

খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
এত স্বল্প সমেয়র ব্যাবদান, মাত্র তিন বছরের নেতৃত্ব। কিন্তু সেই স্বল্প সময়েই একটি জাতির মানচিত্র বদলে দেওয়ার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন- ছবির এই মহিলা-ডঃ আমিনা গুরিব-ফাকিম, মরিশাস-এর ষষ্ঠ রাষ্ট্রপতি।
তিনি শুধু রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না। ছিলেন এক বিজ্ঞানমনস্ক আলোকবর্তিকা, যিনি বিশ্বাস করতেন উন্নয়ন কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। এটি সততা, শিক্ষা ও দক্ষতার সম্মিলিত ফল।
আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র মরিশাসে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদাণ করা হয়। শুধু পাঠদানই নয় শিক্ষার্থীদের বাড়ি থেকে স্কুলে আনা-নেওয়ার খরচও রাষ্ট্র বহন করে। সেখানে শিক্ষা কোনো বিক্রয়যোগ্য পণ্য নয়। এটি নাগরিকের অধিকার, রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা।
কারণ তারা জানে যে জাতি শিক্ষাকে সম্মান করে, ভবিষ্যৎ তার কাছেই আত্মসমর্পণ করে।
মরিশাসে প্রতিটি নাগরিক বিনামূল্যে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা পান। ব্যয়বহুল হৃদরোগের অস্ত্রোপচারও এর অন্তর্ভুক্ত। নাগরিকের অসুস্থতা সেখানে ব্যবসার সুযোগ নয় বরং রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ব।
দেশটির প্রায় ৯০% মানুষ নিজেদের বাড়িতে বসবাস করেন। গৃহহীন পরিবার নেই বললেই চলে। জমি বা নির্মাণসামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্য নিয়ে দীর্ঘশ্বাস শোনা যায় না।
কারণ তারা জানে মাথার উপর একটি ছাদ শুধু ইট-সিমেন্ট নয়। এটি নিরাপত্তা, মর্যাদা ও আত্মসম্মানের প্রতীক।
একসময় যাদের জীবিকা ছিল শুধুই মাছ ধরা, সেই দেশ আজ মাথাপিছু আয় ১৯,৬০০ ডলারে উন্নীত করেছে। বহির্বিশ্ব তাদের “আফ্রিকার সিঙ্গাপুর” বলে ডাকে।
কিন্তু তারা নিজেরা বলে আমরা অন্য কারও মতো হতে চাই না। না সিংগাপুর, না ইউরোপ। আমরা নিজেরাই নিজেদের উন্নত জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।
জাপানের মতোই তাদের উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ নেইনা তেল, না খনিজ। তাদের একমাত্র সম্পদ দক্ষ, সুশিক্ষিত, সৎ মানুষ।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে আমিনা গুরিব-ফাকিম প্রথমেই যা করেছিলেন, তা হলো প্রতিটি খাতে সবচেয়ে যোগ্য ও সৎ মানুষকে দায়িত্ব দেওয়া। ক্ষুদ্র অফিস থেকে মন্ত্রিসভা দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলা ।
তিনি বলেছিলেন দুর্নীতি একটি ফুটো বালতির মতো। যত উন্নয়নের জলই ঢালা হোক, সব গলে যাবে। তাই সবার আগে এই ফুটো বন্ধ করতে হবে।
তাদের সামরিক ব্যয় সীমিত। প্রকৃত ব্যয় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জনসেবায়। আর আয়- কৃষি, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানি ও পর্যটন এই তিন স্তম্ভে দাঁড়িয়ে আজকের সমৃদ্ধ মরিশাস।
অত্যন্ত দূর্ভাগ্যের সাথে বলতে হয়-যদি নিরাপত্তা আর যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকতো তবে আমাদের সেন্টমার্টিন, সুন্দরবন হতে পারতো গোটা পৃথিবীবাসীর ভেকেশান ডেস্টিনেশান এবং রাষ্ট্রীয় আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এ দেশের মানুষকে অন্য দেশের বাথরুম পরিষ্কার করে আর জাঙ্গিয়া বানানোর উপরই শুধু নির্ভর করতে হতো না।
জৈব রসায়নে পিএইচডিধারী এই বিজ্ঞানী-রাষ্ট্রনায়কের বিখ্যাত উক্তি- রাজনীতি আমাকে বেছে নিয়েছে, আমি রাজনীতিকে বেছে নিইনি।
তিনি ২০টিরও বেশি বই ও একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র রচনা করেছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল
দেশের উন্নয়ন মাটির নিচের সম্পদে নয়, মাটির উপরের মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকে।
দক্ষিণ আফ্রিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথে একটি বার্তা টানিয়ে দেন কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে পারমাণবিক বোমা প্রয়োজন নেই। শুধু শিক্ষার মান কমিয়ে দাও, নকলের সুযোগ করে দাও। নকল শিক্ষায় নকল মানুষ তৈরি হবে। আর নকল মানুষ পুরো জাতিকে ধ্বংস করে দিবে। কারণ-
নকল করে পাশ করা ডাক্তার রোগীর জীবন নেবে।
নকল প্রকৌশলী ভবন ধসাবে।
নকল অর্থনীতিবিদ অর্থনীতি নষ্ট করবে।
নকল বিচারক ন্যায়বিচার হত্যা করবে।
নকল শিক্ষক অজ্ঞতা ছড়াবে।
একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয় এটি নৈতিকতা, শিক্ষার মান, সততা ও মানবিকতার সমন্বিত ফল।
মরিশাস আমাদের শেখায়
যে জাতি নিজের মানুষকে গড়ে তোলে, দূর্নীতি দূর করে – তাকে আর কেউ থামাতে পারে না। আর যে জাতি শিক্ষাকে অবহেলা করে, দূর্নীতিগ্রস্থ হয়ে পড়ে তাকে আর কেউ বাঁচাতেও পারে না।











