
কৌশিক বসু :
প্রচলিতভাবে জানুয়ারিতেই বিদায়ী বছরের অর্জন কিংবা উন্নয়নগুলোর মূল্যায়ন হয়ে থাকে, যাতে করে নতুন বছরের ঝুলিতে নতুন কী জমা আছে, সে সম্পর্কে একটি অনুমানে পৌঁছানো যায়। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা সম্ভবত একটি শোভন (রাজনৈতিক ভাষায়) বাঁকবদলের বিন্দুতে রয়েছি। গত মাসে যে তথ্যগুলো প্রকাশ হয়েছে, যদিও তা বৈশ্বিক অর্থনীতির স্বল্পমেয়াদি সম্ভাবনাগুলোর ক্ষেত্রে সন্তোষজনক ভবিষ্যতের কোনো ছবি তুলে ধরে না।
গত মাসের শুরুতে বিশ্বব্যাংকের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা (গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস) প্রতিবেদন এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত নিবন্ধটির মাধ্যমে এমনই ধারণা পাওয়া যায়। ২০২০ সালে ১ দশমিক ৬ শতাংশ (২০১৮ সালের ২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কম) উন্নত অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হ্রাসের পূর্বাভাস— প্রতিবেদনটির ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশ’ উপশিরোনামের মতোই মলিন চিত্র তুলে ধরে।
এছাড়া গত সপ্তাহে ইউরোজোনের অর্থনীতির শঙ্কাকে জাগিয়ে তুলেছে ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে রয়েছে বেসামাল ব্রেক্সিট-বিষয়ক শঙ্কা, সুরক্ষাবাদের উত্থান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ এসব বিষয়— ইউরোপের ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে।
পরিস্থিতির আরো অবনতিস্বরূপ জার্মানিও প্রবৃদ্ধির শ্লথগতিতে ভুগছে। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে অর্থনৈতিক সংকোচনের হার ছিল শূন্য দশমিক ২ শতাংশ, যদিও পারচেজিং ম্যানেজার ইনডেক্স কমে দাঁড়ায় ৪৯ দশমিক ৯ শতাংশ, যা গত চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। জার্মানিকে সাধারণত ইউরোজোনের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে অভিহিত করা হয়, তবে তাদের অর্থনৈতিক সংগ্রামের তরঙ্গায়িত পতন জলপ্রপাতের মতো নিজ সীমানা ছাড়িয়ে বাইরে প্রবাহিত।

বিষয়গুলো সুনির্দিষ্টভাবেই সমস্যাবহুল, কারণ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা অর্থনৈতিক মন্দা ও সংকটের সঙ্গে লড়াইয়ের পর উন্নত অর্থনীতির এ দেশটি স্বভাবতই অর্থনৈতিক মন্থরতা প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ ফুরিয়ে ফেলেছে। ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার শূন্য, যা কিনা কমানোর আর কোনো সুযোগ নেই। আগস্ট থেকে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডও সুদহার বৃদ্ধির ঝুঁকি গ্রহণ করছে না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভও সংকেত দিয়েছে, তাদের সুদহার বৃদ্ধির গতি কম ছিল। এভাবেই একটি নতুন সংকট উন্নত অর্থনীতির সতেজ আর্থিক হাতিয়ারগুলোকে আনাড়ির মতো অকেজো করে দিতে পারে।
এদিকে উদীয়মান বিশ্বের ভবিষ্যৎ তুলনামূলক উজ্জ্বল। যদিও তাদের আকাশেও আবছা কালো মেঘের আনাগোনা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন যেমন জোর দিয়ে বলেছে, উদীয়মান অর্থনীতিগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে সরকারি ঋণ দ্বারা চাপে পড়ছে, ২০১৩ সাল থেকে সরকারি ঋণ দেশগুলোর গড় জিডিপির ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, ঋণগুলোর বেশির ভাগই ব্যক্তি ঋণদাতাদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে নেয়া হয়েছে।
আফ্রিকা সম্ভাবনাময় অর্থনীতির গতিপথে রয়েছে। আফ্রিকার ইকোনমিক আউটলুক ২০১৯ অনুসারে, মহাদেশটি কয়েক বছর ধরে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। ২০১০-১৪ সাল পর্যন্ত বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হ্রাসের মুখে পড়লেও ২০১৬ সালে এটি ছিল ২ শতাংশ। এমনকি গত বছর তাদের প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। ২০১৮ সালে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি বাড়ে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী বছর প্রবৃদ্ধির হার ৪ শতাংশেরও বেশি হতে পারে, যা ইথিওপিয়া কিংবা রুয়ান্ডার মতো বিশ্বের দ্রুততম ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি দ্বারা চালিত হবে। উল্লিখিত দেশ দুটির বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার বর্তমানে ৭ শতাংশেরও বেশি। তবুও নাইজেরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিগুলো তাদের সামর্থ্য অনুয়ায়ী প্রবৃদ্ধি অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। তাই এখন পর্যন্ত আফ্রিকাও দুর্বল উন্নত অর্থনীতির ছেড়ে যাওয়া শূন্যস্থানগুলো পূরণে সমর্থ নয়।
