মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে মুদ্রানীতি ঘোষণা আজ

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রবৃদ্ধিসহায়ক মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো ও অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণের লাগাম টেনে ধরার কৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে এ মুহূর্তে মূল্যস্ফীতিকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে ধরা হচ্ছে। আজ সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকে এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন গভর্নর ফজলে কবির।
মুদ্রানীতি প্রণয়নের সাথে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মুদ্রানীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে সরকারের নির্বাচন সামনে রেখে এক দিকে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো অন্য দিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ কারণে সতর্কতার সাথে আজ মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে।
গত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৬ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু নভেম্বরে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯ শতাংশের ওপরে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় মূলস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সাড়ে ১৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৬ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল। তখন সঞ্চয়পত্রের ঋণের উচ্চ সুদ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়াকে প্রধান দু’টি চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু বছরের শেষ প্রান্তে এসে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকে। কিন্তু সেই হারে আমানতের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। ফলে ব্যাংকিং খাতে অনেকটা নগদ টাকার সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
এ সঙ্কট থেকে নানামুখী আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। তারা বলছেন, সঞ্চয়পত্রে সুদ হার বেশি হওয়ায় ব্যাংকের আমানত চলে যাচ্ছে সঞ্চয়পত্রে। এতে ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। বিপরীতক্রমে ঋণের প্রবৃদ্ধি দিন দিন বেড়ে চলছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, নভেম্বরে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বেড়ে ১৯ শতাংশের ওপরে উঠে গেছে, যা অক্টোবরে ছিল ১৯ শতাংশের নিচে। অথচ আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশ। প্রচলিত ধারা অনুযায়ী আমানতের প্রবৃদ্ধির চেয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি কম হওয়ার কথা থাকলেও এটা হচ্ছে উল্টো, যা মোটেও শুভ লক্ষণ নয়। কারণ নিয়ম অনুযায়ী যে পরিমাণ ঋণ দেয়া হচ্ছে তা উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে না। ঋণের অর্থ হয় হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হচ্ছে, না হয় গ্রাহক ঋণ নিয়ে অন্য ঋণ পরিশোধ করছে। অর্থাৎ সঠিক কাজে ঋণের অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে না। ঋণ সঠিক কাজে ব্যবহার না হওয়ায় আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য কমে যাচ্ছে। বছরের শুরুতেও যেখানে উদ্বৃত্ত তারল্য প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ছিল। বছরের শেষ সময়ে এসে তা ৭০ হাজার কোটি টাকায় নেমে গেছে, যার বেশির ভাগই সরকারের কোষাগারে রয়েছে। সামনে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ঋণের প্রবৃদ্ধি ও সুদহারের ওপর। কারণ সরকারের কোষাগারে ব্যাংকের অর্থ দীর্ঘ মেয়াদে আটকে গেছে। এ দিকে কমছে আমানত। এতে ব্যাংকিং খাতে আবারো তহবিল সঙ্কটের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ দিকে পণ্য আমদানির জন্য ঋণপত্র স্থাপনও আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলছে। অক্টোবরে এলসি খোলার হার প্রায় ৩০ শতাংশে উঠে গেছে। কিন্তু সেই হারে রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে না। ফলে বাজারে ডলারের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ কমে গেছে। অনেক ব্যাংক আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য ডলারের সংস্থান করতে পারছে না। হাত পাতছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক বাধ্য হয়ে ব্যাংকগুলোয় ডলার সরবরাহ করছে। এতে চাপ বেড়ে যাচ্ছে রিজার্ভের ওপর।
বাংলাদেশ ব্যাংক এমন পরিস্থিতিতে আগামী ছয় মাসের (জানুয়ারি-জুন) জন্য মুদ্রানীতি করতে যাচ্ছে আজ। মুদ্রানীতির সাথে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল এক সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন সামনে রেখে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো হচ্ছে। এ ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর কারণে মূল্যস্ফীতি যাতে বেড়ে না যায়, সেজন্য বাজার মনিটরিং জোরদার করা হবে। যেসব ঋণ দেয়া হচ্ছে তা উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে কি না সে দিকে খেয়াল রাখা হবে। অর্থাৎ গুণগত ঋণ প্রদানে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করা হবে। অনুৎপাদনশীল খাতে কমানো হবে ঋণপ্রবাহ।