‘আমাদের রাজত্ত্বে আমরা সবাই রাজা’

খোন্দকার জিল্লুর রহমান

নিজের একটা কথা দিয়েই লেখাটা শুরু করি, আমার ছোট মেয়ের বয়স যখন ৪ বছর, তখন তাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেই। সকাল ৮টাতে ক্লাস আরাম্ভ হয় তার ১৫ মিনিট পুর্বে এসেব্লি শেষ করেই ক্লাসে যাওয়া তাই সারে ৭টাতেই বাসা থেকে মেয়েকে নিয়ে বেরুতে হত যদিও স্কুলটা বাসার মোটমোটি নিকটেই। কিন্তুু তার বেশ কিছু সময় পুর্বেই মেয়েকে ঘুম থেকে উঠিয়ে দাঁতমেঝে মুখ ধুইয়ে স্কুলের জন্য রেডি করিয়ে নিতে হত। অন্য কাজগুলি করানো যত সহজ ছিল কিন্তুু দাঁত মাঝানো ছিল একটু কঠিন কাজ যা সে একেবারেই করতে চাইতনা। একদিন স্কুলে একটা পেষ্ট কোম্পানী তাদের প্রচারনার জন্য বাচ্চাদের পেষ্ট ও ব্রাশ নিয়ে এসে শিক্ষকদের মাধ্যমে প্রত্যেক বাচ্ছাদের কে একটা করে বেবিপেষ্ট ও ব্রাশ দিয়ে বলল প্রতিদিন কমপক্ষে দুইবার খাবার পর পেষ্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করবে। ঐদিনের পর মেয়ে স্কুল থেকে এসে খাবার পর প্রতি দিন তিন থেকে চার বার দাঁত মাঝতে থাকে, এতবার দাঁত মাঝার কারণ জিজ্ঞাসা করতেই বলে টিচার বলেছে প্রতিবার খাবার পর দাঁত মাঝতে হয় নাহয় দাঁত নষ্ট হয়ে যাবে। আসলে বাচ্ছারা পরিবারের গার্ডিয়ান থেকেও শিক্ষকের কথাবার্তা বেশী অনুকরন করে যদিও প্রবাদ আছে যে ‘ফেমেলি ইজ দ্যা বেটার ফিল্ড অব এডুকেশন’। একই সাথে ছাত্র যুব বা সাধারন জনগন যখন লেখাপড়া ও রাজনীতির সাথে যুক্ত হয় তখন তাদের শিক্ষগুরু শিক্ষক ও রাজনৈতিক নেতাদের দেখে ছাত্র ও জনগণ শেখে। শিক্ষক এবং নেতারা মিথ্যে কথা বললে ছাত্র এবং জনগণও মিথ্যে বলতে শেখে। ভালো মানুষও নেতা বনে গেলে খারাপ হয়ে যায়। সৎলোকও রাজনীতি করতে গিয়ে অসৎ হয়ে যায়। ধর্মীয় নেতারা মগজ ধোলাই করেন, রাজনীতিক নেতা, যাঁরা ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গী করেন, তারাও মগজধোলাই কম কবেন না। ধর্মীয় নেতারা মানুষকে পরকালের নরক-বাসের ভয় দেখান। রাজনৈতিক নেতারা ইহকালের জেল-জরিমানার ভয় দেখান। আমাদের দেশে নতুন একটি প্রশাসনিক বিচার শুরু হয়েছে যেটা হল প্রথমে এনকাউন্টার পরবর্তিতে ক্রস ফায়ার এবং বর্তমানে এই শাস্তিটার নাম আরো উন্নতি হয়ে নামকরন হয়েছে বন্দুকযুদ্ধ। এই শাস্তিটা বেশ কবছর পুর্বে বি এন পির আমল থেকে শুরুহলেও বর্তমানে এর কলেবর অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। যে নেতারা দেশ চালাচ্ছেন তাঁরা ‘ক্রস ফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধ’ নামে এমন একটা শাস্তি আবিষ্কার করেছেন এই ‘ক্রস ফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধ’ শাস্তিটি তারা যাকে খুশি তাকে দিতে পারবেন নেতারা। কোন আইনী বিচার