

খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
পুরুষ কিন্তু…!!!
হাঁ ঠিকই, পুরুষ যা এক অসহায়ত্তের প্রতীক, আহা, পুরুষের মতো সহজ সরল সমীকরণ হয়তো এই পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। অথচ নারী, মানে আপনারা, তথাকথিত আধুনিক নারীরা, এত সহজ একটা সাধারণ অঙ্ক মেলাতে পারছেন না! আর এতেকরে নিজের জীবনের হিসাব জটিল করে তুলছেন, সেই সাথে সংসার নামক সাজানো বাগানটাকে বানিয়ে ফেলছেন কুরুক্ষেত্র।
পুরুষ মানুষ সৃষ্টিজগতের এক অনন্য সহজ-সরল মানসিকতার অধিকারী। সৃষ্টিকর্তা পুরুষ মানুষকে এক অপরূপ সৈৗন্দর্যের ডিজাইনে তৈরি করেছেন। কাদামাটি যেমন সহজলভ্য, যে কোন ডিজাইন বা আকৃতি পরিবর্তন খুব সহজেই করা যায়, ঠিক তেমনি পুরুষের সুখ খুবই সস্তা এবং সহজলভ্য। তার পেট ভরা খাবার আর শরীর ভরা আকাক্সক্ষা ও তৃপ্তির স্পৃহা ব্যাস, এতেই যথেষ্ট যে সে দিনরাত পরিশ্রম করে অসাধ্যকেও সাধন করতে পারে, আর বেশি কিচ্ছুর দরকার লাগে না।
কিন্তু নারী…, নারীর মন নাকি স্বয়ং বিধাতাও বুঝতে পারেন না। হাজার বছর ধরে কবি, লেখক, সাহিত্যিক আর দার্শনিকরা হন্তধন্ত হয়ে নারীর মন জয় করার সূত্র খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত ও নির্বাক। একজন পুরুষকে খুশি করা যতটা সহজ, একজন নারীকে খুশি করা ঠিক কতটা কঠিন? তাকে তাজমহল এনে দিলেও সে বলবে ফিনিশিংটা সুন্দর করতে পারলে না কেনো? “চাঁদটা আনলে তো খারাপ হতো না” আবার তাকে আকাশের চাঁদ এনে দিলেও সে বলতো , “নক্ষত্রগুলো এত দূরে রেখে এলে কেনো?” আসলে নারীর চাহিদার অবসান কোথায়, তা সে নিজেও বুঝে কি না, জানা নেই। তার মান-অভিমানের কোনো কূল-কিনারা নেই। তাকে সন্তুষ্ট করা এমনই এক অসাধ্য প্রজেক্ট, যা হিমালয় শৃঙ্গ সাতবার জয় করা বা চাঁদে আরোহন করাও সাধারণ ব্যাপার।
একজন পুরুষ নিজেকে এবং পরিবারকে ষ্টেবিল রাখার জন্য সকাল থেকে সদ্ধ্যা পর্যন্ত বাইরের দুনিয়ার সাথে সংগ্রাম করে নিজের প্রতি খেয়াল রাখার হিসেবটুকুও বেমালুম ভুলে যায়, তাদের একদিকে অফিস, অপরদিকে পাবিারিক চাহিদা ঠিক রেখে যেন রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে সকলকিছুর সাথে পাল্লা দিয়ে চলতে গিয়ে মাথায় হাজারো দুশ্চিন্তার পাহাড় চাপা পড়ে থাকে, দিনশেষে সমস্ত ক্লান্তি, টেনশন ধুয়েমুছে ফেলার জন্য নির্দিষ্ট সময়ে আপনার ওই একান্ত সান্নিধ্যের কোমল উষ্ণতাই যথেষ্ট। আর আপনি যদি সেই নির্দিষ্ট সময়ের উষ্ণ সান্নিধ্যকে হাতিয়ার বানিয়ে তৃপ্তির সময়কে দুর্ভেদ্য অস্ত্র হিসেবে জীবনকে নরক বানিয়ে ফেলন, তার দায় আপনার উপরই ফিরে আসবে, এটাই সত্য।
