খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
উন্নয়নের ঢামাডোল আর আশার বানী শুনতে শুনতে আমরা, মানে পুরু জাতি অনেক ক্লান্ত হয়ে ঘভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। নিদ্রাচ্ছন্ন ক্লান্ত জাতিকে কখন যে আবার উন্নয়নের ড্রাগ পুশ করে আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা টের কারার মত স্বচেতন শক্তি জাতি ফিরে পাবে কিনা তা একমাত্র রাষ্ট্রীয় আইন প্রনেতা ব্যক্তিবর্গ ব্যতিত রাষ্ট্রের সচেতন ব্যক্তি এবং সুশিল সমাজ কারোই জানার বাকি নাই, উন্নয়নের ঢামাডোল আর আশার বাণী শোনা জাতিকে নিদ্রাচ্ছন্ন রেখে আইসিইউ থেকে স্বার্থবাদি অথর্বদের কারনে লাইফ সাপোর্টে নিয়ে যাওয়া হয় কিনা এটাই বর্তমানে মূল আলোচনার বিষয়।
বিশ্ব অর্থনীতির চিত্র বর্তমানে অনেকটাই হুমকির দিকে থাকলেও আমাদের অর্থনীতি এখন কোন পথে যাচ্ছে, এর উত্তর দেওয়া একটু কঠিনই বটে। যদিও বিশ্ব অর্থনীতির উপর অনেকটাই নির্ভর করছে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ। অর্থনীতিকে কোন পথে যেতে হবে, এটা নিয়ে নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও আছে নানা মত। তবে সবাই একমত যে সামনে দৃষ্টির আয়নাতে ভেসে উঠা সম্ভাব্য প্রতিটি পথই খারাপ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কুৎসিতও বলে মনে হয়। পথ তিনটি হল উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বদ্ধ স্ফীতি বা স্ট্যাগফ্লেশন এবং রিসেশন বা মন্দা। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস গত মাসে বলেছেন, বেশির ভাগ দেশই মন্দা অবস্থা ধেয়ে আসছে। এমনকি বিশ্বে ১৯৭০ দশকের সেই স্ট্যাগফ্লেশনও ফিরে আসতে পারে বলেও মত প্রকাশ করেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিভা সম্প্রতি বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন ও আরও অনিশ্চিত। সুতরাং প্রশ্ন হচ্ছে, অর্থনীতি কি মন্দার পথে, নাকি ফিরে আসছে স্ট্যাগফ্লেশন। আর মন্দা, তাহলে সেটি কবে থেকে, নাকি শুরু হয়ে গেছে?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে উৎপাদন বাড়িয়ে দেয় এবং সেই সাথে বেকারত্ব এবং মূল্যস্ফীতিও অনেক কমে প্রায় ১ শতাংশের ঘরে নেমে আসে। এমন পরিস্থিতি বেশিদিন স্থায়ি হয়নাই, ১৯৬৫ সাল থেকে বাড়তে থাকে বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি, যা ১৯৮২ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে। ১৯৮০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির হার ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ। এটাই হল দ্য গ্রেট ইনফ্লেশন। এর মধ্যেই অভিজ্ঞতা হয় স্ট্যাগফ্লেশনেরও। এরপর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক অর্থব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা কী হবে, নির্ধারিত হয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারকরা স্থির করে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম কাজ। সেভাবেই ভূমিকা পালন করে আসছে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফেডারেল রিজার্ভ বা ফেড। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও তা ফলো করে চলছে।
১৯৮১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হন রোনাল্ড রিগ্যানের মন্তব্য ছিল ‘মূল্যস্ফীতি হচ্ছে ছিনতাইকারীর মতো হিংস্র, সশস্ত্র ডাকাতের মতো ভয়ংকর এবং খুনির মতোই প্রাণঘাতী।’ তখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি রুখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে আর্থীক মন্দাকে বেছে নিয়েছিল। মার্কিন নীতি নির্ধারকরা কৌশল হিসাবে ফেড মুদ্রা সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমিয়ে নীতিনির্ধারণী সুদহার বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে একদিকে কমে যায় উৎপাদন অন্যদিকে মানুষের হাতে কমে যায় নগদ অথ, এতেকরে কমে চাহিদাও। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৮৫সালে মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছিল প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশে।
যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি বর্তমানে প্রায় ৯ দশমিক ১ শতাংশ, যা গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড। অর্থ্যাৎ আশির দশকের পর এটাই সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। বর্তমান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ফেড চলতি বছরে এ পর্যন্ত চারবার সুদের হার বাড়িয়ে মুদ্রা সরবরাহ কমানোর চেষ্টায় তারা। ফেডের চেয়ারম্যান জেরোমি পাওয়েল বলেছেন, মূল্যস্ফীতি না কমা পর্যন্ত তাঁরা সুদহার বাড়িয়েই যাবেন।’ মার্কিন নীতি নির্ধারকদের অনেকেরই আশঙ্কা, ফেডের এই নীতিই আসলে মন্দার দিকে নিয়ে যাচ্ছে বিশ্বঅর্থনীতিকে। যুক্তরাষ্ট্রের বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৯ শতাংশ আর মূল্যস্ফীতি প্রায় ১৫ শতাংশ। এটাই সেই কুখ্যাত স্ট্যাগফ্লেশন, যাকে অনেকেই সবচেয়ে কুৎসিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বলে মনে করেন। অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদদের প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ (এনবিইআর) অর্থনীতির বাণিজ্যচক্র বিশ্লেষণ করে বলে দেয় কখন অর্থনীতির মন্দা শুরু আর কখন শেষ। তাদের বিশ্লেষনমতে সাধারণত পর পর দুই প্রান্তিকে অর্থনীতি সংকুচিত হলে তাকেই মন্দা বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে পরপর দুই প্রান্তিকেই অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে। মন্দার ঘোষণা এখনো না আসলেও মন্দা যে আসছে, তাতে সন্ধেহ নাই বলে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকরা সবাই নিশ্চিত বলে জানিয়েছেন।
ব্লুমবার্গের অর্থনৈতিক মডেলের মতে, ২০২৪ সালে মন্দা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা ১০০ শতাংশ। জার্মানির ডয়চে ব্যাংকের অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, মন্দা দেখা দেবে ২০২৩ সালের মাঝামাঝিতে। যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ওয়েলস ফারগো অ্যান্ড কোম্পানির মতে, মন্দা হবে ২০২৩ সালের শুরুতে এবং জাপানের আর্থিক কোম্পানি নমুরা হোল্ডিং বলছে, মন্দা দেখা দেবে চলতি বছর অর্থ্যাৎ ২০২২-এর শেষ দিকেই।

ডলারের দাম যেভাবে বাড়ছে, টাকার কেন কমছে?
আশির দশকে ফেড মন্দাকে তারা যেভাবে বরণ করে নিয়েছিল বর্তমানে ফেডের কৌশল অন্যরকম, মন্দায় না ঢুকেই মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে চায় তারা। তাদের ধারনা, কর্মসংস্থানের তুলনায় জনসংখা বৃদ্ধির হার বেশি হওয়ায় মন্দা দেখা দিলে উৎপাদন কমবে, কর্মসংস্থান কমে বেকারত্ব বাড়বে, মানুষের আয়ও কমে যাবে। এই পরিস্থিতি অর্থনীতির জন্য মোটেই সুখকর নয়। যদিও মার্কিন অর্থনীতির জন্য মন্দা মোটেই নতুন কিছু নয়। ১৮৫৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মার্কিন অর্থনীতিতে ৩৪ বার মন্দা দেখা দিয়েছিল, প্রতি ৫ বছর পরপর দেখা দেওয়া মন্দা প্রায় ১৭ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ মন্দার কবলে পড়লে এর প্রভাব পড়বে সারা বিশ্বে, বাংলাদেশও এর থেকে বাইরে নয়। কেননা চীনের অর্থনীতিও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে পুরো ইউরোপজুড়েই পড়তে যাচ্ছে তীব্র জ্বালানি সংকট, যা আমাদের অর্থনীতিকেও চরমভাবে প্রভাবিত করতে পারে বলে সূশিল সমাজের অনেকেরই ধারনা।
মতামত:
সর্বশেষ আমার সাথে অনেকেই একমত হবেন যে, বিশ্ব অর্থনীতির মন্দার সাথে সাথে পাল্লা বা প্রতিযোগিতায় না গিয়ে বা বিশ্ব মোড়ল ক্ষাত আমেরিকানদের ডলারের সাথে আমাদের অর্থনীতি ও টাকার অবমুল্যায়ন না করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মত ইউনিটি গঠন করে যেমন ইউরো মুদ্রা চালু করেছে, যা মার্কিন ডলারের সাথে পাল্লা দিয়ে ধাপটের সাথে ব্যাবহার হচ্ছে, যা আমাদের দেশীয় মুদ্রামানের সাথে ভারসাম্যহীন এবং টাকার অবমুল্যায়ন বলে প্রতিয়মান হয়। তাই ইউরো এবং মার্কিন ডলারের মুদ্রামানের সাথে সমযোতা রেখে এশিয় ইউনিয়ন গঠন করে সমমানের মুদ্রা ব্যবস্থা চালুর জন্য নতুন নামের মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করা উচিত। নতুন নামের এই মুদ্রা যাতে করে এশিয় ইউনিয়নের দেশগুলির অভ্যন্তরিন মুদ্রামানকে ঠিক রেখে ডলার এবং ইউরোর সাথে পাল্লা দিয়ে আন্তর্জাতিক ভাবে (সারা বিশ্বে) চালুর মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিযোগিতায় সমানভাবে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে সে ব্যবস্থা করা উচিত। এতেকরে অবৈধ অর্থ পাচার কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হবে এবং এশিয় অভ্যন্তরিন মুদ্রা মানের অবমুল্যায়ন অনেকটাই কমে যাবে, যা বিশ্ব অর্থনীতির মন্দাবস্থার ভারসাম্য রক্ষা করে, খাদ্য সংকট, জ্বালানি সংকট, কর্মসংস্থান, শিল্পোৎপাদন, আমদানি রপ্তানিসহ সকল খাতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে বলে আশা করি।
লেখক : সম্পাদক প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন ও মানবাধিকার কর্মী।











