ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুস একজনই, তিনি বিশ্বসেরা যার কোন বিকল্প নেই। প্রত্যেকেরই যানা উচিত…

খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
যারা তির্যকভাবে কথার তীর ছোড়েন ডক্টর মুহাম্ম ইউনূসের দিকে, তাদের প্রত্যেকটি লোককে বলি, যেকোনো লোকের সমালোচনা করার পূর্বে আপনারা নিজেরা একটু ধিরস্থির চিন্তা করে বড় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে এবং নিজের অবস্থান চিন্তা করে বিবেক বর্জিত হলেও এই লেখাটা পড়ে নিবেন না হয় দায়ী থাকবেন স্রষ্টার নিকট এবং নিজের বিবেকের নিকট।
ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসকে বিশ্রিভাবে “সুদি, সুদখোর, পাচারকারী, ক্ষমতা লোভী” যা ইচ্ছা তাই বলেন না কেন, কিন্ত… মজার ব্যাপার হচ্ছে, যারা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসকে পছন্দ করেন, তাদেরও বেশিরভাগ লোকই জানেন না যে ডক্টর ইউনূসের কোনো সুদের ব্যবসা নেই। গ্রামীণ ব্যাংক তার প্রতিষ্ঠিত হলেও গ্রামীণ ব্যাংকে তার এক টাকার মালিকানাও নেই, শেয়ারও নেই… কখনো ছিলই না।
সারা পৃথিবীর স্বনামধন্য ১০৭টি ইউনিভার্সিটিতে ইউনূস সেন্টার আছে। ইউনিভার্সিটিগুলো নিজেদের উদ্যোগে এটি করেছে। এর প্রধান কারণ হলো তাঁর মাইক্রো-ফাইন্যান্স, যেটি তাঁকে এবং তাঁর গ্রামীণ ব্যাংককে নোবেল শান্তি পুরস্কার এনে দিয়েছিল।
জিনিসটি আমাদের কাছে আশ্চর্যজনক মনে হতে পারে, কিন্তু এটাই সত্যি! ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের মাইক্রো-ফাইন্যান্সের মূল ভিত্তি হলো এটি… এই ব্যবসায় কেউ মালিক হতে পারবে না। সম্পূর্ণ নন-প্রফিট তথা অলাভজনক। এটিকে বলা হয় সামাজিক ব্যবসা। নির্দিষ্ট কোনো মালিক নেই, জনগণই মালিক।
বাহির থেকে অনুদানের টাকা এনে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস। নিজে এটি প্রতিষ্ঠা করলেও প্রতিষ্ঠানে তাঁর এক পয়সার মালিকানাও রাখেননি। বরং এর ২৫% মালিকানা সরকারের, বাকি মালিকানা গরিব মানুষের।
নিজের প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকে ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস মাত্র ৩০০ ডলার বেতনে চাকরি করতেন।
প্রথমত, তিনি কোম্পানিতে নিজের কোনো শেয়ার রাখেননি। দ্বিতীয়ত, তিনি কোম্পানিটিকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন যাতে কেউ কোম্পানির একক মালিক না হতে পারে। কোম্পানি অধ্যাদেশ ২৮ ধারা অনুযায়ী তিনি এটি রেজিস্ট্রেশন করেন।
শুধু যে গ্রামীণ ব্যাংকে তিনি মালিকানা রাখেননি তা কিন্তু না। জর্জ সোরোস ও টেলিনরদের সহযোগিতায় তিনি গ্রামীণ টেলিকম প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর কথায়, টেলিনর বাংলাদেশে আসে এবং তাঁর বিলিয়নিয়ার বন্ধুরা গরিবদের উন্নতির জন্য ফান্ড দেয়। তিনি গ্রামীণ টেলিকম প্রতিষ্ঠা করেন অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই। অনেকেই জানেন না, গ্রামীণ টেলিকমও নন-প্রফিট কোম্পানি হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানেও তিনি নিজের জন্য ১% মালিকানাও রাখেননি। চাইলে সহজেই তিনি ১০–১৫% মালিকানা নিজের জন্য রাখতে পারতেন।

অথচ, লাভের কোনো টাকা নিজের কাছে না আসা নিশ্চিত করেন তিনি। তার প্রতিষ্ঠিত সরকার নিয়ন্ত্রিত গ্রামীণ ব্যাংকে এখনো সু/দের হার বাংলাদেশে সর্বনিম্ন। স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে, গ্রামীণ ব্যাংকের মত সুদ আর কেউ নেয় না। কিন্তু এই টাকায় প্রফিট করে ড. ইউনূস তা নয়।
