

খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
একজন দেশপ্রেমিক আপোসহীন নেত্রীর চির বিদায় যেন ১৮ কোটি লোকের দু-চোখের কোনে দু ফোটা অশ্রুবিন্দু হয়ে হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নিরব প্রতিবাদ সংগ্রাম, ত্যাগ আর আপোসহীনতার বিরল এক নেতৃত্বের দীর্ঘ অধ্যায় শেষে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চির বিদায় একটা জাতির হৃদয়কে কঠিনভাবে নাড়া দিয়েছে। বাস্তবিক অবস্থায় তিনি আর আমাদের মাঝে না থাকলেও তার জীবন, আদর্শ ও সংগ্রাম দেশের ইতিহাসের পাতায় পাতায় এমনভাবে মিশে আছে, যা সহজে মুছে যাওয়ার নয়। সময় যত যাবে, রাজনীতি বদলাবে, কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার নাম ততই উচ্চারিত হবে একজন দৃঢ়চেতা, সাহসী, বিচক্ষণ ও মানবিক নেত্রী হিসেবে। আবার রাজনীতির মাঠে তিনি ছিলেন আপোসহীন। ব্যক্তিত্বে ছিলেন দৃঢ়। ছিলেন নির্ভীক সিদ্ধান্তের মুর্ত প্রতিক। আবার মানুষ হিসেবে ছিলেন এক অনন্য মানবিকতা অধিকারী, রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তিনি সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট ভুলে যাননি। ক্ষমতায় থাকুন বা বিরোধী দলে দেশের মানুষের অধিকার, ভোটের অধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে তিনি কখনো আপোস করেননি।
তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রীই ছিলেন না সবার কাছে তিনি ছিলেন মাতৃত্তের মতো এক স্নেহশীল, হৃদয়গ্রাহী আশ্রয়দাত্রী, অনুপ্রেরণার উৎস। রাজনৈতিক জীবনে বহু সংকটে, বহু কঠিন মুহূর্তে তিনি ছিলেন আমার সাহসের জায়গা, শ্রদ্ধার ঠিকানা। এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের জীবনকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করেছিলেন এই দেশের মাটি ও মানুষের জন্য।
তিনি মানুষের হৃদয়ে কতটা স্থান করে নিয়েছিলেন এবং তাকে মানুষ কতটা ভালোবাসতেন, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া গেছে তার মৃত্যুপরবর্তি জানাজায়। যেখানে কোটি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি, অশ্রুসিক্ত নয়নে, নীরব প্রার্থনা সব মিলিয়ে সেদিন অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্ভর একটি কফিনকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল পুরো বাংলাদেশ। মানুষ শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নয়, একজন খালেদা জিয়াকে, বিদায় জানিয়েছে একজন প্রিয় দেশনেত্রীকে। আমার জীবনে বেগম খালেদা জিয়া শুধুই একটি স্মৃতি নন তিনি শক্তি, সাহস, প্রেরণার ও নিরব প্রতিবাদের জ্বলন্ত প্রতীক।
বিএনপির প্রতিটি নেতাকর্মীর জন্য এটি একটি শিক্ষনীয় ও দায়িত্ব নেয়ার সময়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ ধারণ করে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দল তথা রাষ্ট্রের গুরুদায়ীত্ব নিয়ে নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে কতটুকু চাপ সামলাতে পারবেন সেটা এখন সময়ের দাবি। নেতৃত্ব সঙ্কটে থাকা বিএনপি, বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু, রাজনীতিতে অপরিপক্ক তারেক রহমান বর্তমান সময়ে যেন স্থিতিশীল জীবনের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক জীবনের চাপে ভাবিয়ে তুলেছে যা গত অর্ধশতাব্দির বেশি সময়েও কোন নেতা-নেতৃকে এমতাবস্থায় পড়তে দেখা যায় নাই। আবার একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতিতে কোনো নেত্রীর মৃত্যুকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে এমন শোক ও প্রতিক্রিয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। রাব্বুল আলামিন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্ব্বোচ্চ স্থান দান করুক।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি। একজন সাধারণ বাঙালি গৃহবধূ হিসেবে রাজনীতিতে পা রেখে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। এই চার দশকের পথচলায় তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির প্রায় সব উত্থান-পতনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও অংশীজন ছিলেন। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণমানুষের অধিকার রক্ষার সংগ্রামে তাকে সহ্য করতে হয়েছে জেল-জুলুম, নির্যাতন ও অবিচার।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যার পর তাকে ক্যান্টনমেন্টে বসবাসের জন্য একটি বাড়ি দেওয়া হয়েছিল। সেই বাড়ি থেকেও তাকে চলে যেতে হয়েছে। বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ না পাওয়ার কারনে হারিয়েছেন তিনি এক সন্তানকে। আন্ত রাজনীতির কুটচালে আরেক সন্তানকে দীর্ঘদিন নির্বাসনে থাকতে হয়েছে। নিজে ছিলেন গৃহবন্দী। কিন্তু এত কষ্ট, এত শোক, এত নিপীড়নের পরও তিনি আপোসহীন। মানুষের ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার তীব্র লড়াই চালিয়ে গেছেন অবিচলভাবে, যার কোন দিন ক্ষন, মাস-বছর বা যুগের উল্লেখ ছিল না। এই সেই সীমাহীন ব্যক্তিত্বের নাম বেগম খালেদা জিয়া।
জিয়াউর রহমান হত্যার পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় দলের একটি অংশ তাকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করার প্রস্তাব দিয়েছিল। সে সময় তিনি ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিলে তার রাজনৈতিক জীবন হয়তো অন্যভাবে এগোতে পারত। এই বিষয়টি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ তার গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন হার না মানার মানুষ।
স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে টানা নয় বছরের আপোসহীন আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। কোনো দেশবিরোধী শক্তির সঙ্গে তিনি কখনো আপোস করেননি। তবে জনগণের মতামতকে তিনি সবসময় গুরুত্ব সহকারে প্রাধান্য দিয়েছেন বিধায় জীবনে কোনো নির্বাচনে তাকে পরাজিত হতে হয়নি এটিও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
রাজনীতিতে না এলে তার ব্যক্তিগত জীবন হয়তো অনেক বেশি স্বস্থির হতো। একজন সেনাপ্রধানের স্ত্রী, একজন বীর উত্তমের স্ত্রী, একজন রাষ্ট্রপতির স্ত্রী হিসেবে তিনি সম্মান ও নিরাপত্তার অভাব অনুভব করতেন না। ত্রিশ বছর আগে যেখানে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে একজন মুসলিম নারীর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ কোন অবস্থাতেও কুসুমাস্তির্ণ ছিল না।
একজন বিধবা নারী সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করেছিলেন এই ইতিহাস সাহস ও দৃঢ়তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি সেই লড়াইয়ে জয় নিয়েই ঘরে ফিরেছেন। তিনি নারী শিক্ষা উন্নয়নের প্রবর্তক ছিলেন, তার শাসনামলে নারী শিক্ষার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক কাঠামো ফিরে পেয়েছে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা।
আশি বছরের জীবনে চল্লিশ বছরের বেশি সময় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার ইতিহাসটাও বেগম খালেদা জিয়ার। তিনি তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। বহুবার সংসদে ও রাজপথে বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিশ্বের কোন একজন জনপ্রিয় নেতাকে লম্বা সময় জেলে রাখার ইতিহাসে ন্যালসন মেন্ডেলার পর বেগম খালেদা জিয়াকে দীর্ঘদিন জেল/গৃহবন্দী রাখার নজির তেমন একটা নাই। ক্ষমতায় বা বিরোধী দলে থাকুক না কেন বেগম খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা কখনো কমেনি, বরং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বেড়েছে। তিনি কেবল বাংলাদেশের নয়, বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের প্রতীক হয়ে উঠেছেন, যার কারনে বেগম খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপোসহীনতার প্রতীক।
বেগম খালেদা জিয়ার মতো নেতা যুগে যুগে জন্মান না। তিনি কী ছিলেন, তা এখন আরও স্পষ্ট যখন তিনি নেই। তার মুক্তির দাবিতে প্রতিদিন রাজপথ কেঁপেছে। আজও রাজপথে তার নামেই সেøাগান ওঠে। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতেই যেন তার জন্ম। তিনি হারেন না, থেমে যান না বারবার ঘুরে দাঁড়ান। শতবার। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন গণতন্ত্রের এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
মহাত্মা গান্ধী, নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিংয়ের মতো তিনিও তার দেশের মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। তার লড়াই ছিল মানুষের মুক্তির লড়াই। তার মৃত্যু তার জীবনকে পৃথিবীর সামনে এমনভাবে তুলে ধরেছে, যা সত্যিই বিরল, এর প্রমান তার মৃত্যুর পর তার ছবি সম্বলিত শোক বার্তা পোষ্টার ব্যানার দেশের রাজপথ থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল, গ্রাম-গঞ্জ পর্যন্ত সুশোভিত হয়ে আছে যার প্রেরনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেয়েরা সাহস, আত্মমর্যাদা ও সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়ার পথ অনুসরন এবং অনুকরন করবে এবং এরাই হবে বেগম খালেদা জিয়ার বড় উত্তরাধিকার।
দেশপ্রেমের অমর দৃষ্টান্ত, আপোসহীন সংগ্রাম আর সীমাহীন ত্যাগ এবং আস্তার প্রতীক হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া বেঁচে থাকবেন বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের অন্তকরনে। তার আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ধারণাই হবে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি আমাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা…
লেখক : প্রতিবাদী কবি, সব্যসাচী লেখক, কথাসাহিত্যিক, সম্পাদক প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন।


