একজন পুরুষের শরীর বেশিরভাগ সময় ক্লান্তি আর অবসাদে পূর্ণ থাকে যেনো এক অগ্নি উদগিরণকারী জীবন্ত আগ্নেয়গিরিও তার কাছে হার মানবে। যদি কোন নারী পুরুষের এটুকু চাওয়া পাওয়াকে মনে করেন “পুরুষরা সব সময় শুধু শরীর খোঁজে, ওরা সব অমানুষ” এই ভাবনাটাই সবচেয়ে বড় ভুল। পুরুষের শরীর আর মন একে অপরের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। একজন পুরুষের ‘ব্রেন’ ‘শরীর’ শান্ত রাখার মূল ছাবিকাঠি বা শান্ত করার ক্ষমতা একমাত্র আপনার ভিতরেই লুকিয়ে আছে, যা চাইলেই আপনি ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেন। দায়িত্ববোধ নিয়ে নিজেকে একবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চিন্তা করে দেখুন, একজন পুরুষ আপনার কাছে কখনো দেওয়ার অযোগ্য কোন কিছু দাবি করে? দিন শেষে একজন পুরুষ একজন নারীর নিকট শুধু মাত্র চায় ১০/২০ মিনিটের উষ্ণতা আর একটু প্রশান্তি, যা পরক্ষণেই তৈরি করে তাকে জীবন যুদ্ধের সংগ্রামী সৈনিক হিসাবে।
যৌনমিলন বা সহবাস পুরুষের কাছে কেবল মাত্র প্রজনন বা ক্ষণিকের উপভোগের ব্যাপার শুধু তা নয়, এটা মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য কাজও বটে। এটা একজন পুরুষের কাছে এক ধরনের সারাদিনের হাজারো কাজের চাপ, ব্যবসার লাভ-লস, এবং বিভিন্ন টেকনিক্যাল জামেলা, পারিবারিক চাহিদার যোগান সব কিছু মাথায় নিয়ে সে যখন ঘরে ফেরে, তখন তার মস্তিষ্ক থাকে প্যাঁচানো সুতোর মতো। সেই সুতোকে আপনি আর না প্যাঁচিয়ে নাটাইতে পুরে নিতে পারেন, অর্থ্যাৎ যদি আপনি তাকে প্রশান্তির এক মহা সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে পারেন, তবেই এভারেষ্ট বিজয়ীর মত আপনি জীবনের সফল এবং শ্রেষ্ঠ কারিগর।
মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটের এক উত্তাল মিলন, যেখানে সে নিজেকে উজাড় করে দেবে, যেখানে সে তার পৌরুষের চরম শিখরে পৌঁছাবে ব্যাস! এইটুকু পেলেই তার মস্তিষ্কের সব চাপ ভ্যানিশ হয়ে যায়। তার মনে নেমে আসে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। যে পুরুষটি একটু আগে রাগে ফনা তুলে ফুঁসে উঠেছিল, তপ্তপোষে আপনার হাতের সুরসুরির স্পর্শে তৃপ্ত হওয়ার পর সেই পুরুষটিই হয়ে যায় এক মিনমিনে শান্ত শিশু।

জগতে দুই ধরণের নারী আছে। একদল যারা সারা জীবন স্বামীর সাথে অধিকারের লড়াই করে, তারা শৈল্পিক জীবন, রোমান্টিক জীবন, পারিবারিক জীবন এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা না করে শুধু তর্কবিতর্র্ক করে, আর সময় শেষে চোখের জলে ভাসে। আর আরেক দল আছে খুব প্রত্যুৎপন্নমতি। তারা জানে, স্বামীর নায়ে চড়ে বিশ্বজগত পাড়ি দেয়ার রাস্তাটা খুবই স্বপ্নীল এবং কুসুমাস্তীর্ণ।
একজন স্মার্ট নারী তার স্বামীর শারীরিক সত্যের ব্যাপারে সবসময় সজাগ থাকে। সে জানে, স্বামীর মুড অফ থাকলে তাকে লেকচার দিয়ে লাভ নেই, লাভ আছে তাকে উষ্ণতার তৃপ্তিতে টেনে নেওয়ায়। সে জানে, তর্কের টেবিলে যেটা আদায় করা যায় না, তপ্ত ললাটে আদরের ছলে সেটা আদায় করা যায় নিমিষেই।
