
খোন্দকার জিল্লুর রহমান

“পুত্র, তোমার হত্যাকারীরে পাইনিকো আজো ঢুঁড়ে
আফসোস তাই জ্বলিছে সদাই তামাম কলিজা জুড়ে।
তার তাজা খুনে ওজু করে আজো নামাজ পড়িনি তাই
আত্মা তোমার ঘুরিছে ধরায়, স্বর্গে পায়নিকো ঠাঁই।
বাঁচিয়া থাকার কথা নয় আর তোমারে হারায়ে, বাপ,
কেবল তোমার মুক্তির লাগি সই দুনিয়ার তাপ।”
বলিতে বলিতে রুমালে অশ্রু মুছিলেন…
আবরারের (আবরার ফাহাদ) বাবা মায়ের অশ্রু আর কান্নার আওআজ কতদিন কতজনের কানে ধ্বনিত হবে জানি না? বুয়েটের বেশ কয়েকজন কথিত ছাত্রলীগ নামধারী খুনি আবরার কে খুন করেছে, আবরারের বাবা মাকে সান্তনা দেয়ার মত কোন ভাষা আমার নাই। যেখানে পুরো জাতি নিস্তব্ধ ও স্তম্ভিত হয়ে আছে। এক বাবার গগন বিদারি আর্তনাদ যেন আজ আকাশ বাতাশ বিদীর্ণ করে পুরো বিশ্বের মানব জাতিকে অশ্রুশিক্ত করে একই রকম ধ্বনিতে ধ্বনিত হচ্ছে। সন্তানের লাশের উপত্যকায় দাড়িয়ে বাবা মায়েদের এ আর্তনাদ লক্ষ কোটি মানুষকে অশ্রুশিক্ত ও ভাষাহীন করতে পারলেও কখনো কখনো অনেকে প্রতিশোধের জিগাংসাকে হাসতে হাসতে খেলতে খেলতে চরিতার্থ করার মাধ্যমে ক্ষমতায় আরোহনের পথ সুগম করে নেয়। কোন কোন মৃত্যু বাবা মায়েদের স্বপ্ন ভেঙ্গে খান খান করে পেললেও পুরো জাতিকে বোকা বানিয়ে এক শ্রেণীর নির্বোধ দায়িত্ত্বশীল লেকেরা নিজেদের ক্ষমতায় আঁকড়ে রাখার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে নিতে একটুও দ্বিধাবোধ করে না। তাদের কান্না কুমিরের কান্নাকেও হার মানায়, অস্থা দেখে মনে হয় এ যেন মাছের মার পুত্রশোক। (যেখানে মাছ তার নিজের বাচ্ছাকে খেয়ে ফেলে, তার আবার পুত্রশোক)। পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বোঝা হল ‘পিতার কাঁধে তার সন্তানের লাশ’। কিন্তুু এই একজন পিতার কাঁধে তার সন্তানের লাশের ওজন কত, পরিমাপ করার কোন যোগ্যতা নাই তাদের। অনেক সময় নিজের বিবেকের নিকট একটা প্রশ্নের উত্তর খুজিঁ যে, মেধাবী কাকে বলে ? অনেকের মুখে বলতে শোনাযায় যারা লেখাপড়ায় ভাল করে বা বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষায় টিকে, যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের অন্যান্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে টিকে,তারাই মেধাবী। আসলে কি তাই? তাহলে কি ধরে নিতে হবে যারা শুধু লেখাপড়ায় ও ভাল রেজাল্ট করে, এছাড়া অন্যকোন জ্ঞানবুদ্ধি, মনুষ্যপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, এমনকি সামাজিক দায়বদ্ধতা ও বিবেকের ছিটাফোটাও যাদের নেই, তারাই মেধাবী? নাকি যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক পরিচয় দিয়ে আবরারের মত সহপাঠিকে নির্মমভাবে পিটিয়ে খুন করতে পারে তারাই মেধাবী, আর মেধাবীরাই খুনি হয়? শয়তানও মেধাবী হয়, কিন্তুু শয়তানতো কাউকে খুন করেনাই, তাইবলে মেধাবী হয়ে গর্ব করার কি আছে, কোন কিছুই নাই। মনুষ্যত্ব, সততা, স্বদেশপ্রেম, এমনকি সামাজিক দ্বায়বধ্যতা ও বিবেক না থাকলে সে মেধা ঘৃণিত ও অভিসপ্ত।
কোরানের ভাষায় মানুষ হল আশরাফুল মখ্লুকাত বা সৃষ্টির শেরা জীব। সৃষ্টির শেরা জীব হয়ে মানুষ মানুষকে খুন করতে পারে তারা মানুষ নয়, মানুষরূপী হিংস্র জানোয়ার। আর এসব খুনিদের বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে সর্বোচ্ছ শাস্তির ব্যাস্থা না করে যারা আশ্রয় প্রশ্রয়সহ আইনী সহায়তা যারা করে তারাওকি এর চেয়ে কম? আসলে তাদের হিংস্র জানোয়ার বললে ভুল হবে। কারণ হিংস্র মাংশাসি জানোয়ারগুলি পেটের ক্ষুধা নিবারণের জন্য অন্য একটা প্রানীকে শিকার করে