প্রশ্নবিদ্ধ বিস্ফোরণ: দুর্ঘটনা বনাম নাশকতা!


রিন্টু আনোয়ার
দেশের বিভিন্ন জায়গার গত মাস কয়েকের বিস্ফোরণগুলোকে দ্রুত দুর্ঘটনা বলতে পারলেই যেন স্বস্তি। একটা সময় যেখানে রিক্সার টায়ার ফাটলেও বলা হতো নাশকতা বা নাশকতার চেষ্টা। বলা পর্যন্তই নয়, সমানে চলতো অভিযান, ধরপাকড়। মামলা তো হতোই। এর পর তদন্তের নামে নাস্তানাবুদ করা। সেখানে সম্প্রতি দুর্ঘটনা বলে দেয়া হচ্ছে দ্রুত সময়ের মধ্যে।
ঢাকার সায়েন্সল্যাব এলাকায় প্রিয়াঙ্গন মার্কেটের পাশের তিনতলা বাণিজ্যিক ভবনে বিস্ফোরণে ৩ জন নিহত, আহত প্রায় ৫০। পুলিশ, র‍্যাব, বোম নিষ্ক্রিয়করণ দলসহ কতো আয়োজন। শেষে জানানো হলো স্রেফ দুর্ঘটনা, নাশকতা নয়। কিছু সময়ের ব্যবধানে কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিস্ফোরণ-অগ্নিকাণ্ড। দুই হাজারের মতো ঘর পুড়ে যাওয়াও তেমন ঘটনা নয়, নাশকতা তও নয়ই। ছোটখাট এ ঘটনার আগে গত বছরের ২২ মার্চ উখিয়ার বালুখালীতে আগুনে পুড়ে মারা যায় ১৫ জন রোহিঙ্গা। তখন ১০ হাজারের মতো রোহিঙ্গার ঘর পুড়ে যায়। সেটির তুলনায় এটি ঘটনার মধ্যে পড়ে না। পঞ্চগড়ে কাদিয়ানিদের বাড়িঘর, দোকানপাটে হামলাও ঘটনা নয়? ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ওয়াজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে বক্তার ওপর হামলা ও তার জিহ্বা কেটে নেয়ার চেষ্টাও দুর্ঘটনা, নাশকতা নয়। এর ফাঁকে বাংলাদেশের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলের উপকূলীয় শহর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অক্সিজেন প্ল্যান্টে বিস্ফোরণে ৬-৭ জনের লাশ উদ্ধারও মামুলি হয়ে যাচ্ছে। ঢাকার সিদ্দিকবাজারের ঘটনাকে পাশাপাশি তুলনা করলে সীতাকুণ্ডেরটিও ছোট ঘটনা।
ব্যাপকতা-ভয়াবহতা ও ধরন বিশ্লেষণে ঘটনা, দুর্ঘটনা, নাশকতা ভিন্ন জিনিষ। আবার প্রতিটি নাশকতাই ঘটনা-দুর্ঘটনা। কোনো ঘটনাকে দুর্ঘটনা, দুর্ঘটনাকে নাশকতা বলা কাম্য নয়। এর বিপরীতটাও তাই। বিগত কয়েক বছরে বড় ধরণের বিস্ফোরণের খবর গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। শুরুতে নাশকতা-ষড়যন্ত্রের কথা বলা হলেও পরে প্রথমত দায়ী করা হয়েছে জমে থাকা গ্যাসকে। দ্বিতীয়ত ভবন বা ফ্যাক্টরি মালিককে। এ ধরনের কয়েকটির দুর্ঘটনার তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। যে কটির তদন্ত প্রতিবেদন সামনে এসেছে সেখানে বিস্ফোরণের পেছনে মূলত দায়ী করা হয়েছে ভবন বা প্রতিষ্ঠানের মালিককে। ঘটনার তদন্তে কর্তৃপক্ষের অবহেলা প্রকাশ্যে এলেও তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কোন ব্যবস্থা নেয়ার দৃষ্টান্ত কম।
সম্প্রতি এমন কী ঘটলো যে আজ এখানে, কাল সেখানে গ্যাসের লিকেজ বেড়ে গেছে? চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে একটি বেসরকারি অক্সিজেন প্ল্যান্টে বিস্ফোরণের রেশ কাটতে না কাটতে ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে একটি ভবনে বিস্ফোরণে প্রাণ যায় তিনজনের। এর দুদিন পর পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজারে বহুতল ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। সামান্য সময়ের ব্যবধানে তিনটি বিস্ফোরণের ঘটনা কাকতালীয় না এর পেছনে কিছু আছে? এ নিয়ে সন্দেহের দানা বাঁধছে জনমনে। প্রাথমিকভাবে গ্যাস বিস্ফোরণের কথা বললেও এর পেছনে অন্য কিছু আছে কি না সেটা কতোটা আমলে নেয়া হচ্ছে পরিস্কার নয়।
শীত মৌসুমে অনেকে এসি বন্ধ রাখেন, আবার গরম শুরু হলে চালু করেন। এতে হঠাৎ বিস্ফোরণের একটা শঙ্কা থাকে। তাই বলে এমন সিরিজ বিস্ফোরণ? আবার মিথেন গ্যাস জমে এত বড় বিস্ফোরণ ঘটে চলছে তা মানাও কষ্টকর। ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিনটি বিস্ফোরণের ধরন একই। একই ধরনের বিস্ফোরণ সন্দেহ বাড়াচ্ছে। প্রাথমিক ধারনায় বলে দেয়া হচ্ছে, গ্যাস জমাট বাঁধার কারণে বিস্ফোরণ হয়েছে। সব দোষ গ্যাসের ওপর চাপানো অনেকটা একতরফা হয়ে যাচ্ছে। বিগত কয়েক বছরে এ ধরণের ছোট-বড় বিস্ফোরণের খবর গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছে। প্রায় সবকটি বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে দায়ী করা হয়েছে ‘গ্যাস লিকেজ’ বা ‘জমে থাকা গ্যাস’কে। কোনো ঘটনাই তদন্তের বাইরে থাকছে না। কয়েকটির দুর্ঘটনার তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। যে কটির তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে সেখানে বিস্ফোরণের জন্য প্রধানত দায়ী করা হয়েছে ভবন বা প্রতিষ্ঠানের মালিককে। আর কারো দায় বা দায়িত্ব থাকতে নেই? কর্তৃপক্ষ বা তদন্তের মালিক-মোক্তারদের মতিগতি বলছে, আর কারো যেন দায়বদ্ধতা নেই। এর আগে, ২০২১ সালের জুনে রাজধানীর মগবাজারে বিস্ফোরণের জন্যও দায়ী করা হয়েছিল তিন তলা ভবনের নীচতলায় জমে থাকা গ্যাসকে। অথচ ওই ঘটনায় ভবনের নীচতলায় কোনও গ্যাস সংযোগ পাওয়া যায়নি, গ্যাস সিলিন্ডারও অক্ষত ছিল৷ সেসময় বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, তারা সেখানে মিথেন গ্যাসের গন্ধ পেয়েছেন যা পয়ঃনিষ্কাশন লাইন থেকে লিক হতে পারে। এর আগের বছর ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটি মসজিদে বিস্ফোরণ ৩৪ জনের মৃত্যুর ঘটনার পোস্টমর্টেমও ছিল এমনই। তদন্ত সংস্থা সিআইডি বিস্ফোরণের কারণ উদঘাটন করে জানিয়েছিল, মসজিদের ভেতরে গ্যাস লাইনের লিকেজ দিয়ে বের হয়ে আসা গ্যাসের ওপর বিদ্যুতের স্পার্ক পড়তেই বিস্ফোরণ ঘটেছে৷
প্রতিটি দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন এক ধরনের রুটিন ওয়ার্ক। এ কমিটিকে রিপোর্ট দিতে সময় বেঁধে দেওয়া হয়৷ অনেক সময় তদন্ত প্রতিবেদন দিতে দীর্ঘ সময় চলে যায়। নানা ঘটনার তোড়ে মানুষও ঘটনা ভুলে যায়। এর মাঝে প্রতিবেদনে তদন্তের ফলাফল সামনে এলেও দুর্ঘটনার সকল দায় বর্তায় কোন ব্যক্তি, ভবন মালিক, কারাখানা মালিকের ওপর। তার মানে গ্যাসের লিকেজের জন্য এরাই দায়ী। ভবন করতে যে ফায়ার সার্ভিস, সিটি বা পৌর কর্তৃপক্ষের নকশা পাস করানো হয় তা আলোচনার বাইরেই থেকে যায়। কোনো ভবনের নকশা অগ্নি নিরাপত্তা মেনে করা হয়েছে কিনা, আগুন নেভানোর মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আছে কিনা, সেইসাথে কেমিকেল মজুদ বা কারখানার লাইসেন্স দেয়ার সময় পর্যাপ্ত নজরদারি ছিল কি না, তাও উহ্য থেকে যায়।