কবি নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন,“সৃষ্টির যা কিছু সুন্দর চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছেন নারী অর্ধেক তার নর, কোন কালে একা হয়নি কো জয়ী পুরুষের তরবারি, শক্তি দিয়েছে প্রেরণা দিয়েছে, বিজয় লক্ষ্মী নারী।” যেখানে নারী-পুরুষ সমতার ক্ষেত্রেও একজন পুরুষ তার প্রিয়তমা নারীর উষ্ণতার মাঝে যে অনুপ্রেরণা খুঁজে পায়, যা তাকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আপনি যদি ভাবেন, “আমি কি শরীরসর্বস্ব? আমার কি কোনো মূল্য নেই?” তাহলে আপনি ভুল ভাবছেন। আপনি শরীরসর্বস্ব নন, আপনি হলেন শক্তি ও প্রেরণার উৎস। আপনার শরীরের সেই ক্ষমতা আছে যা দিয়ে আপনি একটা বন্য হাতিকে অথবা একটা বন্য সিংহকে পোষ মানিয়ে নিতে পারেন। আপনি তো আপনার ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন না, বরং প্রকৃত ব্যবহারই করছেন। একথা সত্য যে, আপনি আপনার সখের পুরুষকে একান্তে একটু উষ্ণতার তৃপ্তি দিবেন, আপনার সখের পুরুষটি আপনাকে একটা স্বপ্নের রঙ্গিন পৃথিবী উপহার দিয়ে সাজাবে।
যখন কোন পুরুষ দেখে স্ত্রী তার সুখের জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দিচ্ছে, তখন সেই পুরুষের মনে এক গভীর কৃতজ্ঞতা তৈরি হয়। সে তখন ভাবে, “এই নারী আমাকে যে সুখ দিচ্ছে, তার বিনিময়ে আমি তার জন্য আমার পৃথিবীটাও উল্টে দিতে পারি।” আরো দেখবেন, আপনি অন্যের কাছে কুৎসিত হলেও বাইরের হাজারটা সুন্দরী নারীর চেয়েও ঘরের স্ত্রী হিসেবে অনেক বেশি আবেদনময়ী করে সাজাবে আপনাকে। আপনি সুখ দিন, সে আপনাকে দুনিয়া দেবে, আসলে সংসার জীবনটাই ভারসাম্যের ব্যবধান নয়, আদান-প্রদান। আপনি যদি ভাবেন, “সে আপনার সব চাহিদা পূরণ করবে, তারপর আপনি তাকে উষ্ণতার ছোঁয়ায় কাছে টানবেন” তাইলে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন, সঠিক পথ পরিহার করে আপনি ভুল পথেই হাঁটছেন, যার সমাধান সম্পূর্ণ উল্টোই নয় বরং কন্টকাকির্ণও বটে।
এতকিছুর পরও স্বামী নামক পুরুষ মানুষটি কোন কিছুই বুঝতে চায় না বা বুঝে না। একজন পুরুষ মানুষ যে কখন বুঝে আর কখন বুঝে না, এটা সে নিজেও বুঝে না। যেমন ছোট বয়সে মা বলে, সরে যা, তুই কিছু বুজস না, আর বড় হলে নিজের সখের নারী বা স্ত্রী বলে, তুমি একেবারে কিচ্ছু বুঝ না, এবার বৃদ্ধ বেলায় ছেলেমেয়েরা বলবে, বাবা তুমি কিচ্ছু বুঝ না। আসলে পুরুষ মানুষের বুঝার বয়স কোনটা, এটা সে নিজেও বুঝে না। জীবনের সব বিলিয়ে দেওয়া সেই না বুঝা ছেলেটাকে মা একদিন নিজহাতে দুধভাত খাইয়ে কপালে চুমু দিয়ে বর সাজিয়ে বিয়ে করতে পাঠায়। বিয়ে করে নিয়ে আসা লোকটাই আপনাকে যদি কখনো শাড়ি কিনে দিতে কার্পণ্য করত, সে-ই আপনাকে দামী গিফট এনে দেবে। যে স্বামী নামক না বুঝা লোকটা আপনার কোনো কথা শুনত না, সে-ই আপনার হুকুমে চলবে। কেন জানেন? কারণ, একজন তৃপ্ত পুরুষ সব সময় তার সখের নারীর