খায় কিন্তুু নিজেরা নিজেদেরকে হত্যা করেনা। বুয়েটের কথিত ছাত্রলীগের মানুষরুপি হিংস্র প্রনীগুলি শুধু আবরার ফাহাদকে হত্যা করেনাই, গনতন্ত্র সহ আদর্শের সৈনিকরা হত্যা করেছে একটা দেশকে, একটা জাতিকে। একটি স্বাধীন গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংগঠিত সকল অন্যায় অবিচার, খুন ধর্ষন এমনকি জনগনের নৈতিক অধিকার হরনসহ সকল অন্যায়ের দায়ভার ক্ষমতাসীন সরকারের উপরই বর্তায়। দেশের জনগন উদোর পিন্ডি বুদুর গাঁড়ে দিয়ে দায়িত্ত্ব এড়ানো চায়না, জনগন চায় ন্যায় বিচার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ১৭ কোটি মানুষের দৃষ্টি এখন আপনারই দিকেৃ..।
একটা স্বাধীন রাষ্ট্রে ১৯৭৪ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত ১৫১ জন শিক্ষার্থী খুন হয়েছে। সূত্র অনুযায়ী ৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিধ্যালয়ে গোলাগুলিতে সাত খুনের ঘটনা ঘটে। স্বাধীনতার পর থেকে এটাই বিশ্ববিদ্যালয়ে খুনের প্রথমত ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনার চার বছর পর শফিউল আলম প্রধান (বর্তমানে মৃত) সহ অন্যান্য আসামিদের শাস্তি হয় এবং পরে বিএনপি সরকারের আমলে তারা ছাড়া পেয়ে পায়। সেই সময় থেকে সম্প্রতি আবরার ফাহাদ খুনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫১ লাশের মিছিল পুরো জাতির বিবেক কঠিন ভাবে নাড়া দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫১ খুনের জন্য শাস্তি পায়নি কেউই। শিক্ষার্থী খুনের মেধা তালিকায় ৭৪ শিক্ষার্থী খুন করে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম স্থান আধিকার করতে পেরেছে। দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে বরেন্দ্র বিভাগীয় খ্যাতনামা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সেখানে খুন হয়েছে ২৯ শিক্ষার্থী, চট্টগ্রামে ১৯,কৃষি বি: তে ১৯, জাহাঙ্গীরনগরে সাত, ইসলামি ও বাংলাদেশ প্রকৈৗশলে দুইজন করে, ভাষানী বিজ্ঞান ও প্রয়ুক্তিতে একজন এবং শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে একজন খুন করে খুনের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। দেশের সর্বোচ্ছ বিদ্যাপিঠ বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে শিক্ষার্থী খুনের উৎসব দেখে জনগনের মুখে একটাই কথা শোনা যায়, সরকার সহ ক্ষমতাসীন দল ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকার জন্য শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতিকে অপরাজনীতিতে রূপান্ত করে ফেলেছে যা সূদুর অতিতের সরকার গুলোর মাঝে কিছুটা পরিলক্ষিত হলেও ক্রমান্ময়ে বাড়তে বাড়তে বর্তমান সরকারের আমলে তা প্রকট আকার ধারন করেছে। এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নাইযে প্রশাসনিক অযোজ্ঞতা ও রাজনৈতিক নিয়োগের কারনে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষা অবকাঠামো ভেঙ্গে পড়ার দ্বার প্রন্তে এসে দাড়িয়েছে।
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ভিসিরা এখন আর বিতর্কের ঊর্ধে নয়। বিতর্ক, অসম্মান এবং অবমুল্যায়নকে তারা এখন আর থোড়াই কেয়ার করেন। লোভ-লালসা, প্রাপ্তি, উচ্ছাবিলাসিতা, ক্ষমতার মসনদে আরোহন, লেজুড়বৃত্তি তাদেরকে এহেন অবস্থানে নিয়ে গেছে। দেশের সর্বোচ্ছ বিদ্যাপিঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ভিসিদের বিতর্কিত কর্মকান্ডে বিশ্ব্যবিদ্যালয় বন্ধ এবং ভিসিদের পদত্যাগ সহ এমনিতে বেশ উত্তাল পরিস্থিতি, সেই