কসমেটিকস অ্যান্ড টয়লেট্রিজ বাজার : দেশীয় প্রতিষ্ঠানের দখল বাড়ছে

অর্থনীতির ৩০ দিন প্রতিবেদক :
বিশ্বজুড়ে কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজ বাজারে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্যের বাইরে নয় বাংলাদেশও। তবে শক্তিশালী ব্র্যান্ডগুলোর দাপট খর্ব করে দেশের বাজারে ক্রমেই নিজেদের অংশ বড় করে চলেছে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। ভোক্তারুচি ও স্বাচ্ছন্দ্যের কথা মাথায় রেখে পণ্যে বৈচিত্র্য সংযোজনের মাধ্যমে প্রসাধনসামগ্রী বাজারে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে বাংলাদেশী ব্র্যান্ডগুলো।
দেশে প্রসাধন ও পার্সোনাল কেয়ার পণ্যের বিক্রি ও প্রবৃদ্ধি নিয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, বাজার হিস্যায় এগিয়ে থাকায় এ খাতে প্রবৃদ্ধির সিংহভাগ এখনো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভারের অনুকূলে। তবে প্রাচীন এ জায়ান্টের পাশাপাশি লড়াইয়ে কোহিনূর কেমিক্যাল ও স্কয়ার টয়লেট্রিজের মতো দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পারফরম্যান্সও কম সন্তোষজনক নয়।
দেশে কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজ বাজারের আকার জানতে খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশ কসমেটিকস অ্যান্ড টয়লেট্রিজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিটিএমএ) কাছ থেকে তথ্যের পাশাপাশি পর্যালোচনা করা হয়েছে এ খাত নিয়ে এসি নিয়েলসন, লংকাবাংলা, ইবিএল সিকিউরিটিজসহ বিভিন্ন পক্ষের বেশকিছু গবেষণা প্রতিবেদন।
স্থানীয় ভোক্তাদের রুচির বৈচিত্র্য ও বিবর্তনে ভর করে বাংলাদেশে কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজের বার্ষিক বাজার এরই মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকা ছুঁয়েছে। এ বাজারের ৩৬ শতাংশ দখলে রেখে শীর্ষে রয়েছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার বাংলাদেশ। এর পরই রয়েছে কোহিনূর কেমিক্যাল ও স্কয়ার টয়লেট্রিজ। এ দুটি প্রতিষ্ঠানেরই বাজার অংশ ১২ শতাংশ করে। কোহিনূর ও স্কয়ারের মতোই পরস্পরের ঘাড়ে শ্বাস ফেলছে অপর দুটি প্রতিষ্ঠান ম্যারিকো ও এসিআই। এ দুই প্রতিষ্ঠানের দখলে রয়েছে ৯ শতাংশ করে বাজার। কেয়া কসমেটিকসের দখলে রয়েছে ৫ শতাংশ বাজার। আর বাজারের ৩ শতাংশ দখলে রেখেছে হেমাস ম্যানুফ্যাকচারিং। এছাড়া মৌসুমী কেমিক্যাল, লিলি কসমেটিকস, লালবাগ কেমিক্যালসহ আরো স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের পণ্যও বাজারে পাওয়া যায়। এর বাইরে বিদেশী নামিদামি ব্র্যান্ডের বিভিন্ন কসমেটিকস দেশে আমদানি হচ্ছে। প্রতি বছর এ খাতে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ১০-১২ শতাংশ হারে। গত চার-পাঁচ বছরে কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজের বাজারে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজার অংশীদারিত্ব অন্তত ৪-৫ শতাংশ বেড়েছে। গুণগত মানসম্পন্ন পণ্যের পাশাপাশি বিপণন কৌশল, বিজ্ঞাপন ও ভোক্তাদের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে বাজারে নিজেদের আধিপত্য বাড়ানোর চেষ্টা করছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো।
কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজের বাজারে শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার বাংলাদেশ প্রায় সব ক্যাটাগরির পণ্যই বাজারজাত করছে। এর মধ্যে সাবানের বাজারে শীর্ষ দুই ব্র্যান্ড লাক্স ও লাইফবয় ইউনিলিভারের পণ্য। ফেয়ারনেস ক্রিম ও লোশনের বাজারে শীর্ষ তিনটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হচ্ছে ইউনিলিভারের ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী, পন্ডস ও পুরুষদের জন্য ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী ম্যাক্স ফেয়ারনেস। টুথপেস্টের বাজারে শীর্ষস্থানীয় দুই ব্র্যান্ড হচ্ছে ইউনিলিভারের ক্লোজআপ ও পেপসোডেন্ট। শ্যাম্পুর বাজারে শীর্ষ তিন ব্র্যান্ড সানসিল্ক, ডাভ ও ক্লিয়ার। ডিটারজেন্টের বাজারে শীর্ষ তিন ব্র্যান্ড ইউনিলিভারের হুইল, সার্ফ এক্সেল ও রিন।
কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজের বাজারে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম কোহিনূর কেমিক্যাল কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড। সাবানের বাজারে ভোক্তাদের পছন্দের শীর্ষ তিনের অন্যতম স্যান্ডালিনা কোহিনূরের ব্র্যান্ড। তাছাড়া টয়লেট ক্লিনার ক্যাটাগরিতে দ্বিতীয় শীর্ষ ব্র্যান্ড কোহিনূরের ক্লিন মাস্টার। পাশাপাশি তিব্বত স্নো ও পমেড, তিব্বত ৫৭০ বল সাবান, ব্যাকট্রল ও আইস কুল কোম্পানিটির অন্যতম জনপ্রিয় পণ্য।
দেশের কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজের বাজার সম্পর্কে জানতে চাইলে বিসিটিএমএর প্রেসিডেন্ট ও কোহিনূর কেমিক্যালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, বর্তমানে দেশে কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজের ১০ হাজার কোটি টাকার বাজার রয়েছে। এ বাজারের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার বাংলাদেশের সক্ষমতা দেশীয় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক বেশি। বেশকিছু চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যে বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে ভোক্তাদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছে। কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজ সম্ভাবনাময় একটি খাত। এ খাতের উদ্যোক্তারা বড় অংকের বিনিয়োগের পাশাপাশি যথেষ্ট কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। এর মধ্যে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বেশকিছু দেশীয় প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। তাই দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষায় সরকারের সহযোগিতা করা উচিত। বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর বিভিন্ন ধরনের করারোপ করা প্রয়োজন। এর বিপরীতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঁচামাল আমদানিতে কর ছাড় দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি।
দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী স্কয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠান স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেড। হেয়ার অয়েলের বাজারে ম্যারিকোর পণ্য প্যারাসুটের পরই সবচেয়ে বেশি বিক্রীত ব্র্যান্ড হচ্ছে স্কয়ারের জুঁই। সাবানের বাজারে মেরিল মিল্ক সোপ বার অন্যতম জনপ্রিয় ব্র্যান্ড। তাছাড়া টয়লেট ক্লিনার ক্যাটাগরিতে স্কয়ারের শক্তি তৃতীয় শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড। বেবি কেয়ারে মেরিল বেবি পাউডার শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড। এ ক্যাটাগরিতে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জনসন অ্যান্ড জনসন।
প্রতিষ্ঠানটির বেবি ডায়াপারের ব্র্যান্ড সুপারমম বাজারে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। স্যানিটারি ন্যাপকিনের ক্ষেত্রেও স্কয়ারের সেনোরা শীর্ষে রয়েছে। শীতকালের প্রসাধনী হিসেবে মেরিল পেট্রোলিয়াম জেলি দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ ব্যবহার করে থাকে। লোশন মার্কেটে রিভাইভের অবস্থান তৃতীয়।