প্রতি দুর্বল থাকে। সে চায় তার সেই সুখের শক্তিটাকে ভালোভাবে রাখতে। সে জানে, আপনি ভালো থাকলেই সে আবার সেই সুখ অর্জন করবে। আবার বৃদ্ধ বয়সে সে লোকটাই ছেলেমেয়ের বুঝের কাছে নিজেকে তৃপ্ত রাখে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আপনিই সেই নারী, যে একজন স্বামি নামক সপ্ত আশ্চর্যের একটা আশ্চর্যকে সারাজীবন একান্তে নিজের করে পাবার জন্যে অন্তরঙ্গ সময়ের ১০/২০ মিনিট সময়কে কীভাবে ব্যবহার করছেন? নিজের অহংবোধকে ভাড়াটিয়া নারীর মত এখানে ‘দায়সারা’ কাজ করছেন না কি স্বামীর চাওয়া পাওয়া থেকে ‘দায়সারা’ করে আপনি মুখটা গোমড়া করে নিজেকেই দায়মুক্ত রাখলেন।” এট জীবনের অপূর্ণতা আর অপমান ছাড়া কিছু নয়। এ ক্ষেত্রে আপনাকেও বুঝতে হবে দুনিয়াতে পুরুষ মানুষগুলো এত বোকা নয়। তারা বোঝে কখন আপনি আপনার সখের মানুষটাকে মন থেকে চাইছেন, আর কখন করুণা করছেন। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, “প্রীতি প্রেমের পূর্ণ বাঁধনে যবে মিলে পরস্পরে, স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখনি আমাদেরই কুঁড়েঘরে।”
আলোচনার শুরুতে বলেছিলাম, নারীকে খুশি করা কঠিন। আসলেই নারীকে খুশি করা কঠিন। কারণ নারীর সুখ নির্ভর করে অনেকগুলো প্রাসঙ্গিক এবং অপ্রাসঙ্গিক কারনের ওপর, ধরা যায় আবেগ, নিরাপত্তা, ভালোবাসা, সম্মান, সময়, উপহার ইত্যাদি, কিন্তু পুরুষের সুখ খুবই সস্তা এবং সহজলভ্য। তার পেট ভরা খাবার আর শরীর ভরা আকাক্সক্ষার তৃপ্তির নির্ভরতা ব্যাস, আর কিচ্ছু লাগে না। বিধাতা পুরুষকে এভাবেই ডিজাইন করেছেন। আপনারা নারীরা যদি ভাবেন, “পুরুষ মনের ভাষা বোঝে না?” আপনি তার শরীরের ভাষা বুঝুন, সে আপনার মনের ভাষা বুঝে নেবে।
আপনাকে অপ্রিয় সত্যটাকে বুঝতে হবে, ঘরে পোলাও-মাংসের স্বাদ ভালো না হলেই মানুষ হোটেলের ডাল-ভাত বা ভিন্যরকম খাবার খাওয়ার জন্যই লাইন দেয়, এটা মূলত আপনার অবহেলা এবং নিষ্ক্রিয়তার কারণেই সেই মানুষটি বাইরের দিকে ঝুঁকবেই। তার ওপর বাইরের জগতটা খুব স্বপ্ন রঙিন। ভারসাম্য রক্ষার সাথে সাথে দাম্পত্য সুখ রক্ষার জন্য হলেও নিজেকে প্রশ্ন করুন আপনি কি কেবল একজন ‘গৃহকর্মী’ হয়েই থাকবেন, নাকি তার জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠবেন, যা দিয়ে সখের মানুটিকে অর্থ্যাৎ স্বামীকে আপনার মত করে চোখের পলকে সাজিয়ে নিতে পারবেন।
মনে রাখবেন, একজন পুরুষের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামী সম্পদ হলো তার সখের নারী, যে তাকে রাজার মতো সম্মান আর সুখ দিতে পারে। বুঝতে হবে সিদ্ধান্ত আপনার। ভারসাম্যের একটু ব্যবধানের কারনে আপনাকে হারাতে হবে সবকিছু, আবার ভারসাম্যের রক্ষার কারনে পুরো সংসারটাই আপনার হাতের মুঠোয়।
লেখক : প্রতিবাদী কবি, সব্যসাচী লেখক. কথাসাহিত্যিক,
সম্পাদক প্রকাশক,’অর্থনীতির ৩০ দিন।’











