ঋণ প্র্রবৃদ্ধি অপরিবর্তিত রেখেই প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা

অর্থবছর ২০১৮-১৯
অর্থনীতির ৩০ দিন প্রতিবেদক :
আগামী ডিসেম্ব্বরে দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। নির্বাচনের আগে টাকার প্রবাহ বেড়ে যায়। টাকার প্র্রবাহ বাড়লে মূল্যস্ফীতিও বাড়ে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন মুদ্রানীতিতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন অপরিবর্তিত রেখেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন গভর্নর ফজলে কবির। এ সময় ডেপুুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজি হাসান, এসএম মনিরুজ্জামান, আহমেদ জামাল, বাংলাদেশ ব্যাংকের চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট পরামর্শক আল্লা মালিক কাজমী, ব্যাংকিং রিফর্ম অ্যাডভাইজার এসকে সুর চৌধুরী, প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. ফয়সল আহমেদ ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মো. আখতারুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
ঘোষিত মুদ্রানীতিতে আগের মুদ্রানীতির মতোই বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। সরকারি ঋণের প্রাক্কলন করা হয়েছে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। এছাড়া অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন এক সময় নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে, যখন বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবে ৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার এবং সামগ্রিক ভারসাম্যে শূন্য দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি রয়েছে। ডলারের বিপরীতে কিছুটা চাপের মধ্যে পড়েছে টাকার মান। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে ব্যাংকগুলোয় ডলারের সংকট চলছে। ব্যাংকগুলো আগ্রাসী ঋণ বিতরণ করায় ব্যাংকিং খাতে চলছে প্রকট তারল্য সংকট। এছাড়া আমদানি ও রফতানি বাণিজ্যের লেনদেনের মাধ্যমে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা পাচারের অনিয়মও পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তার ওপর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গতবারের মুদ্রানীতিতে ঘোষিত লক্ষ্যও অর্জন করতে পারেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাই আগের মুদ্রানীতির মতো ঋণ প্রবৃদ্ধি অপরিবর্তিত রেখে এবারো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা কতটুকু বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।
তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে বলে মনে করেন গভর্নর ফজলে কবির। নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণাকালে তিনি বলেন, নির্বাচনী বছরে টাকার সরবরাহ বেড়ে যাবে। এজন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির ভঙ্গি হবে সংযত ধরনের। নির্বাচন সামনে রেখে বাজারে টাকার প্রবাহ যাতে খুব বেড়ে না যায়, সেদিকে নজর রাখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, তারল্য সংকট নিরসন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর ও সতর্ক আছে ।
গভর্নর আরো বলেন, নিট বৈদেশিক সম্পদ কমতে থাকার কারণে গত অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে স্থানীয় বাজারে টাকা ও বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য কমতে থাকে। একই সঙ্গে উচ্চ সুদহারের কারণে মানুষ সরকারি সঞ্চয়পত্রের দিকে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট হওয়ায় বেসরকারি ব্যাংকে আমানতের প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে পড়ে। এ অবস্থা নিরসনের জন্য চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল থেকে ব্যাংকগুলোর বাধ্যতামূলক বিধিবদ্ধ জমার অনুপাত বা সিআরআর ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে ৫ দশমিক ৫০ শতাংশে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তহবিল আহরণের রেপো সুদহার ৭৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন ব্যবস্থা, বাণিজ্যিক ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থা, সুদের হার, সিআরআর হ্রাস, অর্থ পাচার, রিজার্ভ চুরি, ভল্টে রাখা স্বর্ণে হেরফেরের অভিযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ে গভর্নরকে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা।
