
খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
বীমা আইনে বেশ কিছু খসড়া সংস্কার, সংযোজন বিয়োজন, সিইও নিয়োগে কৃত্রিম সংকট নিরসনের প্রয়োজনে ব্যাংক কর্মকর্তা নিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে ড. এম আসলাম আলম।
২রা জুলাই ২০২৫ বুধবার বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান ছাড়াও সংস্থাটির সদস্য (প্রশাসন) মো. ফজলুল হক, সদস্য (আইন) তানজিনা ইসমাইল, সদস্য (নন-লাইফ) মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক, সদস্য (লাইফ) মো. আপেল মাহমুদ, নির্বাহী পরিচালক ও পরিচালক মোহাঃ আব্দুল মজিদসহ অনেকে।
আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান ড. এম আসলাম আলম সংবাদ সম্মেলনে তার সূচনা বক্তব্যে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পরিবর্তীত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারের অন্যান্য সংস্থার মতো আইডিআরএ’ও কিছু সংস্কার কর্মসূচী গ্রহন পুর্বক বীমা খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা জবাবদিহিতা এবং গ্রাহক স্বার্থ নিশ্চিত করতে আমরা প্রচলিত বীমা আইনের কিছু ধারা সংশোধনসহ ব্যাংক খাতের আলোকে বীমা রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছি।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান ড. এম আসলাম আলম বীমা আইনে বেশ কিছু খসড়া সংস্কারের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেছেন, বর্তমান আইনের সীমাবদ্ধতায় অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছি আমরা। তবে আইন ও প্রবিধানের সংশোধনী প্রস্তাব গৃহীত হলে সংস্থা আইন প্রয়োগে অনেকটাই শক্তিশালী হবে। তিনি বলেন, উচ্চ আদালতে সংস্থার ১২৪ টি মামলা বিচারাধীন, ক্রমেই আরো মামলা জট বাড়ছে।
বর্তমানে বীমা কোম্পানির সিইও পদে যোগ্য লোকের সংকট রয়েছে। মালিকরা দাবি করেন, উপযুক্ত প্রার্থী পাচ্ছি না। অথচ বীমা কোম্পানিগুলো নিয়ম মেনে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ না দেয়ায় কোম্পানিগুলোতে যোগ্য সিইও তৈরিতে বড় বাঁধা বলেও মন্তব্য করেন ড. এম আসলাম আলম। তিনি আরও জানান, ১৯টি বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকলেও আইনগত শিথিলতার কারণে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না।
ড. এম আসলাম আলম বলেন, যেখানে একজন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাকে (সিইও) নিয়োগ পেতে হলে দুই বছর অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে চাকরি করার শর্ত রয়েছে, এই জায়গায় কোম্পানিগুলো একটা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাখছে যার ফলে অনেকে যোগ্য সিইও তৈরি হয়ে আসতে পারছে না। অথচ অন্য পেশা থেকে এনে বীমা খাতের গুরুত্বপূর্ণ পদটিতে চাকরি করছে এমন কয়েকটি কোম্পানি বেশ ভালো করতে দেখতেছি। তাই আমরা ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের বীমা কোম্পানির সিইও হিসেবে নিয়োগ দেয়ার প্রস্তাব দিয়ে স্টেকহোল্ডারদের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করার পরিকল্পনায় অতীতে বিভিন্ন সময় মতামত প্রদানকারী সিইওসহ বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন(বিআইএ)এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম (বিআইএফ) এর নিকট পাঠানো হয়েছে।

আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমান আইন ও বিধিমালার সীমাবদ্ধতার কারণে সংস্থার কাজ কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে বীমা কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন নবায়ন ফি হাজারে ১ টাকা। এই অর্থ দিয়ে পূর্ণব্যয় নির্বাহ হয় না বিধায় নিবন্ধন নবায়ন ফি ১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
