পাঠ্যবই মুদ্রণ নিয়ে বেকায়দায় এনসিটিবি

৩০ দিন ডেস্ক :
এনসিটিবি’র কর্মকর্তা-কর্মচারীর মোট ৩০২টি পদের ৯৯টিই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। বিনামূল্যের পাঠ্যবই মুদ্রণ ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা এই সংস্থাটির জনবল স্বল্পতা নিরসনের উদ্যোগ নেই দীর্ঘদিন। জনবল সংকটে ২০১৯ শিক্ষাবর্ষের প্রায় ৩৬ কোটি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ প্রক্রিয়া নিয়ে বেশ বেকায়দায় রয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
শূন্য পদে কর্মকর্তা পদায়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওপর অনেকটাই বিরক্ত এনসিটিবি’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) ও ঢাকার বিভিন্ন কলেজে প্রায় দুই থেকে তিন শতাধিক শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) রয়েছেন। তারা বসে বসে বেতন ভাতা ভোগ করছেন। অথচ জনবল স্বল্পতায় এনসিটিবি’র কার্যক্রম বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।
এ ব্যাপারে এনসিটিবি’র সদস্য প্রফেসর ড. মিয়া ইনামুল হক সিদ্দিক বলেন, ‘আমরা সবগুলো শূন্য পদের রিকুইজিশন (চাহিদাপত্র) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দিয়েছি। কিন্তু কেন যে কর্মকর্তা পদায়ন হচ্ছে না, তা আমরা জানি না। তবে কর্মকর্তা না থাকায় আমাদের অনেক সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রধান সম্পাদক, উৎপাদন নিয়ন্ত্রক ও বিতরণ নিয়ন্ত্রক- এই তিনটি পদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জনবল স্বল্পতায় পাঠ্যবই মুদ্রণের চলমান টেন্ডার (দরপত্র) কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এনসিটিবি’তে স্থায়ী কর্মকর্তার মোট পদ ৬২টি। এছাড়া ‘সেসিপ’ (শিক্ষার মনোন্নয়ন প্রকল্প) প্রকল্পের অধীনে আরও ১৫ জন কর্মকর্তা এই সংস্থায় কর্মরত আছেন। মোট পদ ৭৭টি। মূলত বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রেষণে (ডেপুটেশন) এনসিটিবিতে পদায়ন দেয়া হয়। কর্মকর্তার ৬২টি পদের মধ্যে ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
আর রাজধানীর মতিঝিলস্থ পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের নিজস্ব ১ম, ২য়, ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীর মোট পদ রয়েছে ২৪০টি। এসব পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ৮০টি পদ। দীর্ঘদিন ধরে জনবল স্বল্পতার কারণে এই সংস্থার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল। এই অবস্থায় ২০১৪ সালে বিভিন্ন পদে কর্মচারী নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু মামলা সংক্রান্ত কারণে ওই নিয়োগ কার্যক্রম এখনও শেষ হয়নি বলে এনসিটিবি’র সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
এনসিটিবি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি সরকারি সংস্থা হলেও তারা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সকল পাঠ্যবইও মুদ্রণ করেন। সব মিলিয়ে এনসিটিবির মোট ৩০২টি কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদের মধ্যে ৯৯টি পদ শূন্য রয়েছে।
মোট পদের মধ্যে সংস্থার সদস্যের (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) পদটি ফাঁকা রয়েছে গত বছরের ৫ এপ্রিল থেকে। এই পদের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার অধীনে সারাদেশের প্রাথমিক স্তরের দুই কোটি ২০ লাখ শিশুর কারিকুলাম, পাঠ্যপুস্তক ও অন্যান্য শিখন-শেখানো সামগ্রী (প্রাক-প্রাথমিক থেকে ৫ শ্রেণী পর্যন্ত) প্রণয়ন ও পরিচালিত হয় এবং এই কর্মকর্তা শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাজের সমন্বয় করেন।
গত বছরের ১৬ এপ্রিল থেকে এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রকের পদটি ফাঁকা রয়েছে। এই পদের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাই মূলত মাধ্যমিক স্তরের বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিতরণের টেন্ডার প্রক্রিয়া সমন্বয় করেন। বর্তমানে ২০১৯ শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
পাঠ্যপুস্তকে ভুলত্রুটির অভিযোগে গত বছরের ১০ জানিয়ারি এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক অধ্যাপক প্রীতিশ কুমার সরকারকে ওএসডি করা হয়। এরপর থেকেই ওই পদটি ফাঁকা রয়েছে। কিন্তু তদন্তে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোন কিছু প্রমাণ হয়েছে কিনা তা এখনও জানেন না অধ্যাপক প্রীতিশ কুমার। অথচ তাকে পদায়নও করা হচ্ছে না।
এরপর গত বছরের ৫ এপ্রিল থেকে এনসিটিবির সম্পাদক সহকারীর পদ ও বিষয় বিশেষজ্ঞের দুটি পদ শূন্য রয়েছে।
