
খোন্দকার জিল্লুর রহমান

রাগ মানুষের সহজাত প্রকৃতি, রাগ নিয়ে মানুষের মাঝে বিভিন্ন ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়। রাগ কখনো ক্ষতির আবার কখনো ভালর কারণ হয়। রাগ নিয়ে সুন্দর একটা প্রবাদ হল ‘রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন’ এই কথাটাকে মিথ্যা প্রমান করে আমাকে বলতে হয় ‘রেগে গেলেন তো জিতে গেলেন’ এবং আপনাকে জিততেই হবে, তবে এই প্রবাদটাকে আপনি মিথ্যা প্রমান করতে হবে আপনার কঠিন পরিশ্রম মেধা এবং সিডিউল অনুযায়ী কাজ দিয়ে। আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বা লক্ষ রাখতে হবে সুদুর প্রসারি। লক্ষভ্রষ্ট হলে কোন ক্রমেই চলবেনা। কারণ আপনার উদ্দেশ্যটাই আপনার লক্ষ অর্জনের মূল পুঁজি, এটাকেই শুক্ষভাবে কাজে লাগাতে হবে। আপনাকে মনে রাখতে হবে এই রাগ প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধ নেয়ার রাগ নয় এটা সফলতা অর্জনের রাগ। যে রাগ প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধ নেয় আমার মতে এটাকে রাগ না বলে এটাকে আক্রোশ বলা হয়। আক্রোশ সব সময় শরীরের জন্য, মনের জন্য, জ্ঞ্যনের জন্য, পারিবারিক সমজোতা, ব্যবসা বানিজ্যসহ জীবনের সকল ক্ষেত্র উন্নয়ন অগ্রযাত্রার জন্য কঠিন বাধা হয়ে কাজ করে, আর রাগ মনের ভিতর প্রশমিত করে চিন্তা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অগ্রসর হতে পারলে জীবনের সকল ক্ষেত্রে সফলতাই পাওয়া যায়। সত্যিকারে বলা যায় রাগের সুফলের চেয়ে কুফল টাই বেশি, সাধারনত বেশির ভাগ মানুষই রাগটাকে নিজের ভিতর রেখে প্রশমিত করতে পারেনা বলেই রাগের ভালোর দিকের চেয়ে খারাপ দিকটাই পরিলক্ষিত হয় বেশি।
একবার এক লোককে জিজ্ঞাসা করি, আপনি রাগ করেন কেন ? লোকটি রেগেই উত্তর দেন “রাগ আছে বলেইতো রাগ করি” বুঝলামনা বলতেই লোকটা বলে উঠল দেখতে পাচ্ছেননা কোন কাজই ঠিকঠাকমত হয়না, সবদিকে সবাই ঝামেলা করে, কেহই ঠিকমত কাজ করেনা, এরকম আরো অনেক কথা মুহর্তে বলে ফেললেন। ভাই রাগ না করে সুন্দর করে বললে হয়না বলতেই লোকটা বলে তাতো হয় কিন্তু রাগটাতো ধরে রাখতে পারিনা। লোকটাকে বললাম ভাই আমাদের দেশের মানুষের এত রাগ কেন? অপেক্ষা না করে লোকটা তাৎক্ষনিক উত্তর দিল, জানেননা আমরা গরু খাই(অর্থাত আমরা গরুর মাংশ খাই)। গরু খেলেই কি রাগ করতে হয়, আর গরু কি রাগি প্রাণী? দেখেননা শিং দিয়ে গুতা দেয় এবং আপনিতো আজব লোক বলতে বলতে একটু মুচকি হেসে আমার কাছে থেকে কেটে পড়ে। এমন অনেককেই জীজ্ঞাসা করি, ভাই অমাদের দেশের লোকেদের এত রাগ কেন ? কেহ বলেন আমরা গরু খাই, কেহ কেহ বলেন পেঁয়াজ খাই, কেহ কেহ আবার আমাদের আবহাওয়াকে দোষারপ করেন।

