষত মোবাইল এবং অন্যান্য ব্যাংকিং এজেন্টকে অবশ্যই যথাযথ নজরদারি ও দায়বদ্ধতার আওতায় আনা না হলে তারা অর্থ লেনদেনসংক্রান্ত অবৈধ কাজকর্মে লিপ্ত হতে পারে অথবা অবৈধ চক্রের সহযোগী হয়ে উঠতে পারে। এছাড়া এ-সংক্রান্ত অপরাধ মোকাবেলায়ও পর্যাপ্ত পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ আছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক খাত সম্পর্কিত সব নীতিমালায় এ বিষয়গুলো যথাযথভাবে প্রতিস্থাপন করেছে এবং বাংলাদেশে নিম্ন আয়ের মানুষ ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং খাতের সেবার আওতায় আনার জন্য উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের বেশকিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেশের পশ্চাত্পদ জনগণকে আর্থিক সেবার আওতায় আনার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের এসব কার্যক্রম ও পদক্ষেপ এরই মধ্যে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, পরিবেশ সম্পর্কিত সচেতনতা ও গ্রামীণ উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। এসব আর্থিক সেবা মূলত বিশেষ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, কৃষিঋণ, এসএমই ঋণ, ক্ষুদ্রঋণ, মোবাইল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং ইত্যাদি— যা সাধারণ নিম্ন আয়ের মানুষ ও উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য করে প্রদান করা হয়ে থাকে। এছাড়া পরিবেশ উন্নয়ন ও সংরক্ষণে বাংলাদেশ ব্যাংক গৃহীত পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং বা সবুজ ব্যাংকিং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও গ্রামীণ উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিবেশবান্ধব আর্থিক সেবা কার্যক্রম সামগ্রিকভাবে সবুজ ব্যাংকিং নামে পরিচিতি লাভ করেছে। মূলত ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে এর যাত্রা হলেও বর্তমানে বাণিজ্যিক সফলতাকেও এর সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। মূলত তিনটি বিষয় সবুজ ব্যাংকিংয়ের আওতাভুক্ত। প্রথমত. ব্যাংক এমন কিছু করবে না, যাতে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়; দ্বিতীয়ত. ব্যাংক তার সেবা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বর্তমান পরিবেশ বিপর্যয়কে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করবে এবং তৃতীয়ত. ব্যাংক এমনভাবে তার কার্যক্রম পরিচালনা করবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দুর্লভ প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ করা যায়। ব্যাংক নিজের পরিবেশের মানোন্নয়নের পাশাপাশি তার ঋণ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমেও পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে অবদান রাখতে পারে। উন্নত দেশগুলোয় সবুজ ব্যাংকিংয়ের কার্যক্রম নব্বইয়ের দশকে প্রসার লাভ করলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এ ধারা একটি সাম্প্রতিক ঘটনা। আশির দশকে সবুজ ব্যাংকিংয়ের যাত্রা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। ইউরোপের দেশগুলোয় এ-সংক্রান্ত উদ্যোগ এসেছে মূলত নব্বইয়ের দশকে। বাংলাদেশসহ বেশকিছু উন্নয়নশীল দেশে এ ধরনের উদ্যোগ সাম্প্রতিক ঘটনা। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো মূলত বাংলাদেশ ব্যাংক গৃহীত সবুজ ব্যাংকিং-সংক্রান্ত নীতিমালা, কৌশল ও কার্যক্রম নিয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করেছে।
পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের অন্য একটি ইতিবাচক দিক লক্ষণীয়। এ ধরনের ঋণ পরিবেশের উন্নয়ন ও সংরক্ষণের সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং গ্রামীণ উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে পরিবেশবান্ধব ঋণের বেশির ভাগ সুবিধাভোগী পুনর্নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ খাতে ঋণের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম এবং ঋণগ্রহীতারা মূলত গ্রামীণ জনপদের অংশ। বিশেষত সৌর প্যানেল ও বায়োগ্যাস খাতে পরিবেশবান্ধব ঋণ বড় ধরনের দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছে। বিআইবিএমের এক জরিপ অনুসারে দেখা গেছে পরিবেশবান্ধব ঋণগ্রহীতার ৬০ শতাংশেরও বেশি নিম্ন আয়ের গ্রামীণ মানুষ। বিভিন্ন সবুজ ব্যাংকিং সেবার মাঝে গৃহে সৌরবিদ্যুৎ বা ‘সোলার হোম সিস্টেম’ গ্রামীণ স্বল্প আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। সাধারণভাবে বাংলাদেশে ব্যাংকিং সেবা শহুরে মধ্য ও উচ্চ শ্রেণীর জন্য উপযোগী এবং বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ব্যাংকিং খাতের সেবায় সমহারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ পায় না। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক গৃহীত পদক্ষেপগুলো কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। যেমন— মোবাইল ব্যাংকিং সেবা। আবার মোবাইল ব্যাংকিং সেবাকে পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দেখা হয়। পরিবেশবান্ধব ঋণ সেবা একদিকে যেমন পরিবেশের উন্নয়নে অবদান রাখছে, অন্যদিকে সরকার তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্য অর্জনেও বিশেষ সহায়ক হচ্ছে। এছাড়া স্বল্প আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ের মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বেগবান করছে।
বিআইবিএম আয়োজিত সপ্তম বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন শুরু হচ্ছে একটি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের মাধ্যমে, যার বিষয় হলো আর্থিক খাত ও উন্নয়নের সম্পর্ক। যথারীতি দুদিনের এ আয়োজনের উদ্বোধন করেছেন বিআইবিএমের গভর্নিং বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। দেশ ও বিদেশ থেকে প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত ১০৫টি প্রবন্ধের সারসংক্ষেপ এবং পরবর্তীতে জমাকৃত ৮০টি প্রবন্ধের মধ্য থেকে ২২টি প্রবন্ধ এ সম্মেলনে উপস্থাপনের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। প্রথম দিন নির্বাচিত নয়টি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়েছে এবং আজ উপস্থাপিত হবে বাকি ১৩টি প্রবন্ধ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নারী উদ্যোক্তা তৈরিসংক্রান্ত ব্যাংকিং খাতের উদ্যোগসংবলিত একটি প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। দ্বিতীয় দিনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামাল। দুদিনের এ সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামান। এ আয়োজনে সহযোগী আয়োজক হিসেবে সায়েন্স প্রেস লিমিটেড, যুক্তরাজ্য; মিডিয়া পার্টনার হিসেবে বণিক বার্তা, এশিয়ান এজ, যমুনা টিভি, অর্থ খবর এবং অনলাইন পার্টনার হিসেবে আমরা নেটওয়ার্ক সম্পৃক্ত থাকায় বিআইবিএমের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমার বিশ্বাস, বিআইবিএমের বার্ষিক সম্মেলন ব্যাংকিং খাতের সমস্যা ও সমাধানগুলোকে উপস্থাপনের মাধ্যমে আমাদের ভবিষ্যৎ পথ চলায় নির্দেশনা দেবে। আজ আমরা সম্মেলন শেষ করব একটি সংগীত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। আগামী বছরের এমনই একটি জ্ঞানচর্চা সমাবেশে আপনাদের সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ আশা করছি।
লেখক : বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক ও পরিচালক প্রশিক্ষণ