সত্যি বলতে, আমাদের দেশের মানুষ এসব কল্পনাও করতে পারে না। একজন মানুষ ব্যবসা করছে, সে সেখান থেকে লাভ করবে না… এটা আমরা ভাবতেও পারি না। আমরা ভাবি শুধু টাকা কামানোর কথা। যেমনভাবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন: “টাকা কামানোতে আছে সুখশান্তি, কিন্তু অন্যের উপকারে আছে প্রশান্তি!” উনার ভাষায়, নিজের জন্য টাকা কামানো হয়তো হ্যাপিনেস, অন্যের উপকার হচ্ছে সুপার হ্যাপিনেস।
মুহাম্মদ ইউনূস মনে করেন, সবাই এককভাবে সম্পত্তির মালিক হতে থাকলে গরিব আরও গরিব হবে, ধনী আরও ধনী হবে। ফলে বিশ্বব্যবস্থা অচল হয়ে পড়বে। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি সব নন-প্রফিট বা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন। নিজের জন্য কোনো মালিকানা রাখেননি।
কিন্তু এরকমটা কি আপনি ভাবতে পারেন?
বাংলাদেশের যেকোনো কোম্পানি দেখুন, মালিকানা সব নিজেদের। কোম্পানির কথা বাদ দিন, এনজিওগুলোও অধিকাংশই পরিবারের বা নিজেদের। বড় বড় পদগুলোতে পরিবারের সদস্যরাই বসে থাকে।
কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূস এমনটা করেননি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিতে নিজেকে বা পরিবারের কাউকেই রাখেননি। চাইলে সহজেই এসব কোম্পানিতে নিজের শেয়ার রেখে তিনি বিলিয়নিয়ার হতে পারতেন।
তাঁর বন্ধু-বান্ধব সবাই বিলিয়নিয়ার, মাল্টি-বিলিয়নিয়ার, কিন্তু তিনি সেদিকে হাঁটেননি। অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে ড. ইউনূসের আয়ের উৎস কোনটা? আমি নিশ্চিত, অনেকেই এ ব্যাপারে জানেনই না।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস হচ্ছেন বিশ্বের অন্যতম ‘হাইএস্ট পেইড স্পিকার!’ স্পিচ দেওয়ার জন্য তাঁকে টাকা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। উনার বক্তব্য শোনার জন্য খরচ হয় ৭৫,০০০ থেকে ১ লাখ ডলারের মতো! কখনও কখনও আরও বেশি। বিশ্বের নামী-দামী প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁকে নিয়ে যায় উনার বক্তব্য শোনার জন্য। উনাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনার জন্য ডাকা হয়।
যেমন, ২০২৪ সালে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত প্যারিস অলিম্পিকের আয়োজক কমিটির তিনজনের একজন হচ্ছেন মুহাম্মদ ইউনূস। সেখানে আরেকজন প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ। ২০২৬ সালের ইতালি অলিম্পিকের জন্য ইতালিয়ানরা তাঁকে পরামর্শদাতা হিসেবে পেতে চাচ্ছে।
আমরা মনে করি, গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণ টেলিকমের মতো উনার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই তিনি আয়ের উৎস পান… এটা ঠিক নয়। এরা প্রকাশ্যে কখনও স্বীকার করেননি যে এগুলোতে তাঁর ০.০১% শেয়ারও নেই।
প্রফেসর ইউনুস একটি বিশ্ববিদ্যালয় করতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশে, কিন্তু অনুমতি দেওয়া হয়নি। ভাবুন, একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় হতো। বিশ্বের সেরা প্রফেসররা সেখানে আসত। তাঁর একবার আহ্বানে বিল গেটস, আমেরিকান প্রেসিডেন্টও সেখানে স্পিচ দিতে আসত। কিন্তু সেটি হতে দেওয়া হয়নি।
সত্যি বলতে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্পর্কে যত জানবেন, তত মনে হবে, দেশ ও জাতি হিসেবে আমরা ড. ইউনূসের মতো মানুষকে ডিজার্ভ করি না।