অনেকে অনেক রকম কথা বললেও দুএক জন আবার ভিন্ন কথা বলেছেন, তারা বলেছেন আমাদের দেশের লোকেদের শিক্ষা এবং জ্ঞান কম(এই শিক্ষা সার্টিফিকেটধারি শিক্ষার কথা বলা হয় নাই জ্ঞ্যনের কথা বলা হয়েছে)। আসলে জ্ঞানি লোকেরা রাগান্মিত হননা বা রাগ করেননা তারা যে কোন জিনিস সহজভাবে মেনে নিতে পারেন এবং সুন্দর ভাবে বুঝিয়েও দিতে পারেন। অবার অনেক সময় দেখা যায় সমাজের সৎ লোকেরা ব্যাতিক্রম ধর্মী কাজ বা অনৈতিক কিছু দেখলে নিজকে স্থির রাখতে পারেন না, আর ধূর্ত বা অসৎ প্রকৃতির লোকেরা না রেগে নিজের স্বার্থ উদ্ধারে কাজ করে থাকেন, সৎ লোকেদের এই অস্থিরতাও রাগের এক প্রকার বহি:প্রকাশ। রাগ নিয়ে অনেকের অনেক কথা থাকলেও আসলে রাগের প্রকৃত সঙ্গাটা যে কি এবং এই রাগ কোথা থেকে উৎপত্তি কোথায় এর পরিসমাপ্তি এবং রাগের প্রসমনের প্রকৃত উপায় কি কোন ডাক্তার বা কোন বিজ্ঞানী আজও বাহির করতে পেরেছেন কিনা আমার জানা নেই। আবার রাগ না করে আজ পর্যন্ত কেহই সাক্সেস ফুল হতে পারেন নাই এটাও সত্য। আবার দু এক জনে বলেন, রাগ নিয়ে রাগারাগী করবেন না, অনেকে বলে যারা হেসে কথা বলেন সব সময় হাঁসি মুখে থাকেন এবং নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারেন এবং যাদের বুদ্ধি আছে, তাদের রাগ নাই বা রাগ কম।
আমরা অনেক সময় দেখি অনেকে এক সাথে কোন প্রোগ্রাম দেখতে গিয়ে কারো বক্তব্যে হটাৎ হটাৎ বিভিন্ন মন্তব্য করে বসেন, আবার অনেককে ঊচ্ছ বাচ্ছে গালি দিতেও দেখা যায়, এটাও নাকি রাগের বহি:প্রকাশ। কেহ কেহ আবার কারো কারো রাজনৈতিক বক্তব্যেও সয্য করতে না পেরে বিরুপ মন্তব্য করেন, আমরা জানি মানুষ অন্যায় থেকে শিখে কিšু‘ শিখতে গিয়ে যদি নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে অজচিত কথাবার্তা বেরিয়ে আসে এটাও নিরব রাগের বহি:প্রকাশ। অজচিত রাগে কেউ কেউ ক্ষমতার কারনে কারো উপর প্রতিশোধ নিতে পারে, ক্ষমতা বীহিনরা মন্তব্য করে রাগ উপসম করেন যাদের কিছু করার থাকেনা তারা রাগ হলে নিজে নিজে কষ্ট পেয়ে নিজের কর্মস্থলে ফিরে আসেন। অনেকে আবার পরিবারের সদস্যদের উপর মারপিট করেও রাগ উপসম করেন। আবার অভিমানও রাগের একটা অংশ, কখনো কখনো দুএকজন রাগ ও অভিমানে আত্মহত্যা পর্যন্ত করে থাকেন, এটা কখনো রাগ প্রসমনের উপায় নয় এবং এটা করাও উচিত নয়।

এবিষয়ে ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট এ পি জি আবুল কালামের লিখিত বইয়ের একটা বিষয় আমার মনে পড়ে গেল, তিনি লিখেছেন, ভাই বোন মিলিয়ে তাদের পরিবার ছিল অনেক বড় এবং অসচ্চল, তার বাবা একটা ছোট চাকরি করতেন, একদিন সকালে তিনি দেখেন তার মা বাবাকে একটা রুটি ও বাটিতে কিছু সবজি দিলেন তাও রুটিটা শক্ত এবং পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া আর সবজিগুলি একেবারে গেছগেছ করা, বাবা ঠিক গা গোসল সেরে এসে খুব সুন্দরভাবে সবজি দিয়ে চাবিয়ে চাবিয়ে এই পোড়া শক্ত রুটিটা খেয়ে কোন কথা না বলে অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে যান, তিনি এসবকিছু দেখ আস্তে আস্তে বাবার কাছে যান এবং বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলেন ‘বাবা তোমার কি খেতে কোন কষ্ট হয়নাই, মা তোমাকে এমন পোড়া ও শক্ত একটা রুটি দিয়েছে’ এ পি জি আবুল কালামের বাবা ছেলেক আদর করে বললেন ‘বাবা, শক্ত রুটি মানুষকে কষ্ট দেয়না, কিন্তুু শক্ত কথা মানুষকে কষ্ট দেয়’। তিনি মায়ের প্রশংসা করে বলেন, কোন রাগ না করে তোমার মা কিভাবে অতবড় সংসার সহ সবকিছু ঠিক রাখেন তা আমার মাথায় আসেনা। রাগ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় মানুষের ভিতর কাজ করে।