চাড়া নিজেরাই মিডিয়ার রিপোর্ট পড়ে বা টুইটার ফেসবুকের মন্তব্য পড়ে অথবা লোক মুখে শুনে বা গুজবে কান দিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেবেন, কে দোষী। তারপর তাকে গ্রেফতার করে বা বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে গুলি করে মেরে ফেলবেন, মিডিয়াকে বলে দেবেন, বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যু হয়েছে, মিডিয়াও বিশেষ করে প্রিন্ট মিডিয়া নিজস্ব স্বার্থে বাধ্য হয়ে সরকারের প্রচারনা করবে, বলে দেবে ক্রস ফায়ারে অমুক বা তমুক নিহত। যদিও সাংবিধানিক নিয়মে আছে, ‘কোন আইনি বিচার ছাড়া কাউকে হত্যা, গনহত্যা, জখম বা অন্যকাউকে দিয়ে হত্যা অথবা সাধারন জনগনকে প্ররোচিত করে কাউকে হত্যা করা দণ্ডনিয় অপরাধ’।
দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি অনেকেই আস্থাহীন। অনেকের মতে সরকারের বিচার ব্যাবস্তার প্রতি স্বয়ং সরকারও আস্তাহীন। তাই সরকার বিচার বিভাগিয় তদন্ত এবং আইনি ব্যাবস্তা বাস্তবায়ন ব্যাতিত আসামিকে গ্রেফতার করে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার বা অন্য কোন অজুহাতে দোষীদের শাস্তি দিচ্ছে। তারা আরো বলেন, দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহীনিরও সরকারের বিচার ব্যাবস্তার প্রতি আস্তা নাই বলেই বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে আসামিকে শাস্তি দিয়ে তারা আইনকে নিজহাতে তুলে নিচ্ছে, এবং বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
গত ৬ই অক্টোবর ২০১৯ এর বাংলাদেশ প্রতিদিন এর শিরনাম অভিযোগের পাহাড় পুলিশের বিরুদ্ধে তিন বছরে ৪২ হাজার ৬৩২ জনের সাজা, বিশেষ করে পুলিশের উর্ধতন কিছু কর্মকর্তাসহ পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হকের নারি কেলেঙ্কারির ঘটনায় বরখাস্তসহ প্রতিবেদন দেখে সরকারের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহীনির বেপরোয়া অবস্থার চিত্র বুঝা যায়। প্রজাতন্ত্রের সর্ব মহলের এরকম বেহাল অবস্থা দেখে প্রজাতন্ত্রের জনগণও তাই করছে। যাদের হাতে বন্দুক বা পিস্তল আছে এবং তারা যাদের দোষী বলে সন্দেহ করছে, তাদেরকে গুলি করে মারছে। যাদের হাতে চাপাতি আছে তারা চাপাতি দিয়ে, চাপাতি না থাকলে, রামদা, রামদা না থাকলে হকিষ্টিক বা লাঠি রড অথবা হাতুড়ি দিয়ে খুন করছে।
