“আইএমএফের ঋণছাড়ে মার্কিন সহায়তা চান পাকিস্তানের সেনাপ্রধান”


অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া
দ্রুত দেউলিয়াত্বের দিকে এগিয়ে চলেছে পাকিস্তান। ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের ধারাবাহিকতায় দেশটিতে এখন রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতাও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণই এখন এ বিপদ মোকাবেলায় দেশটির সবচেয়ে বড় ভরসা। যদিও কঠিন শর্তের বেড়াজালে পড়ে এ ঋণের অর্থছাড়ের কিস্তিও এখন আটকে রয়েছে। এ অবস্থায় আইএমএফের ঋণছাড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চেয়েছেন দেশটির সেনাপ্রধান কামার জাভেদ বাজওয়া।
যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের মিত্র হিসেবে পরিচিতি রয়েছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর। সর্বশেষ আফগানিস্তানে তালেবানদের ক্ষমতা দখল এবং ইমরান খান সরকারের চীন ও রুশঘনিষ্ঠতার কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিমাদের বেশ দূরত্ব তৈরি হয়। ইমরান খানকে সরিয়ে শাহবাজ শরিফ সরকার ক্ষমতায় এলেও এ দূরত্ব তেমন একটা কমেনি। পশ্চিমাদের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে বরফ গলানোর প্রয়াস হিসেবেই পাকিস্তানি সেনাপ্রধান আইএমএফের ঋণের অর্থছাড়ে মার্কিন সহায়তা চেয়েছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পাকিস্তানের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরম্যানের সঙ্গে এক আলোচনায় বসেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া। সেখানেই আইএমএফের ঋণছাড়ের বিষয়ে আলোচনা তোলেন তিনি। বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই আলোচনায় আইএমএফের ঋণ দ্রুত ছাড় করার জন্য হোয়াইট হাউজ ও মার্কিন অর্থ বিভাগকে পাকিস্তানের প্রতি সহযোগিতামূলক অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন কামার জাভেদ বাজওয়া।
তবে পাকিস্তান বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি। জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া ও ওয়েন্ডি শেরম্যানের মধ্যকার আলোচনার বিষয়টি স্বীকার করে নিলেও এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য জানাননি পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অসীম ইফতিখার আহমেদ। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে এখনো কোনো কিছু জানানো হয়নি।
জ্বালানি আমদানির জন্য উচ্চব্যয় এরই মধ্যে বিপদে ফেলেছে পাকিস্তানকে। অন্যদিকে আমদানি এবং বিপুল পরিমাণ ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধের সময় ঘনিয়ে এলেও দেশটির বর্তমান রিজার্ভ দিয়ে এ প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়। এ অবস্থায় আইএমএফের বেইল আউট প্যাকেজের অর্থ হাতে পেলেও আপাতত কিছু সময়ের জন্য স্বস্তিতে ফিরবে পাকিস্তান। এমন পরিস্থিতিতে অর্থছাড় প্রক্রিয়া গতিশীল করতে পুরনো মিত্র এবং আইএমএফের সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারস্থ হয়েছে পাকিস্তান।
সমালোচকরা বলছেন, পাকিস্তান চুক্তি অনুযায়ী অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি পালন করতে না পারায় আইএমএফের ঋণছাড় বিলম্বিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতের সার্কুলার ডেবট নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিতে আইএমএফ বারবার জোর দিলেও এ নিয়ে এখন পর্যন্ত কার্যকর বা দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি পাকিস্তান।
