

খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
“আজ থেকে তোমার জিনিস তুমি নিজেই কিনবে, মেয়েদের এসব ব্যক্তিগত জিনিস পুরুষ কিনতে পারে না!” অনিচ্ছা সত্বেও কথাটা বলতে হল শাহেদকে। মাসের বেতনের টাকাটা পরের মাসের ৪ অথবা ৫ তারিখে পেতে হয়, উল্লেখিত তারিখে বন্ধের দিন হলে হয়তো আরো ১ বা ২ দিন পর সংগ্রহ করতে হয়, নিয়মটা এরকমই। বেতনের টাকাটা যখন আমার স্বামী শাহেদের হাতে তুলে দিলাম, স্বামী টাকাটা গুণে আমার দিকে রাগতভাবে তাকিয়ে বললো, ১৫ হাজার কেনো “তুমিতো ৩৫ হাজার টাকা বেতন-ভাতা পাও, এখানে তো দেখছি মাত্র ১৫ হাজার টাকা!” আমি বললাম- ১৫ হাজার তোমাকে দিলাম, ১০ হাজার নিজের জন্য রাখলাম আর বাকি ১০ হাজার আমার বাবা-মায়ের জন্য রেখেছি।
শাহেদ যেন নিজের পাওনা টাকার অধিকার খাটিয়ে অবাক হয়ে বললো, “তোমার বাবা-মায়ের জন্য মানে কি! মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে মানে মেয়ের উপর তাদের দায়িত্ব শেষ নয় কি! আর বিয়ের পর স্বামীর বাড়ি আশা মানে তোমার উপর থেকে তোমার বাবা-মায়ের দাযিত্ব শেষ, রেখেছো মানে তোমারও তাদের উপর দায়িত্ব শেষ! নিজের সংসার বাদ দিয়ে আলাদা করে উনাদের প্রতিমাসে তোমার টাকা দিতে হবে না। দাও বাকি টাকাটা দাও!” আমি বাবা-মায়ের জন্য যে টাকাটা আলাদা করে রেখেছিলাম, সেই টাকাটাও শাহেদের হাতে তুলে দিলাম। এবারও শাহেদ টাকাটা গুণে বললো, “তোমার নিজের জন্য টাকা রাখতে হবে কেন? তোমার যা লাগে সবই তো আমি দিই, দিচ্ছি!”
শাহেদেও সার্বিক অবস্থা এবং কথার ধরণ দেখে বুঝতে বাকি ছিলনা যে সে কি বুঝাতে চেয়েছে। শেষ পর্যন্ত কোন কথা না বলে আমি আমার ব্যক্তিগত খরচের জন্য রাখা টাকাটাও চুপচাপ শাহেদের হাতে দিয়ে দিলাম। মা- ছেলের স্বভাবগত বৈশিষ্ট প্রায় একই রকম ধরা যায়। কখনো দুটো জিনিস একই রকম কিনলেই শ্বাশুড়ি তা সহজে মেনে নেন না। শীত আসাতে দুটি শাল একই রকম কেনাতে শ্বাশুড়ি বললেন দুটি শালই একই রকম কিনলে কেন। দুইটা দুই রকম কেন কিনতে পারনি?” আমি বলেছিলাম- একটা আপনার জন্য, একটা আমার মায়ের জন্য। শ্বাশুড়ি বিরক্ত হয়ে যা বলেছিলেন, “তোমার আহ্লাদ দেখে বাঁচি না। মেয়ে মানুষের বিয়ের পর স্বামীর বাড়িই সব। এতো বাপের বাড়ির কথা চিন্তা করলে চলবে না”
সেদিন থেকে নিজেই নিজের ব্যক্তি পরিকল্পনাকে অন্যরকম করে সাজিয়ে রাখলাম। শুধু মনে মনে পরিকল্পনায় ভাবছি, শ্বাশুড়িগুলো কেন এমন হয়!! যখন নিজের মেয়েকে অন্যের ছেলে যতেœ রাখে, তখন তারা খুব খুশি হয়, আর যখন নিজের ছেলে অন্যের মেয়েকে ভাল রাখতে চায়, তখন আবার এই শ্বাশুড়িগুলোই প্রতিবাদি এবং নির্মম হয়ে উঠে। তখন বাবার একটা কথা মনে পড়ে গেল, ‘বাই বার্থ অব ওমেন আর সেলফিস।’ আত্ম সংবরন করে মাথা নিচু রেখে শ্বাশুড়িকে বলেছিলাম, ঠিক আছে, আজ থেকে আর বাপের বাড়ির কথা চিন্তা করবো না! পুরো রাত্র একটা বিবেকহীন অতৃপ্ত দহনে জ্বলেপুড়ে নিদ্রাবিহীন সময় পার করে সকালে অফিস যাওয়ার সময় শাহেদকে বললাম, আমাকে পথভাড়া বাবদ ২০০/২৫০ টাকা দাও, আর খেয়াল রেখো, বাসায় ফেরার সময় ব্যক্তিগত কিছু জিনিস আমার জন্য অর্থ্যাৎ নতুন দুই সেট ব্রা-পেন্টি নিয়ে এসো, ব্রা আনার সময় খেয়াল করবে, ভুল সাইজ কিন্তু আনবে না! যদি আনো, তাহলে তোমাকেই আবার সেটা চেঞ্জ করে আনতে হবে। আর হ্যাঁ ফার্মেসি থেকে এক প্যাকেট প্যাডও আনতে ভুলবে না।