বর্তমানে আবার কেঁচো খুড়তে গিয়ে সাফ বেরিয়ে আসছে। সরকারের উর্ধতন কিছু কর্মকর্তা কর্মচারি, এজেন্ডা বাস্তবায়নকারি ও সুবিধা ভোগি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহীনির অনেক দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারির যোগসাজসে জনপ্রতিনিধি, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কথিত নেতারা অবৈধ কেসিনো ব্যাবসার পাশাপাশি টর্সার সেল তৈরি করেও তাদের স্বার্থ বিরোধি লোকেদের ধরে এনে শাস্তি দিয়ে লেজুড় বিত্তির মাধ্যমে সরকারের বিচার ব্যাবস্তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন এবং অল্পদিনের মধ্যেই নিজেরা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে যা সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের দুর্নীতি বিরোধি অভিযানের বধৌলতে ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে দেশের কুটিকুটি সাধারন মানুষ উপভোগ করছে।
এভাবে মিটে যায় না। জনগণ শেখে এসব। জনগণ দেখছে বিচারে যাদের জেল হয়, টাকা পয়সা দিয়ে তারা বেরিয়ে যায় জেল থেকে। বড় বড় অপরাধীকে পুলিশ ছোঁয় না কারনতাঁরা সরকারের ঘনিষ্ঠ লোক বলেই ছোঁয় না। জেল-জরিমানা ছোটলোকদের জন্য, বড়লোকদের জন্য নয়। ছোট লোকদের মধ্যেও ছোট বড় আছে, বড়রা জামিন পেয়ে যায়, আবার তড়িৎ ছাড়াও পেয়ে যায়। ছোটলোকদের মধ্যে যারা বেশি ছোট, তারা অপরাধ না করেও অপরাধী এবং বছরের পর বছর শাস্তি ভোগ করে। আর যাদের উকিলকে দেওয়ার পয়সা নেই, জীবনভর জেলে পচে মরা ছাড়া তাদের আর উপায় থাকেনা।
কাউকে জঙ্গি, মাদক ব্যবসায়ী, খুনি বা ভিন্ন মতাবলম্ভি বলে মনে হলে, সরকার যেমন মনে করে বন্দুক যুদ্ধের নামে বিচারবিহীন মেরে ফেলা যায়, তেমনি জনগণও ভাবে কাউকে চোর, ডাকাত, খুনি, ভিন্ন মতাবলম্ভি, ছেলেধরা ইত্যাদি বলে সন্দেহ হলে বিচারবিহীন মেরে ফেলা যায়। সরকার যদি জবাবদিহিতাবিহীন, দুর্বল ও ক্ষমতা কেন্দ্রীক হয় তাইলে কী করে সরকার এই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ করবে? কাউকে ভালো হওয়ার উপদেশ দিলে প্রথমে নিজেকে ভালো হতে হয়। কাউকে কোনও অপরাধ না করার উপদেশ দিতে হলে নিজেকে এসব অপরাধ থেকে বিরত থাকতে হয় নাইলে মানুষ ওই উপদেষ্টাসহ উপদেশকে তুচ্ছ মনেকরে। রাজধানির বাড্ডায় স্কুলে সন্তান ভর্তীর খোজ নিতে আসা তাসলিমা রেণুকে ছেলেধরা অপবাদ দিয়ে খুনের নায়ক ১৯ বছর বয়সি এক যুবক সহ কয়েকটি লোক, শুধু তাই নয় ভিড় করে যত লোক দেখছিল, তারাও খুন করছিল তাকে। ভিড়ের কারণে তারা মারার সুযোগ পাচ্ছিল না, তা নাহলে..। খুনিরা তাছলিমাকে মেরে যে আনন্দ পেয়েছে কেহ কেহ আবার বাধা না দিয়ে মারের ভিডিও করেই সেই আনন্দ পেয়েছে, অনেকে আরও মারার জন্য তাদের উৎসাহ দিচ্ছিল। ভিন্ন মতামতের জন্য সম্প্রতি বুয়েটের মেধাবি ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার কাহীনি দেখে মনে হয় আদর্শের সৈনিকদের মনে কোন মানুষের জন্য মায়া মমতা গড়ে ওঠেনি, তারা জালিমের চেয়েও খারাপ, তাদের গড়ে ওঠেনি কোন যুক্তিবুদ্ধি, ওরা আবর্জনার মতো জন্ম নিচ্ছে, আবর্জনার মতো বেড়ে উঠছে। ক্ষমতালিপ্সু কেউ কেউ এদের ব্যাবহার করে স্বার্থ উদ্ধার ও বিভিন্ন রকম ফায়দা লুটছে, এদের দ্বারা সমাজের ক্ষতি ছাড়া লাভ হওয়ার কিছু আশা করা যায় না। বুয়েটের ঘটনায় গবেষক ও কলামিষ্ট সৈয়দ আবুল মুকসুদ বলেন, ‘অভিযুক্তরা অতিতে দুর্বৃত্ত ছিল না। তারা যে সংগঠনের নেতাকর্মি সেই সংগঠন তাদেরকে ওই পথে নিয়ে এসেছে। তারা দলের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে’। সাধারনত একটা গনতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে রাষ্ট্রের ভিতরে প্রত্যক্ষ ও পরক্ষভাবে সংঘঠিত সকলরকম অপকর্মের দ্বায়ভার সরকারের উপরেই বর্তায়, কোন অবস্তাতেই এটা অস্বিকার করার যো নাই।
সরকারের অন্যায়গুলো নিয়ে যখন দেশের সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী, চিন্তবিদ, সমাজ এবং রাজনীতি স্বচেতন ব্যাক্তি বা জ্ঞ্যানিদের কোন রকম প্রশ্ন করার উপায় থাকে না, যখন মুক্তচিন্তা বা বাকস্বাধীনতা বলে যা কিছু আছে, সব নিষিদ্ধ হয়ে যায়। সরকার যা করে ভালো করে বা ঠিক করে এরকম একটি বার্তাই তখন সবার কাছে পৌঁছায় এবং সমাজের আবর্জনাগুলো নিজেদের জ্ঞ্যানবুদ্ধি না খাটিয়ে সরকারের রাস্তাই অনুসরণ করে- যাকে খারাপ লোক বলে মনেকরে তাকে হত্যা করে ফেলে।
রাস্তাঘাটে, জনসমক্ষে, শুধু সন্দেহের বশে অথবা পছন্দ অপছন্দের কারনে কোনকিছু না বলে কাউকে পিটিয়ে, চাপাতি, রামদা, লাঠিসোটা, হকিষ্টিক, রড দিয়ে, গাছের সাথে অথবা হাত পা বেঁধে গুলি করে মারা, সবই যেন হই হই করে বাড়ছে। নৃশংসতা দেখে চিন্তা হয়, এরাকি মানুষ প্রজাতি না অন্য কিছু..? সত্যি কথা বলতে, সাত বিলিয়ন মানুষের মধ্যে সত্যিকার মানুষ আর ক’জন, আবর্জনার সংখ্যাই কিন্তু বেশি।
নারী উত্তম ব্যক্তিত্ব, নারী প্রতিভাময়ী হোক নারীকে ঘৃণাভরে পেটাতে পারে লোকেরা, নির্দ্বিধায় ধর্ষণ করে গলা টিপে মেরে ফেলতে পারে, নারীকে নিয়ে নৃশংসতারও চূড়ান্ত করতে পারে লোকেরা। শিকার পুরুষ হলে ব্যাপারটা হয় একটু অন্য রকম পিটিয়ে, বিবস্ত্র করে মেরে, পাগল বা ছিনতাইকারি বলে চালিয়ে দেয়। কখনো কখনো নিজেদের দুর্নীতি, অপকর্ম বা দোষ ঢাকার জন্য এসব অপবাদ দিয়ে হত্যা করে লাসের উপর দাড়িয়ে উল্লাস করতে পারে ওরা। আসলে ওদের কাছে নারী পুরুষ কোন প্রার্থক্য নাই সবই এক, তারা সবই পারে।
সুস্থ বিতর্কের স্থান নেই বলেই কেউ যুক্তি খাটাতে পারছে না। সর্বক্ষেত্রে এরকম বেহাল অবস্থা দেখে হীরক রাজার দেশের কথা মনে হয়, হীরক রাজার দেশে হীরক রাজা যেমন খুন করতে ভালোবাসতেন, তার সুযোগ্য প্রজারাও তেমন হাসতে হাসতে খেলতে খেলতে খুন করতে ভালোবাসেন। এতে অবাক হওয়ার মত কিছু নেই…।
দেশের জনগন এ হে ন অবস্থা থেকে মুক্তি চায়…!!!
লেখক : দফতর সম্পাদক, মুসলিম লীগ, সম্পাদক প্রকাশক ঃ অর্থনীতির ৩০ দিন ডটকম।