এসব প্রশ্নের উত্তরে গভর্নর ফজলে কবির বলেন, ব্যাংকের সুদের হার কমানোর পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রের সুদের হারও কমিয়ে আনা হবে। একই সঙ্গে বিদেশে যেন টাকা পাচার না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরিং সেল। অর্থনীতির সুবিধার জন্য এডি রেশিও সংশোধন করা হয়েছে। তবে বাজারে যথেষ্ট তারল্য আছে। শেয়ারবাজারের জন্য এখন ইতিবাচক সময় বিরাজ করছে বলেও জানান তিনি।
রিজার্ভের অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে গভর্নর বলেন, আমরা ১৫ মিলিয়ন ডলার ফেরত পেয়েছি। বাকি প্রায় ৫১ মিলিয়ন ডলার ফেরত আনার বিষয়টি বিচারাধীন। ফিলিপাইনের আদালতে এর সুরাহা হলেই আমরা টাকাটা ফেরত পাব। পুরো টাকাই আমরা ফেরত পাব। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত স্বর্ণ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গভর্নর ফজলে কবির বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে ছয় স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা, ৪২টি সিসি ক্যামেরা রয়েছে। এখানে স্বর্ণ হেরফেরের কোনো সুযোগ নেই। সম্প্রতি যে রিপোর্ট হয়েছে, তা সামান্য ভুল বোঝাবুঝির কারণে হয়েছে। কাস্টমস যা জমা রেখেছিল, স্বর্ণ তা-ই আছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সুদহার নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা শুনিয়েছেন গভর্নর। তিনি বলেন, অনুকূল পরিস্থিতি টেকসই করার জন্য আবশ্যিক সংস্কারগুলো দ্রুত সম্পন্ন করা না গেলে আর্থিক বাজারে আমানত ও ঋণের সুদহারে চাহিদা ও জোগানভিত্তিক পরিবর্তনশীলতা বাধাগ্রস্ত হবে। এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা মধ্যম আয় ও উন্নত অর্থনীতি পর্যায়ে দেশের প্রত্যাশিত উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আহরণ প্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করার মাধ্যমে প্রবৃদ্ধিবান্ধব হওয়ার পরিবর্তে প্রবৃদ্ধি প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে। আবশ্যিক জরুরি সংস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে, প্রথমত. খেলাপি ঋণজনিত ব্যয়ভারসহ ব্যাংকের সামগ্রিক পরিচালন ব্যয়ে দ্রুত রাশ টেনে এনে আমানত ও ঋণ সুদহারের ব্যবধান বা ইন্টারমেডিয়েশন স্প্রেডের সংকোচন। দ্বিতীয়ত. সরকারি সঞ্চয়পত্রের মুনাফা হার এবং এর সঙ্গে তুলনীয় মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের বাজার ইল্ড হারের মধ্যে পার্থক্য যৌক্তিকীকরণ। সর্বোপরি সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি নিম্নমাত্রায় রাখার পরিবেশ সৃষ্টি।
বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি পরিমিত রাখতে কাজ করা হচ্ছে জানিয়ে গভর্নর বলেন, এজন্য রফতানি ও প্রবাসী বাংলাদেশীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স অন্তঃপ্রবাহ জোরদার করার পাশাপাশি সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ আকর্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। মূলধন বাজারে ইকুইটি ও বন্ড ইস্যু কার্যক্রম বিকাশের গুরুত্বের কথা আমরা পূর্ববর্তী মুদ্রানীতিতেও বলেছি। দেশে অবকাঠামো ও অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতে মেগা প্রকল্পগুলোর অর্থায়নে বৈদেশিক ঋণের ওপর মাত্রাধিক নির্ভরতা এড়িয়ে দেশী ও বিদেশী ইকুইটি বিনিয়োগ পর্যাপ্ত মাত্রায় আকর্ষণ এবং বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে সহনীয় অবস্থা আনা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, একদিকে আমদানির এলসি খুলে পণ্য না এনে টাকা পাচার করা, অন্যদিকে রফতানি করে টাকা দেশে না আনার মাধ্যমে ৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হওয়ার তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে অনুসন্ধান শেষে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ব্যবস্থা নিতে নথি পাঠানো হয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছেও।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থা কি ভেঙে পড়েছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, পরিদর্শনে যেসব অনিয়ম ধরা পড়ছে, এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আমাদের যে আইনি সীমারেখা রয়েছে, এর মধ্যেই সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।