খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার ও রিজার্ভ সংকটের নেপথ্যে

ড. সেলিম রায়হান
গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরেও বাড়ছে খেলাপি ঋণ। সার্বিকভাবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থা বিবেচনা করলে দেখা যাচ্ছে, কয়েকটি বাদে অধিকাংশ ব্যাংকই খুব চাপে আছে। খেলাপি ঋণ এমন উদ্বেগজনক জায়গায় থাকলে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংক খাতের যে ভূমিকা থাকা উচিত তা করতে পারে না। আর্থিক খাতে যে আস্থার জায়গা তৈরি করা উচিত সেটি তারা করতে পারছে না। এক্ষেত্রে আমরা যে আইএমএফের শর্তের কথা বলি; এ খেলাপি ঋণ, কর জিডিপি, রিজার্ভ যা-ই বলেন না কেন, এগুলো তো আইএমএফের চেয়েও দেশের অর্থনীতিবিদরাই কিন্তু অনেক আগে থেকে বলে আসছেন। কর, মুদ্রা ব্যবস্থা, ব্যাংক খাতে যে সংস্কারগুলো দরকার ছিল আমরা কথা বলে এসেছি। কিন্তু দীর্ঘদিন তাতে কর্ণপাত করেননি নীতিনির্ধারকরা। যখন আইএমএফের ঋণ পেতে নানা শর্তের আওতায় এসেছেন তখন গুরুত্ব দিচ্ছেন।
খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের ভয়ানক একটি ক্ষত। এটি বর্তমানে এ খাতে যে বিশৃঙ্খলা নিয়ে এসেছে তাতে আর্থিক খাতের আস্থা নষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি যদি সামনের দিকে নিয়ে যেতে চাই তাহলে খেলাপি ঋণের লাগাম টানা জরুরি হয়ে পড়েছে। উন্নত অর্থনীতি হতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক খাতে অব্যবস্থাপনার রাশ টানা যে গুরুত্বপূর্ণ এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদরা দ্বিমত পোষণ করবেন না। যে জায়গায় পৌঁছতে চাই তাতে ব্যাংক খাতের এ খেলাপি ঋণ এবং সামগ্রিক যে অব্যবস্থাপনা আছে ব্যাংক খাতে যা কোনোভাবেই সংগতিপূর্ণ নয়, এ ব্যাপারে আমাদের অর্থনীতিবিদরা বোধহয় দ্বিমত করবেন না। এক্ষেত্রে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে বেশকিছু সংস্কার হওয়া দরকার ছিল। যেমন আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা ও সাংঘর্ষিক আইনগুলোর সংশোধন আনা। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের একাধিক সদস্য রাখা না রাখা নিয়ে সিদ্ধান্ত।
খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা নিয়েও সমস্যা আছে। বিভিন্ন সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখানো হয় সংজ্ঞা পরিবর্তন করে। প্রকৃত তথ্য অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, বর্তমানে আনুষ্ঠানিকভাবে যা বলা হয় তার চেয়ে দেড়-দুই গুণ হবে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ। এটা কিন্তু বড় শঙ্কার ব্যাপার। আরেকটা জিনিস লক্ষণীয়, ব্যাংক খাতে যেন ‘‌ দ্বৈত শাসন’ চলছে। সরকারি ব্যাংকগুলো দেখে ফাইন্যান্স ডিভিশন এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলো দেখে বাংলাদেশ ব্যাংক। স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কোনো ধরনের প্রভাবমুক্ত হয়ে যে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করবে সে জায়গায় এখনো ঘাটতি আছে। আমি মনে করি, ব্যাংক খাতে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংককে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে প্রকৃত ক্ষমতা দেয়া উচিত। যারা নানা প্রক্রিয়ায় ঋণ খেলাপি হচ্ছে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে যারা প্রভাবশালী তাদের বিরুদ্ধে যেন ব্যবস্থা নেয়ার সাহস ও ক্ষমতা থাকে তাদের। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক উন্নয়ন আমরা করতে পারব না। সামগ্রিকভাবে দেখতে গেলে, ব্যাংক খাতের বড় সংকট হলো সুশাসনের অভাব ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যথাযথ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি।

