
আর্থিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও লুটপাটের চিত্র হরহামেশাই দেখা যায় এ দেশে। আর সেটা কৌশলেই বা সরাসরিই হোক অথবা আমদানি-রফতানির মাধ্যমে আন্ডার বা ওভার ইনভয়েস দিয়েই হোক। এটা যেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সেক্টরের একটা ‘ঐতিহ্যে’ পরিণত হয়েছে। এই দুর্নীতি অতীতের অনেক রেকর্ডকেই ছাড়িয়ে গেছে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তাদের নামধারী একশ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারের উন্নয়ন ও সুনাম ম্লান করে দিয়ে লেজুড়বৃত্তির মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন প্রশ্নবিদ্ধ করে কৌশলে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে নেয়। সন্দেহজনক লেনদেন এসব কৌশলেরই একটা প্রমাণ, যা বিভিন্ন ব্যাংকের বড় বড় লেনদেনের চিত্রে ফুটে উঠছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব সন্দেহজনক লেনদেন জাতীয় অর্থনীতির জন্য অশনি সঙ্কেত বা হুমকিস্বরূপ।
২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১ হাজার ৬৫৫টি সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। আগের অর্থবছরে এর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩০৭। এক বছরের ব্যবধানে সন্দেহজনক লেনদেন বেড়েছে ২৬.৬২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্র জানায়Ñ মানিলন্ডারিং, অর্থ পাচার, উগ্রবাদ বা সন্ত্রাসে অর্থায়ন, ঘুষ-দুর্নীতি বা বেআইনি কোনো লেনদেনের বিষয়ে সন্দেহ হলে ব্যাংক বা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিকট প্রতিবেদন পাঠায়। এসব রিপোর্ট পেলে বাংলাদেশ ব্যাংক তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি তদন্ত করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে পাওয়া যায়, সন্দেহজনক লেনদেন বেশি বেড়েছে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে। এই অর্থবছরে ১ হাজার ১৮২টি সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে বিএফআইইউ, যা আগের বছরের তুলনায় ৯১ শতাংশ বেশি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় সন্দেহজনক লেনদেন বাড়ে ৯ শতাংশ।
মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে দেশের ব্যাংকগুলোর সক্ষমতার বিষয়ে রেটিং প্রদান করে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংক। সরাসরি ব্যাংকগুলোর নাম প্রকাশ না করলেও কোন্ ব্যাংকের প্রতিরোধ সক্ষমতা কতটুকু তা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে কোনো ব্যাংকই শক্তিশালী মান অর্জন করেনি। মোটামুটি মান পেয়েছে মাত্র ২৮টি ব্যাংক, তিনটি ব্যাংক পেয়েছে সন্তোষজনক, ২৪টি ব্যাংক ঝুঁকিপূর্ণ এবং একটি ব্যাংক খারাপ মানের বা ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার এবং অন্যান্য দেশ থেকে বাংলাদেশে অর্থ আসার বিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা তথ্য প্রচার করলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের এই প্রতিবেদনে এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়টি উল্লেখ করেছে মাত্র। গত অর্থবছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের কাছে তথ্য চেয়ে ৩১টি অনুরোধ পাঠিয়েছে বিএফআইইউ। আগের বছর অনুরোধ পাঠায় ৩৫টি। গত অর্থবছরে বাংলাদেশের কাছে ১৭টি অনুরোধ পাঠিয়েছে বিভিন্ন দেশের এফআইইউ, যা আগের বছরে ছিল ২৮টি। গত অর্থবছরে আটটি চুক্তিসহ মানিলন্ডারিং তথ্য আদান-প্রদানের জন্য বিশ্বের ৫৯ দেশের সাথে চুক্তি হয়েছে বিএফআইইউর।
অর্থ পাচার প্রতিরোধে ব্যাংকগুলোর ভূমিকা শক্তিশালী না হওয়ায় বৈধ চ্যানেলে বাংলাদেশ থেকে অনেক অর্থ পাচার হয়ে যায়, যা বেড়েই চলেছে। পানামা পেপারস, প্যারাডাইজ পেপারসে অনেক বাংলাদেশীর নাম এসেছে। যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে, তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাথে সম্পৃক্ত। অদক্ষতা ও অদূরদর্শিতার কারণেই পাচারকারীরা সহজে তাদের অর্থ বিদেশে নিয়ে যেতে পারছে। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির প্রতিবেদনে বলা হয় ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে সাত হাজার ৫৮৫ কোটি মার্কিন ডলার, স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকার সমান। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ বা প্রায় ৪৪ হাজার ৬১৫ কোটি ডলার পাচার হয়েছে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের মাধ্যমে এলসি খুলে ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনের মাধ্যমে।
দেশের অর্থনীতিকে সচ্ছল রেখে আর্থিক স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কর্মরত-কর্মকর্তাদের দূরদর্শিতাই এর থেকে পরিত্রাণ দিতে পারে।