ড. আসলাম আলম বলেন, ১৯টি বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার পদ দীর্ঘদিন শূন্য রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে জরিমানা করাসহ নানা ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হলেও এ সমস্যার নিরসন হচ্ছে না। এ সব কোম্পানিতে প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার সুয়োগ ছিল। দু’একটি কোম্পানিতে আমরা প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছি। কিন্তু কোম্পানির পরিচালনা বোর্ড প্রশাসককে সহযোগিতা করে না। আমরা বোর্ডের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারি না। আইনে আমাদেরকে সে ক্ষমতা দেয়া হয় নাই। তবে প্রস্তাবিত বীমা রেজল্যুশন ২০২৫-এ নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে বোর্ডেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনার প্রস্তাব করেছি। এটি হলে প্রয়োজনে বোর্ড ভেঙ্গে দিয়ে পূনর্গঠন করা যাবে। বর্তমান অবস্থায় বীমা কোম্পানির সিইও পদে কোন ভাবেই যোগ্য লোক পাওয়া যাচ্ছে না বলে মালিকরা অভিযোগ করেন। এসব কোম্পানিতে মুখ্য নির্বাহী নিয়োগ দিতে আমরা একটি পোল গঠন করে দরখাস্ত আহবান করেও তেমন সাড়া পাই নি, যার কারনে প্রবিধানমালায় অভিজ্ঞতা শর্ত শিতিল করার প্রস্তাব করে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দুই বছরের অভিজ্ঞতার স্থলে এক বছর এবং তারও নিম্নপদে দুই বছরের স্থলে তিন বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আমরা এই সংকট নিরসনে ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে বীমা কোম্পানিতে সিইও পদে নিযোগ দেয়ার প্রস্তাব করেছি।
বিদ্যমান বীমা আইনে কোম্পানির পরিচালনা বোর্ডের ব্যাপারে আমাদের কোনো ক্ষমতা দেয়া হয়নি।” তবে প্রস্তাবিত বীমা রেজল্যুশন অধ্যাদেশে বোর্ডের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে এবং প্রয়োজনে বোর্ড ভেঙে পুনর্গঠন করা যাবে।

আইডিআরএ’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কোম্পানিগুলির ঝুঁকির ব্যাপারে ড. আসলাম আলম বলেন, বীমা খাতের ৩২টি প্রতিষ্ঠান উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি জীবন বীমা (লাইফ) এবং ১৭টি সাধারণ (নন-লাইফ) বীমা কোম্পানি। ৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানির মধ্যে ৬টি কোম্পানি ভালো অবস্থানে, ১৫টি প্রতিষ্ঠান উচ্চ ঝুঁকিতে এবং ১৫টি রয়েছে মধ্যম ঝুঁকিতে অন্যদিকে, দেশের ৪৬টি সাধারণ বীমা কোম্পানির মধ্যে ১৭টি উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
বীমা দাবির দ্রুত নিষ্পত্তি এবং খাতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন আইন ও বিধিমালা সংস্কারের কাজ চলছে। ব্যাংক রেজুলেশনের আদলে বীমা কোম্পানির রেজল্যুশন প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে, যা একীভূতকরণ, অবসায়ন ও অধিগ্রহণের মতো পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ দেবে। বর্তমানে জীবন বীমায় ৪৫ শতাংশ ও সাধারণ বীমায় ৪৭ শতাংশ দাবি অপরিশোধিত রয়েছে, যা গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা সংকট তৈরি করেছে।
ড. এম আসলাম আলম স্বীকার করে বলেন, “২০২৪ সালে আমাদের কাছে ২৪,৮৫২টি অভিযোগ এসেছে, কিন্তু জনবল সংকটের কারণে এসব অভিযোগের যথাযথ তদারকি করা সম্ভব হয়নি।” আইডিআরএতে ১৬০ জন অনুমোদিত জনবল থাকলেও মাত্র ১০৭ জন কর্মরত আছেন। আমাদের জনবল বৃদ্ধির জন্য প্রচেষ্টা চলছে।
লাইফ বীমা কোম্পানিগুলির ক্রমান্ময়ে বাড়া দাবি নিষ্পত্তির ও এলআইসি এবং মেটলাইফের পরিচালনায় দ্বৈত নীতির ব্যাপারে অর্থনীতির ৩০ দিনের এক প্রশ্নের জবাবে সদস্য (লাইফ) মো. আপেল মাহমুদ বলেন, বিদেশি কোম্পানিগুলির পরিচালনব্যয়-পরিচালননীতি আমাদের আইন অনুযায়ী করার প্রস্তাবনা করা হয়েছে এবং ড. আসলাম আলম বলেন, বীমা দাবির অর্থ দ্রুত পরিশোধ ও খাতে স্বচ্ছতা ফেরাতে বিভিন্ন আইন ও বিধিমালার সংস্কার প্রক্রিয়া চলছে।
সর্বশেষ তিনি বলেন, “আইডিআরএ একটি স্বচ্ছ এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কাজ করতে চায়, তবে এ জন্য আইন প্রয়োগের সহায়ক পরিবেশ এবং শক্তিশালী অবকাঠামো প্রয়োজন।”