আর্থিক খাতের আরেকটা বড় সমস্যা অর্থ পাচার। হুন্ডি, হাওলা, ওভার-ইনভয়েসিং ও আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে। এটি ঠেকানো যাচ্ছে না। তবে হুন্ডি নিয়ে বাজারে যে গল্প প্রচলিত তা অনেকটা একপক্ষীয় গল্প। আমাদের প্রবাসী শ্রমিকরা আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে না পাঠানোর মাধ্যমে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠাচ্ছেন। আমরা তাদের বৈদেশিক মুদ্রাটা পাচ্ছি না। কিন্তু হুন্ডির এ গল্পটা আংশিক সত্য। বাকিটা হচ্ছে, এ হুন্ডির চাহিদা কারা সৃষ্টি করছে সে প্রশ্নের উত্তরে। যে হুন্ডিওয়ালা বিদেশে থেকে প্রবাসী শ্রমিক ভাইবোনদের কাছ থেকে এ বৈদেশিক মুদ্রাগুলো সংগ্রহ করছে, সে এগুলো নিয়ে কী করবে? আর দেশে হুন্ডি কারবারি প্রবাসী শ্রমিক ভাইবোনদের পরিবারে যে টাকা দিচ্ছে ওই টাকা কোথায় পেল? এ অর্ধেক গল্পের পরের অংশ হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার। লাগামহীন অর্থ পাচারের কারণেই হুন্ডির চাহিদা বাড়ছে।
যারা টাকা পাঠাতে চায়, তারা কীভাবে ওই হুন্ডিওয়ালাদের সাহায্য নেয়? কেউ বিদেশে টাকা পাঠাতে চাইলে তারা যোগাযোগ করবে দেশের হুন্ডিওয়ালাদের এজেন্টদের সঙ্গে। টাকা পাচারকারীরা হয়তো হুন্ডিওয়ালাদের এজেন্টদের কাছে কয়েক কোটি টাকা দিল বিদেশে টাকা পাচারের জন্য, যার সমপরিমাণ অর্থ হুন্ডিওয়ালারা ওই টাকা পাচারকারীদের বিদেশের কোনো অ্যাকাউন্টে বৈদেশিক মুদ্রায় জমা দিয়ে দেবে। হুন্ডিওয়ালারা তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে ওই বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে প্রবাসী শ্রমিক ভাইবোনদের কাছ থেকে সংগ্রহ করছে। এতে প্রবাসীদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশ বিদেশেই থেকে যাচ্ছে, দেশে আসছে না। সুতরাং আমরা হুন্ডি বন্ধ করতে চাইলে আগে দেশ থেকে টাকা পাচার বন্ধ করতে হবে। আশঙ্কাজনক হারে আমাদের দেশ থেকে টাকা পাচার হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রীও এটি স্বীকার করেছেন। সুতরাং এটা যেকোনো লুকোছাপার বিষয় তা নয়। তাহলে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না কেন? এর সঙ্গে কি অনেক প্রভাবশালী জড়িত, যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায় না? যারা এসব তদারকির দায়িত্বে আছেন ওই পাচারকারীরা কি তাদের স্ক্যানিংয়ের নজরদারির বাইরে? এক্ষেত্রে তাদের তো অনেক প্রভাবশালী হতেই হবে। তা না হলে এত টাকা সে দেশের বাইরে পাঠায় কীভাবে? এর মধ্যে কিছু ব্যবসায়ীও আছেন যারা ওভার-ইনভয়েসিং কিংবা আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে টাকা পাচার করছেন।
যত বেশি বাইরে টাকা পাচার হবে তত বেশি হুন্ডির চাহিদা বাড়বে। যারা বাংলাদেশ থেকে টাকা পাঠাতে চায় তারা কিন্তু বেপরোয়া। ফলে যেকোনো রেটে তারা টাকা পাঠাতে চায়। কারণ তারা মনে করে ডলারে কনভার্ট করলে আর বিদেশে রাখলে তাদের টাকা সুরক্ষিত থাকবে। হুন্ডিওয়ালারা পাচারকারীদের কাছ থেকে এই যে লাভ পাচ্ছে তাতে বিদেশে প্রবাসী শ্রমিক ভাইবোনদের কাছে একটা বাড়তি রেট অফার করতে পারে। সুতরাং রেমিট্যান্স দেশে আনার জন্য আমরা যতই প্রণোদনা দিই না কেন, বিনিময় হারকে যতই সমন্বয় করি না কেন দেশ থেকে অর্থ পাচার বন্ধ না করতে পারলে হুন্ডির ব্যবসা বন্ধ হবে না এবং অফিশিয়াল চ্যানেলে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ানো কঠিন হবে। তাই আমরা যদি বিদেশ থেকে অফিশিয়াল চ্যানেলে বেশি পরিমাণে রেমিট্যান্স আনতে চাই তাহলে দেশ থেকে অর্থ পাচার বন্ধ করতে হবে আগে।

অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণে বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। যারা অর্থ পাচারে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক ব্যবস্থা নেয়া। অর্থ পাচারের একটি বড় অংশই কিন্তু ডিজিটাল ট্রানজেকশন; যা মনিটরিং করা দুঃসাধ্য কাজ নয়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত হয়ে যদি বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা নেয় তাহলে আমরা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখব।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের সময় সন্নিকটে। সম্প্রতি ঋণদাতা সংস্থাটির রিভিউ মিশন বাংলাদেশ সফর করেছে। আইএমএফের ঋণের পরবর্তী কিস্তি পেতে যে শর্তগুলো রয়েছে, যা শোনা যাচ্ছে, দুটি ক্ষেত্রে (কর-জিডিপি অনুপাত এবং রিজার্ভ) অগ্রগতি সরকার দেখাতে পারেনি। কর-জিডিপি অনুপাতে কোনো অগ্রগতি নেই। আবার রিজার্ভ কমতে কমতে ২০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমেছে। ক্রমান্বয়ে রিজার্ভ কমলেও বাড়ার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। কয়েক মাসের রফতানি, রেমিট্যান্স এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির যে অবস্থা দেখছি তাতে সহসাই রিজার্ভের উন্নতি দেখছি না। এর মধ্যে সামনের মাসগুলোয় রাজনৈতিক অস্থিরতাও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে নাটকীয়ভাবে রাতারাতি রিজার্ভের উন্নতি ঘটবে বলে মনে করি না। বরং আমার আশঙ্কা, আরো কমতে পারে আমাদের রিজার্ভ। এখন নজর রাখতে হবে, আইএমএফ এ রিজার্ভ ক্ষয়কে কীভাবে দেখে।
যেহেতু এ শর্তগুলো পূরণ হয়নি, দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের আগে আইএমএফের রিভিউ মিশন দল অবশ্যই এগুলো খতিয়ে দেখবে। রিজার্ভের দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে সেপ্টেম্বরেও ২ বিলিয়ন ডলার কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের দরটাকে ধরে রাখার জন্য এখনো বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়াচ্ছে এবং বিক্রি করছে। আর আগে গত বছর থেকে প্রতি মাসেই বড় অংকে ক্রমাগত রিজার্ভ ক্ষয় হয়েছে। একটা প্রশ্ন আসে, কেন এভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্ষয় করা হয়েছে?
আপনি যদি কৃত্রিমভাবে ডলারের দর ধরে রাখতে চান তাহলে এ রকম সংকটের সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমতেই থাকবে। আর যদি রিজার্ভ ধরে রাখতে চান তাইলে ডলারের দাম বাড়বে। এখন এ দুটো খারাপের মধ্যে কোনটা কম খারাপ এটা কিন্তু বিবেচনায় নেয়া দরকার ছিল। আমরা তো দেখতে পাচ্ছি যে এ রকম সংকটের সময় সামষ্টিক অর্থনীতির যদি স্থিতিশীলতা বলি তাহলে রিজার্ভের পরিমাণটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে বিনিময় হার নিয়ে সরকারের দীর্ঘ ভুল নীতির ফল আমরা দেখছি। বিনিময় হার আগে থেকেই যদি ক্রমান্বয়ে বাজারের হারের সঙ্গে সমন্বয় করা হতো তাহলে আমরা এমন পরিস্থিতিতে পড়তাম না। এখন হঠাৎ বড় সমন্বয়ের কারণে বিনিময় হারের আমরা বড় একটা উল্লম্ফন দেখতে পাচ্ছি। এতটা সমন্বয়ের পরও বিনিময় হার এখনো বাজারভিত্তিক নয়। সুতরাং আমাদের এটা মেনে নিতেই হবে যে বিনিময় হারের আরো সমন্বয় প্রয়োজন। এখানে আমি মনে করি, এই যে রিজার্ভ আবারো কমছে, এটি খুবই শঙ্কার ব্যাপার এবং এ জায়গায় একটা শক্ত ব্রেক দেয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরো প্রোঅ্যাকটিভ রোল আশা করি আমরা। আইএমএফ হয়তো এ কিস্তির ঋণ বিবেচনা করতে পারে। আমরা হয়তো সব শর্ত পূরণ করতে পারেনি তবু কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপের কারণে আইএমএফ এবার ছাড় দিতে পারে। তবে সংস্কার কর্মসূচিতে বড় অগ্রগতি না হলে তৃতীয় কিস্তি প্রাপ্তিতে আমাদের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
ড. সেলিম রায়হান: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
নির্বাহী পরিচালক, সানেম