স্কয়ার টয়লেট্রিজের হেড অব মার্কেটিং ড. জেসমিন জামান বণিক বার্তাকে বলেন, কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজ পণ্যের ক্ষেত্রে ভোক্তাদের আস্থা অর্জন করা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য ছাড়া বাজার ধরে রাখা সম্ভব নয়। চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এ খাতের ব্যবসায় ভালো করছে। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী আমরা নিজেদের ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরিতে কাজ করছি। বাংলাদেশে বেবি ডায়াপারের সম্ভাবনাময় বাজার রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক সমীক্ষা অনুসারে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বেবি ডায়াপার ব্যবহারের দিক দিয়ে বিশ্বের মধ্যে সপ্তম স্থানে পৌঁছবে। তাই ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিকটি বিবেচনা করে আমরা হেলথ অ্যান্ড হাইজিন ক্যাটাগরির পণ্য যেমন বেবি ডায়াপার, অ্যাডাল্ট ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন জাতীয় পণ্যে গুরুত্ব দিচ্ছি। এ খাতের উন্নয়নে মূসক ও কর ছাড় সুবিধা প্রদান করা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
বহুজাতিক কোম্পানি ম্যারিকো বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হচ্ছে প্যারাসুট। হেয়ার অয়েল ক্যাটাগরিতে এটি দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানটির প্যারাসুট অ্যাডভান্স বডি কেয়ার লোশন, সেটওয়েট পারফিউম, লিভন সিল্কি অয়েল, নীহার ও হেয়ারকোড অন্যতম জনপ্রিয় পণ্য।
কেয়া কসমেটিকসের অন্যতম জনপ্রিয় পণ্যের মধ্যে রয়েছে সাবান, ডিটারজেন্ট ও পেট্রোলিয়াম জেলি। ভারতের সেভেন সিস্টারস অঞ্চলে প্রতিষ্ঠানটির কসমেটিকস পণ্যের উল্লেখযোগ্য বাজার রয়েছে।
লিকুইড অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে এসিআইয়ের স্যাভলন ভোক্তাদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে। তাছাড়া অ্যারোসলের বাজারে এসিআই দ্বিতীয় শীর্ষ ব্র্যান্ড।
বহুজাতিক কোম্পানি রেকিট অ্যান্ড বেনকিজার বাংলাদেশের জনপ্রিয় লিকুইড অ্যান্টিসেপটিক পণ্য হচ্ছে ডেটল। এছাড়া কোম্পানিটির মরটিন ব্র্যান্ড অ্যারোসলের বাজারে অন্যতম জনপ্রিয় পণ্য।
হেমাস ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হচ্ছে কুমারিকা। টুথপেস্টের বাজারে এনফোর্ডস বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পণ্য হচ্ছে মেডি প্লাস। তাছাড়া বাজারে লালবাগ কেমিক্যালের গন্ধরাজ তেল এবং কিউটের সাবান, লোশন ও ক্রিমেরও জনপ্রিয়তা রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের আগ্রাসী বিপণন ও বিজ্ঞাপন কৌশলের সঙ্গে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ঘাটতি রয়েছে। তাছাড়া বিশ্বজুড়েই ব্যবসা থাকায় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতার ঝুলি বেশ সমৃদ্ধ। তাছাড়া তাদের পণ্যের বিষয়ে ভোক্তাদের কাছে ব্র্যান্ড ইমেজ অত্যন্ত শক্তিশালী। এর মধ্যেও দেশীয় কিছু প্রতিষ্ঠান ভালো করছে। দেশে কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের প্রায় ৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তাছাড়া দেশে বিদেশী নামিদামি ব্র্যান্ডের অনেক কসমেটিকস অবৈধ পথে বাজারে প্রবেশ করছে। এর কারণে স্থানীয় উৎপাদকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মেকআপের বিভিন্ন সামগ্রীসহ কালার কসমেটিকসের মতো উচ্চমূল্যের পণ্যের বাজার পুরোটাই আমদানিনির্ভর। ফলে ভবিষ্যতে এসব ক্যাটাগরিতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।