রাগ যে শুধুমাত্র মানুষেরই হয় তা নয় রাগ বিভিন্ন প্রানিকুল থেকে পশু পাখিদেরও হয় তা বিভিন্ন সময় এসব পশু পাখি থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রাণীদের আচার আচরনেও আমরা দেখতে পাই। আমার ছোট্ট বয়সে হাঁস মুরগি কবুতর ও পাখি পালনের খুব সখ ছিল, তাই এসব হাঁস মোরগ ও কবুতরের সাথে আমার একটা পালিত শালিক ছিল, অনেক দিন থেকে পারিবারিক ভাবে লালন পালন করায় শালিকটিও পোশ মেনে যায়। সব সময় পাখিটাকে খাঁচায় বন্দ্বি রাখতে হতনা, নিয়মিত সন্ধায় নিজেই খাঁচায় ডুকে যেত এবং সকালে বেরিয়ে যেত। আমার স্কুল কলেজে চলে গেলে সারাদিন পাখিটা মায়ের কাছে কাছে থাকত, মা গোসল করতে গেলে পাখিটাও গোসল করতে যেত, মা খেতে গেলে এটাও খেতে যেত, যেন পারিবারিক সদস্য। সবচেয়ে দৃশ্যমান ব্যাপার হল এক সাপ্তাহিক বন্দের দিনে আমরা সবাই দিনের কাজ সেরে দুপুরের খাবারের জন্য প্রস্তুত, মাও রান্নাবান্না সেরে গোসল করে এসে আমাদের খাওয়া দাওয়া দেয়ার জন্য প্রস্তুত, শালিকটাও মায়ের সাথে সাথে গোসল করে এসে খাবার জন্য প্রস্তুত, গ্রামে তখন খাবার টেবিলের এত প্রচলন ছিল না বলে আমরা সকলে নিচে পাটি বিছিয়ে খেতে বসি শালিকটাও আমাদের একপার্শ্বে পাটিতেই বসে খেত। তরকারি ভাত না খেলেও দুধভাত পছন্দ ছিল পাখিটার। মা হাতের কাছে শালিকের জন্য নির্ধারিত খাবারের বাটিটা না পেয়ে মাটিতে একটু দুধভাত দেয়, এমনিতেই শালিকটা খাবার না খেয়ে শরিরের সমস্ত পালকগুলি দাড় করিয়ে ঘাড় কাত করে খাবারের দিকে তাকিয়ে থাকে, মা সকলকে বলেন দেখ্ শালিকটা কেমন রাগ করেছে, বাটিটা এনে আবার দুধভাত দিতেই শালিকটা তা সুন্দর করে খেয়ে নেয় এবং সকলের সাথে খাওয়া শেষ করে নিজের ভাষায় কিচিরমিচির করে সম্মতি জানায়। বর্তমানে মা জিবিত নেই কিন্তুু আমার পালিত শালিকের এই রাগের কথা আমাদের পরিবারের সকলেই মাঝে মাঝে মনে করেন। আসলে পশু পাখির ও যে রাগ আছে এটাই প্রমানিত।

এসব উদাহরন থেকে এটাই শিক্ষা নেওয়া উচিত য়ে রাগ করা খারাপ নয়, কিন্তুু রাগ কখনো যাতে আক্রোশ বা আক্রোশের হাতিয়ারে পরিণত না হয় সেই দিক চিন্তা করে রাগকে উন্নয়ন বা কাঙ্খিত সাফল্যের হাতিয়ার হিসাবে নেয়া যায় এটাই শিক্ষিত, জ্ঞানি এবং বুদ্ধিমানের কাজ।
রাগ নিয়ে আমার একটা কবিতা মনে পড়ে গেল…
আমার মনের কথা হল
রাগ করে কেউ হিরু হয়, রাগ করে কেউ ভীরু হয়।
রাগ করে কেউ হেরে যায়, রাগ করে কেউ জিতে যায়।
রাগ করে কেউ সরে যায়, রাগ করে কেউ মরে যায়।
রাগ করে কেউ মাথা ফাটায়, রাগ করে কেউ জেলখানায় যায়।
রাগ করে কেউ হোচট খায়, রাগ করে কেউ সন্মান পায়।
রাগ করে কেউ চুল ছেড়ে, রাগ করে কেউ গর্তে পড়ে।
রাগ করেই যে জিততে পারে, সুন্দর জীবন সে গড়তে পারে।
লেখক : দফতর সম্পাদক, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, সম্পাদক প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন ডট কম