সার্কুলার ডেবট মূলত একধরনের সরকারি ঋণ। বিতরণ কোম্পানিগুলোকে ভর্তুকি বাবদ প্রদেয় বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে কোনো দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে ঋণের যে দুষ্টচক্র তৈরি হয়, সেটিকেই অভিহিত করা হয় সার্কুলার ডেবট হিসেবে। এক্ষেত্রে সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি বাবদ প্রাপ্য অর্থ পাওয়া না গেলে বিতরণ কোম্পানিগুলো বেসরকারি বা স্বাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে (আইপিপি) প্রতিশ্রুত অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হয়। এর ধারাবাহিকতায় উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোও জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পাওনা অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে বিপাকে পড়ে যায়। এ সার্কুলার ডেবট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা গোটা বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত ও এর ধারাবাহিকতায় সার্বিক অর্থনীতিতেই বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। দেশটিতে সার্কুলার ডেবটের পরিমাণ এখন আড়াই লাখ কোটি পাকিস্তানি রুপির বেশি। গ্যাস খাতের সার্কুলার ডেবট যুক্ত হলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ লাখ কোটি রুপিতে।
বিপুল পরিমাণ সার্কুলার ডেবট ছাড়াও বিদ্যুৎ খাতের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতাও দেশটির জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে দেখা দিয়েছে জ্বালানি সংকট। আমদানিতে খরচ বাড়লেও তা পূরণের মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই দেশটির হাতে। মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ অর্থনীতিতে দিন দিন আরো জোরালো হয়ে বসছে। বর্তমানে ডলারের বিপরীতে পাকিস্তানি মুদ্রার অবনমন ঘটছে খুব দ্রুতগতিতে। গত সাত মাসে ডলারের বিপরীতে মুদ্রার মান কমেছে ২৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। তাছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের হাতে থাকা রিজার্ভের পরিমাণ নেমে এসেছে প্রায় ৮৫০ কোটি ডলারে। এ পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে কয়েক সপ্তাহেরও আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব না। যদিও এক বছরের মধ্যে ২ হাজার কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ রয়েছে পাকিস্তানের ওপর।
এমন পরিস্থিতিতে অপ্রতুল হলেও আইএমএফের ঋণের দিকেই তাকিয়ে আছে পাকিস্তান। আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ হিসেবে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার পাওয়ার কথা রয়েছে পাকিস্তানের। কিন্তু এ অর্থ একবারে হাতে পাবে না দেশটি। গত ১৪ জুলাই হওয়া চুক্তির ভিত্তিতে কয়েকটি কিস্তিতে দেশটিকে এ ঋণের অর্থ দেবে আইএমএফ। এর মধ্যে প্রথম কিস্তিতে দেয়ার কথা রয়েছে ১১৭ কোটি ডলার। বর্তমানে এ অর্থছাড় আইএমএফের বোর্ডের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আগস্টের শেষদিকে সংস্থাটির বোর্ড এ নিয়ে আলোচনায় বসার কথা।
অনেকেরই ধারণা, আইএমএফের কার্যক্রমে পাকিস্তান অনুমোদন পেলেই দেশটির জন্য অন্যান্য অর্থনৈতিক দ্বার খুলে যাবে। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাও পাকিস্তানের জন্য তাদের দুয়ার খুলে দেবে প্রত্যাশা পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকদের।
পাকিস্তানের রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী পক্ষ দেশটির সেনাবাহিনী। স্বাধীন হওয়ার পর থেকে দেশটিতে সেনাবাহিনী ক্ষমতা হাতে তুলে নিয়েছে বারবার। আবার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারগুলোও সেনা সমর্থিত না হলে বেশিদিন টিকতে পারে না বলে নানা সময়ে বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। কথিত আছে, সর্বশেষ ইমরান খান ক্ষমতায় এসেছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সমর্থন নিয়ে। আবার এ সেনা সমর্থন হারানোয় ক্ষমতাও হারিয়েছেন তিনি। চলমান অর্থনৈতিক সংকট এখন ইমরান খানের জনপ্রিয়তাকে দিনে দিনে আরো বাড়িয়ে তুলছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতাও বাড়ছে। পরিস্থিতি এখন সামরিক অভ্যুত্থানের অনুকূলে। তবে সেক্ষেত্রে শেষ ভরসা আইএমএফের ঋণের আশাও ছাড়তে হতে পারে দেশটিকে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাসীন না হলে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণসহায়তা পাওয়াও মুশকিল। যদিও পাকিস্তানের সেনা কর্মকর্তাদের হাবভাবে এখন পর্যন্ত অভ্যুত্থান ঘটানোর মতো কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বরং এ মুহূর্তে সরকারের সহায়ক ভূমিকা গ্রহণেই তাদের উৎসাহ দেখা যাচ্ছে বেশি।