সাথে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে কথিত ছাত্রলীগ নামধারি নেতারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা শিক্ষার্থীদেরকে অত্যাচার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য প্রতিটি ক্যাম্পাসের এবং প্রতিটি হলের গেষ্টরুম গুলিকে র্যাগিং ও টর্সার সেল তৈরি করে সরকারের লেজুড়বৃত্ত্বির মাধ্যমে প্রশাসনের তোয়াক্কা না করে নিজেদের রামরাজ্য প্রতিষ্টার মাধ্যমে আইনকে নিজের হাতে তুলে নিয়ে খুনের উপত্যকা সৃষ্টি করেছে তা একটা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে দাঁড় করিয়েছে। আমাদের পাবলিক বিশ্ব্যবিদ্যালয় ভাইস চ্যান্সেলররা কেউ কেউ সরকারি দল আওয়ামি লীগের সদস্য, আবার অনেকে যুবলীগের প্রেসিডিয়ামের সদস্য, কিছু কিছু আবার সর্বনাশ করেছেন আওযামি লীগ করতে গিয়ে হয়ে গিয়েছেন অতি আওয়ামি লীগার। সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ভিসি ড: মিজানুর রহমানের যুবলীগের চেয়ারম্যানের পদ পেলে ভিসি পদ ছেড়ে দেওয়ার কথায় তা স্পষ্ট হয়ে উঠে। এটা একটা শিক্ষীত ও উন্নত জাতি ঘঠনের জন্য অশনি সঙ্কেত বলে মনে করেন সুশীল সমাজের লোকজন।
যোগ্যতা ও আদর্শিকতার বাধ্যবাধকতা না থাকায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভাইস চ্যান্সেলরগুলির অনৈতিক কাজ ও শিক্ষা জীবনের অনিশ্চয়তার কারনে সাধারন জনগন দিনদিন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে সন্তানদের লেখাপড়া করানোর আস্থা হারিয়ে পেলতেছে, এই অনস্থা প্রকাশের কারনেই জনগন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ঝুঁকছেন। এ ব্যাপারে নিজের একটা কথা বলতে হয়, আমার ছোট মেয়ে এবছর (২০১৯ইং) এইচ এস সি পাশ করার পর তার নৈতিকতার উপর একরকম চাফ প্রয়োগ করেই ঢাকা বিশ্ব্যবিদ্যালয় সহ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ব্যবিদ্যালয়ে ভর্তি ফরম সাবমিট করি, কিন্তুু তার একটাই মতামত, সে পাবলিক বিশ্ব্যবিদ্যালয়ে পড়বেনা, কারণ জানতে চাইলে বলে, যে বিশ্ব্যবিদ্যালয়ের একজন ভাইস চ্যান্সেলর অনৈতিকভাবে স্লিপ দিয়ে ৩৪জন শিক্ষার্থী ভর্তি করান, তাকে শিক্ষক বলাতো যায়ই না বরং তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্ছ পদকে কলঙ্কিত করেছেন, তার নিকট থেকে ভাল শিক্ষা ও ভাল নাগরিক হওয়ার আশা করা যায়না। মেয়ের ব্যক্তি সচেতনতার কারনে বাধ্যহয়ে তাকে একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেই।
সর্বশেষ দেশের শিক্ষা ও জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে সরকার এবং শিক্ষমন্ত্রণালয়সহ এসব প্রথিতযশা শিক্ষকদের দলীয় ও নিজস্ব স্বার্থে ব্যবহার না করে জবাবদিহিতার আওতায় রাখবে আর শিক্ষকরাও লোভ-লালসা, প্রাপ্তি, উচ্ছ বিলাসিতা, ক্ষমতায় আরোহন, লেজুড়বৃত্তি ও বিতর্কিত অবস্থা থেকে নিজেদেরকে পরিহার করে সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খুনাখুনির অপরাজনীতির সাংস্কৃতি বন্ধ করে শিক্ষা ব্যবস্থার মানকে একটা আন্তর্জাতিক অবস্থানে নিয়ে যাবে এবং দ্রুত গতিতে আবরারের খুনিদের বিচার করে সর্বোচ্ছ শাস্তি প্রয়োগ করে করজোড়ে ক্ষমা চাওয়ার জন্য আবরারের নিকঠ পাঠিয়ে দিবে, তাতে একটু হলেও আবরারের বাবা-মায়ের আত্মা শান্তি পাবে, আর শান্তি পাবে দেশের ন্যায় বিচার প্রত্যাশি জনগনও।
লেখক : দফতর সম্পাদক, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, প্রতিবাদী কবি, সব্যসাচী লেখক, কথা সাহিত্যিক এবং সম্পাদক প্রকাশক ঃ অর্থনীতির ৩০ দিন।