এক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে এশিয়া। ৩০ বছর ধরে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে সম্প্রতি উচ্চ মজুরি নিম্নপ্রবৃদ্ধির অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ায় দেশটি নতুন সমন্বয়ের পথে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া যথাক্রমে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, ৭ দশমিক ৩ শতাংশ ও ৫ দশমিক ২ শতাংশ হারে অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বিশ্বব্যাংক ধারণা করছে, ২০২০ সাল নাগাদ দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ায় প্রবৃদ্ধির হার হবে যথাক্রমে ৭ এবং ৬ শতাংশ। তবে এক্ষেত্রে দেশগুলোকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জও মোকাবেলা করতে হবে। ভারতে কর্মসংস্থানের সংকট বাড়ছে, বড় কোম্পানিগুলো এখানে মনোযোগের কেন্দ্রে রয়েছে। তাই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কাজে লাগিয়ে শিক্ষিত তরুণদের জন্য তারাও ভালো কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে।
উল্লেখ্য, আজ ভারতের সংসদে বাজেট উত্থাপিত হবে। এটি ঘটছে দেশটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার মাসখানেক আগে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী এপ্রিল ও মে মাসের মাঝামাঝি দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আজকের বাজেট তাই স্বাভাবিকভাবেই দক্ষ নীতি-নকশা প্রণয়নের দাবি রাখে, যা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মসংস্থানের চাহিদা পূরণ করবে এবং ঘাটতির মাত্রাগুলোকে বাড়িয়ে তুলবে না। আমি বিশ্বাস করি, চলমান সন্ধিক্ষণে মুদ্রানীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক সুদের হার কিছুটা কমিয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সাহায্য করবে। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইডোডো— জোকোয়ি নামেই যিনি বেশি পরিচিত— ২০১৪ সালে ক্ষমতায় অধীন হয়ে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলেন। তবে সম্প্রতি তা পূরণে ব্যর্থ হয়ে বর্তমানে কঠোর সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছেন তিনি। ঘটনাক্রমে, জোকোয়ির বেঁধে দেয়া লক্ষ্যমাত্রাগুলো ইন্দোনেশিয়ার জন্য ছিল সবসময়ই অত্যধিক উচ্চাভিলাষী। এর মধ্যে একটি হলো, দেশটির মাথাপিছু আয় ১০ হাজার ডলারে নিয়ে যাওয়া (পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটির ভিত্তিতে)।
এক্ষেত্রে সরকারকেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে। এর মধ্যে অন্যতম রুপির অবমূল্যায়নের বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিক্রিয়া। শেষ তিন প্রান্তিকে ছয়বার সুদের হার বেড়েছে— এর বেশিও হতে পারে। এমনকি গত ২০ বছরের তুলনায় ডলারের বিপরীতে সবচেয়ে বেশি রুপির দাম কমেছে গত বছর। উপরন্তু স্থানীয় সরকারগুলোর মধ্যকার নীতির আরো ভালো সমন্বয় দরকার, যা প্রতিযোগিতামূলকভাবে ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে তুলেছে এবং চীনের থেকে কম খরচে উৎপাদনে ইন্দোনেশিয়ার ক্ষমতাকে হ্রাস করেছে।
ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট জোকোয়ি— আসছে এপ্রিলের সাধারণ নির্বাচনে জয় লাভ করার মাধ্যমে আবারো আগামী পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতা গ্রহণের আশা করছেন— এখনো খানিকটা আশা জাগিয়ে রেখেছেন। নিজের প্রতিশ্রুতিগুলোকে দৃষ্টান্ত সহযোগে ব্যাখ্যার মাধ্যমে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর হাতেগোনা কয়েকজন নেতৃত্বের মধ্যে তিনি একজন, যিনি এলজিবিটিকিউপ্লাসদের অধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেন। তিনি যদি তার ব্যক্তিগত মূল্যবান গুণগুলোকে পুঁজি করতে সফল হন— ধর্মনিরপেক্ষতা, বিনয়ের প্রতি তার অঙ্গীকারের উদাহরণগুলো সাধারণত বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে ক্রমে বিরল হয়ে উঠছে— তাহলে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে। এর মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া বার্ষিক ৬ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
যদিও কিছু সম্ভাবনাময় অর্থনীতি শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সমর্থ হচ্ছে, তার পরও বিশ্ব অর্থনীতি অর্থনৈতিক আন্তঃসংযোগের অভাব ও রাজনৈতিক বন্ধ্যত্বকরণের ফলে ভারাক্রান্ত থাকবে। যখন বিশ্বের প্রয়োজন মুদ্রানীতি-রাজস্বনীতি ও বাণিজ্যনীতির মধ্যে সমন্বয়ে আরো জোর দেয়া, ঠিক তখন উল্টো পথে যাত্রা করে যতটুকু সমন্বয় অবশিষ্ট ছিল, তাও তিরোহিত হওয়ার জোগাড়। এটি হচ্ছে বড় অর্থনীতির খারাপ নেতৃত্বের সরাসরি ফল। উদাহরণস্বরূপ ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।
এটি উৎসাহব্যঞ্জক যে, ফেড প্রাদেশিক সরকারের বিচার ব্যবস্থা, গণমাধ্যম ও বিশেষজ্ঞসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিস্থিতি ভালো করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একজন অবশ্য আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, বিশ্বের সচেতন ভোটাররা হয়তো একদিন জাতীয়তাবাদ ও জেনোফোবিয়ার মধ্যে বিদ্যমান বড় ভুলগুলো উপলব্ধি করতে পারবে। যদি এর কিছুই না ঘটে, তবে আমার সহজ পরামর্শ হলো, ভালোর পক্ষে জোরালো অবস্থান গ্রহণ করুন।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ












