
অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
জমি কেনাবেচার অর্থ থেকে ৪৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির নির্বাহী কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান ও আমানত শাহ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মো. হেলাল মিয়াসহ ১৪ পরিচালকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা দায়ের করেছে । গত ৩১ জুলাই দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১ এ সংস্থার উপপরিচালক সৈয়দ আতাউল কবির মামলাটি দায়ের করেন। দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম মামলাটির বিষয় নিশ্চিত করেন। ওই ১৪ পরিচালকসহ মামলাটিতে মোট ২৪ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম, সাবেক পরিচালক এম এ খালেক, শাহরিয়ার খালেদ, নাজনীন হোসেন, খন্দকার মোস্তাক মাহমুদ, ডা. মো. মনোয়ার হোসেন, কে এম খালেদ, অধ্যাপক ইফফাৎ জাহান, মো. মিজানুর রহমান, মোজাম্মেল হোসেন, রাবেয়া বেগম, মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন, কাজী ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, মো. হেমায়েত উল্লাহ, সৈয়দ আব্দুল আজিজ, ইঞ্জিনিয়ার আমির হোসেন, তাসলিমা ইসলাম, সাবিহা খালেক, সারওয়াত খালেদ সিমিন, মো. আজহার খান, মো. সোহেল খান, গোলাম কিবরিয়া ও এস এম মোর্শেদ।
মামলার অভিযোগ করা হয়, আসামিরা পরস্পরের যোগসাজশে রাজধানীর তোপখানা রোডের ৩৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ জমি ও একটি ভবন ২০৭ কোটি ৩৬ লাখ ৬০ হাজার টাকায় কেনাবেচা করেন। তবে এ লেনদেনের আড়ালে ৪৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করা হয়।

মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০১৩ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ১৭৫তম পর্ষদ সভায়, ৩৬ তোপখানা রোডের ৩৩.৫৬ শতাংশ জমি ও একটি ভবন ২২৯ কোটি ১৩ লাখ ৯৫ হাজার টাকায় কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন কোম্পানির ১৪ জন পরিচালক ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা।
দুদক জানায়, জমি ও ভবনের মূল্য কৌশলে অনেক বেশি ধরা হয়, যা আত্মসাতের উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে।
এর আগে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের তিন মামলার মধ্যে ৭০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আসামি করা হয় ৯ জনকে। যাদের মধ্যে পরিচালক ছিলেন ৭ জন। তারা হলেন, নজরুল ইসলাম, কে এম খালেদ, শাহরিয়ার খালেদ, এম এ খালেক, মিজানুর রহমান, ফরিদউদ্দিন এফসিএ ও আসাদ খান।
সুত্র জানায় ১১৫ কোটি আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে দুদকের মামলায় আসামি করা হয় আেরা ৮ জনকে।এরা হলেন, কোম্পানিটির সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী তাসলিমা ইসলাম, তাসলিমা ইসলামের ভাই সেলিম মাহমুদ, কোম্পানির সাবেক মুখ্য কর্মকর্তা হেমায়েত উল্যাহ, সাবেক ইভিপি ও প্রজেক্ট ইনচার্জ ইঞ্জিনিয়ার আমির ইব্রাহিম, টিপু সুলতান, ফুয়াদ আশফাকুর রহমান এবং মোহাম্মদ আলম খান।

জমি কেনার নিয়ে বোর্ডসভায় যেসব সিদ্ধান্ত
নির্বরযোগ্য সূত্রের খবর, ২০১৩ সালের ৩ মার্চ ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ১৭৫তম পর্ষদ সভায় জমি কেনার সিদ্ধান্ত হয়। এই সভা হয় ফারইস্ট ইসলামী লাইফের প্রধান কার্যালয়ে। সভায় উপস্থিত কোম্পানির ১৪ জন পরিচালক ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এই জমি ক্রয়ের অনুমোদন করেন। সভায় ৩৬, তোপখানা রোডের ৩৩.৫৬ শতাংশ জমি ও ভবনের মূল্য, রেজিস্ট্রেশন খরচ ও অন্যান্য খরচসহ মোট ব্যয় ধরা হয় ২২৯ কোটি ১৩ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে জমির মূল্য নির্ধারণ করা হয় ২০০ কোটি ৩৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা ও বিল্ডিংয়ের মূল্য ধরা হয় ৭ কোটি টাকা।
এছাড়াও ট্যাক্স, ফি, রেজিস্ট্রেশন খরচ বাবদ আরও ২০ কোটি ৭৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকা এবং রেজিস্ট্রেশন ও বিবিধ খরচ বাবদ- ১ কোটি ৩ লাখ ৬৯ হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় ওই সভায়। এর মধ্যে বায়না বাবদ ৭৫ কোটি টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়। বাকি ১৩২ কোটি ৩৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা ৪ মাসের মধ্যে পরিশোধ করে দলিল রেজিস্ট্রির সিদ্ধান্ত হয়। পরে ২০১৪ সালের ১৬ মার্চ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেমায়েত উল্লাহ দলিল গ্রহীতা হিসেবে এবং জমির মালিক আজহার খান ও সোহেল খান দলিল দাতা হিসেবে ঢাকা জেলার সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি রেজিস্ট্রি হয়। দলিল নং-১৮৮১।
জমির মূল্য পরিশোধ করার পদ্ধতি
ফারইস্ট ইসলামী লাইফের কাছে জমি বিক্রি করেন আজাহার খান এবং সোহেল খান। তবে জমির মূল্য বাবদ ১৮১ কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয় আজাহার খানের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মিথিলা টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিজের নামে পরিচালিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। যার মধ্যে জমি ক্রয়ের অগ্রিম বাবদ ৪ মার্চ ২০১৪ সালে পরিশোধ করা হয় ৭৫ কোটি টাকা। জমি রেজিস্ট্রির দিন (১৬ মার্চ ২০১৪) পরিশোধ করা হয় ১০৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে মিথিলা টেক্সটাইলের ইউনিয়ন ব্যাংক গুলশান শাখায় জমা হয় ১৬৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর এনসিসি ব্যাংক উত্তরা শাখার অ্যাকাউন্টে জমা হয় ১৩ কোটি টাকা।
এছাড়াও ফারইস্ট ইসলামী লাইফের নামে পরিচালিত দুটি ব্যাংক থেকে চেক দিয়ে নগদ তোলা হয় মোট ২১ কোটি ৬১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক কারওয়ানবাজার শাখা থেকে তোলা হয় ৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক কারওয়ানবাজার থেকে তোলা হয় ১১ কোটি ৮৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এছাড়া সোনালী ব্যাংক বরাবর একটি পে-অর্ডার দিয়ে ২০ কোটি টাকা তোলা হয় ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে। এই টাকা তোলা হয় জমি রেজিস্ট্রি, স্ট্যাম্প ও অন্যান্য খরচ বাবদ।