সংস্থার উৎপাদন নিয়ন্ত্রকের পদটি শূন্য হয়েছে গত ৩০ ফেব্রুয়ারি। এই পদের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কার্যক্রমের দরপত্র সমন্বয় করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাউশিতে ওএসডি একজন কর্মকর্তাকে দিয়ে এনসিটিবি’র প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের প্রায় ১০০ কোটি টাকার কাগজপত্র কেনার প্রক্রিয়া চলছে। এ নিয়ে এনসিটিবি পরেছে বেকায়দায়। কারণ ওএসডি কর্মকর্তার অধীনে কেনাকাটা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক ওঠতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিটিবি’র একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পাঠ্যবইয়ের কারিকুলাম নিয়মিত আধুনিকায়ন, মানোন্নয়ন ও কনটেন্ট তৈরি, বিশেষজ্ঞ জনবল গড়ে তোলাসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করার কথা এনসিটিবির। কিন্তু জনবল স্বল্পতা ও কাজের চাপের কারণে সংস্থাটিকে কেবল পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণেই বেশি ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। বাকি কাজের প্রতি সংস্থার কর্মকর্তারা খুব একটা মনোযোগ দিতে পারছেন না।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এনসিটিবি মূলত বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাদের কর্মস্থল। কিন্তু এখানে বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাদের খুব একটা কদর নেই, পদায়নও পান না। যারা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে যত বেশি প্রভাবশালী কিংবা অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে পারেন তারাই ওইসব গুরুত্বপূর্ণ পদ ভাগিয়ে নিচ্ছেন। এর ফলে পাঠ্যপুস্তক হারাচ্ছে অসাম্প্রদায়িক চেতনা। বইয়ের যথাযথ মানও বজায় থাকছে না। পাঠ্যপুস্তকের কাগজের মান ভালো কী মন্দ তা দেখারও সময় পাচ্ছে না এনসিটিবি। আবার যেসব কর্মকর্তা বিভিন্ন সময়ে দক্ষতা ও বিচক্ষণতার প্রমাণ দিচ্ছেন তারাও ভালো কাজের স্বীকৃতি পাচ্ছেন না; উল্টো শাস্তিমূলক পদায়ন পাচ্ছেন।
২০১৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িকরণের অভিযোগ ছাড়াও ব্যাপক ভুলত্রুটি, নানা অসঙ্গতির অভিযোগ ওঠে। এতে দেশব্যাপী সমালোচনা হয়। উচ্চ পর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। ওই সময় কোন ধরনের বাছবিচার না করেই এনসিটিবির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলক বদলি ও ওএসডি করা হয়। কিন্তু ওইসব পদের অধিকাংশই পূরণ করা হয়নি; আলোর মুখ দেখেনি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন।
এছাড়াও সংস্থার উপসচিব (কমন), উপসচিব (প্রশাসন) এবং গবেষণা কর্মকর্তা ও বিষয় বিশেষজ্ঞের বেশ কয়েকটি পদ প্রায় এক বছর ধরে ফাঁকা রয়েছে।
এ ব্যাপারে এনসিটিবি’র চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেন, ‘শূন্য পদে পদায়নের জন্য আমরা এক বছর ধরেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বলে আসছি, নিয়মিত যোগাযোগ করছি, মন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলেছি। কিন্তু নিয়োগ হচ্ছে না। আমরা আর কী করতে পারি?’
কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়া ঝুলে থাকার বিষয়ে চেয়ারম্যান বলেন, ‘মামলা সংক্রান্ত জটিলতা ছাড়াও কাগজপত্র সংক্রান্ত ঝামেলার কারণে এটি বিলম্ব হচ্ছে। তবে আশা করছি, খুব দ্রুতই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা পদায়নের জন্য বিভিন্ন শিক্ষকের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। এনসিটিবিতে পদায়ন পেতে অনেকেই আবেদন করেছেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তদবিরও রয়েছে। এখন নানা বিষয় যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। এখন থেকে সৎ, দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তারাই এনসিটিবিতে পদায়ন পাবেন। এজন্য একটু দেরি হচ্ছে। খুব শীঘ্রই কয়েকজন কর্মকর্তা এখানে পদায়ন পাবেন।’
এদিকে গত ২২ ফেব্রুয়ারি এনসিটিবি’র আটজনসহ রাজধানীর বিভিন্ন পদের ২৯ কর্মকর্তাকে বদলি করা হলেও ওইসব পদে কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে পারছে না শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে তারা নানা মহলের তদবিরের চাপে ওই ২৯ কর্মকর্তার কয়েকজনের বদলির আদেশ বাতিলের চিন্তাভাবনা করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এই প্রেক্ষাপটেই জনবল স্বল্পতার কারণ দেখিয়ে এনসিটিবির আটজন কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র দুজন পদায়ন হওয়া কলেজে যোগদান করেছেন। বাকি ছয়জন কর্মকর্তা এখনও এনসিটিবি থেকে বিমুক্ত হননি।
এনসিটিবির ৭৭টি প্রেষণে পদের মধ্যে চেয়ারম্যান এবং সদস্য (টেক্সট), সদস্য (প্রাথমিক কারিকুলাম), সদস্য (মাধ্যমিক) পদে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ক্যাডারের অধ্যাপকরা দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তবে সদস্য (অর্থ) পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা অর্থাৎ যুগ্ম সচিব।
এনসিটিবি জানায়, ২০১৮ শিক্ষাবর্ষে মোট ৩৫ কোটি ৪২ লাখ ৮৫ হাজার ৯৪৯ কপি পাঠ্যবই ছাপা হয়েছে। ২০১৯ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রায় ৩৬ কোটি কপি পাঠ্যবই ছাপানো হচ্ছে বলে অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা জানিয়েছেন।