কোন ভবনে অবৈধ বিদ্যুৎ আর গ্যাসের সংযোগ কিভাবে এলো, এই অক্সিজেন কারাখানা নিয়ম মেনে পরিচালিত হচ্ছিল কিনা, কন্টেইনার ডিপোতে কিভাবে এতো ক্যামিকেলের মজুদ হল-এসব প্রশ্নও সামনে আসে না। এসব বিষয় তদারকির কি কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ নেই? কর্তৃপক্ষের তো অভাব নেই। নইলে ভবন বা কারখানা করতে গেলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বিস্ফোরণ পরিদপ্তর, পরিবেশ অধিদফতরসহ নানান জায়গায় ধর্না দিতে হয় কেন? কোনো কোনোটিতে ব্যাংক এবং ইনস্যুরেন্স কোম্পানিও দায়বদ্ধ থাকছে। কিন্তু, অঘটন ঘটলে ভবন বা প্রকল্পের মালিক ছাড়া আর কারো নাম আসে না। যাদের গাফেলতি থাকতে পারে তাদেরই তদন্ত কমিটিতে রাখা আরেক পরিহাস। আবার গাফেলতির অভিযোগে যে কোনো মালিককে গুরুতর শাস্তির আওতায় আনার নজিরও কম।
আলোচিত ও বড় ঘটনা ছাড়াও প্রতিনিয়ত ছোটখাটো অসংখ্য বিস্ফোরণ ঘটছে। হতাহতের সংখ্যাও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। চোখসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ভুক্তভোগীরা। বিস্ফোরক আইন ও নীতিমালার তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন দাহ্যপদার্থ রাখা ছাড়াও এসব দুর্ঘটনার বড় একটি অংশ পুরাতন গ্যাসলাইন লিকেজ ও এসি থেকে হচ্ছে। মেকানিকদের অদক্ষতায় অনেক সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। তারা বলছেন, গ্যাসের লিকেজ ও এসি-ফ্রিজের ছোটখাটো ত্রুটি সারাতে অনেকেই মেকানিক ডেকে আনেন। মেকানিকদের সঠিক কারগরি জ্ঞান না থাকার কারণে বেশিরভাগ সময়ই মেরামতের পরও ত্রুটি থেকে যায়, যে কারণে এসব জায়গায় বারবার বিস্ফোরণ ঘটে। তাছাড়া গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন নিয়মিত পরীক্ষা না করার করাণেও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিল্ডিং কোডে এ সম্পর্কে গাইডলাইন দেওয়া আছে। চাইলে বিস্ফোরক পরিদপ্তরও গাইডলাইন দিতে পারে। তাই বারবার অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণের মতো ঘটনাগুলোকে শুধুই দুর্ঘটনা বলা যায় না। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, ঢাকার সায়েন্স ল্যাব , সিদ্দিকবাজারসহ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কোনো কিছুর ইঙ্গিত কি না, অবশ্যই ভেবে দেখার বিষয়। সন্দেহ করার যথেষ্ঠ কারণ রয়েছে।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি শহরের কিছু এলাকা বিস্ফোরণোন্মুখ’। পুরান ঢাকার অবস্থা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে পুরোনো ইউটিলিটি সার্ভিস, তার সঙ্গে মিশ্র ধরনের এমন সব পণ্যের গুদাম আছে। দাহ্য, বিপজ্জনক পদার্থ সেখানে গুদামজাত করা হয়। রাস্তাঘাটও সরু। ঢাকা শহর গড়ে তোলাই হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। এখানে ভূগর্ভস্থ পয়োবর্জ্য লাইন, বিদ্যুৎ লাইন, গ্যাসের লাইন- কোনটা কোনদিক দিয়ে গেছে তা অনেকের জানা নেই। যে কোনো সময় যে কোনো জায়গায় দূর্ঘটনার ব্যবস্থা হয়েই আছে। আল্লাহ্ মাপ করুন, এ মুহূর্তে বড় কোন ভূমিকম্প আঘাত হানলে মালুম করা যাবে। তাই বলে আমাদেরকে কি সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে?

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintu108@gmail.com