মনিকার নিঃসংকোচে বলা কথার চাপটা শাহেদকে ভিব্রান্তিতে ফেলল বটে, কিন্তু এড়িয়ে যাবার কোন উপায় ছিল না। মেয়েলি জিনিস কিনতে পারদর্শী নয় বলে আমতা আমতা করে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। হয়তো ব্যাপারটা সহজে নিতে পারেনি। তাই বোবা হয়ে গেলো! কিছু না বলতে বলতে শাহেদের মানিব্যাগ থেকে ৫০০ টাকার একটা নোট বের করে দু-দিনের যাতায়াত খরচ বলে অফিসের দিকে বের হয়ে চলে গেল।

অফিসের কাজে সারাদিন তেমন একটা মন বসছিল না। রিক্সায় করে বাসায় ফিরার পথে আস্তে আস্তে নিজেকে একটু প্রস্তুতি নিয়ে স্বাভাবিক করে নিলাম। বাসায় ফেরার পর শ্বাশুড়ি একটা শাড়ি দেখিয়ে বললো, “মনিকা, দেখতো এটা তোমার ননদ অর্থ্যাৎ আমার লক্ষি মেয়েটা আমার জন্য কিনে পাঠিয়েছে। কি সুন্দর এবং খুব দামি, তাই না? কেমন হয়েছে বউ মা?”
কিছুটা অবাক হয়েই বললাম, মা…, রুপার তো বিয়ে হয়েছে। সে শ্বাশুড়ির জন্য শাড়ি না কিনে কোন আক্কেলে আপনার জন্য কিনেছে বুঝলাম না! বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িই মেয়েদের নিজের বাড়ি! জানি না রুপার এতো আহ্লাদ কেন? যা হোক, শাড়িটা আমি নিয়ে গেলাম। পরে সময় মতো রুপার কাছে পাঠিয়ে দিবো! একথা বলে শ্বাশুড়ির হাত থেকে শাড়িটা তুলে নিজের রুমে চলে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলাম।
সন্ধার পর শাহেদ বাসায় ফিরলে হাত খালি দেখে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার জিনিস এনেছো? শাহেদ নিজেকে অপরাধীর মতকরে দাঁড় করিয়ে মিনমিনে ভাষায় চোখ নামিয়ে আস্তে করে বললো- “না, আনতে মনে ছিলনা!” কালকে না হয়…
তুমি কি কিছু বুঝ? নিজেকে সংযত রাখতে না পেরে কিছুটা রেগেই বললাম, আমার এখন পেট ব্যাথা এবং পিরিয়ড শুরু হয়েছে, আনো নি কেন? তোমাদের কোন জ্ঞান বুদ্ধি বলতে কিছু আছে, নির্বোধ লোক। যখন দেখবে পরনের কাপড় নষ্ট হয়ে বিছনা নষ্ট হওয়া শুরু হবে, এই দামী কম্বলে রক্তের দাগ লেগে যাবে সেটা কি ভালো লাগবে? আমার কথা শুনে শাহেদ দেরি না করে তাড়াতাড়ি রুম থেকে বের হয়ে গেলো, এবং কিছুক্ষণ পর একটা প্যাকেট প্যাড এনে আমার হাতে দেওয়ার পর রাগের মাথায় বললাম, আমার আর বাকী জিনিস কোথায়? শাহেদ মাথা নিচু করে ১০ হাজার টাকা হাতে দিয়ে বললো, নাও তোমার টাকা, কিছু বলো না, ভুলটা আমারই ছিল, “আজ থেকে তোমার জিনিস তুমিই কিনবে। মেয়েদের সব জিনিস পুরুষ কিনতে পারে না!”
গত বেশ কিছুদিন থেকে বাবা মনিকাকে বলতেছিল, বাবাকে একটু দেখে আসতে বললেও সংসারে স্বামী-শ্বাশুড়ির খাওয়া দাওয়াসহ সাংসারিক ঝামেলার কারনে মনিকা বাবার বাড়িতে যেতে পারে নাই। সেই সাথে স্বামী-শ্বাশুড়ির প্রতি একটু অভিমানও ছিলনা যে, তা নয়। দু-দিন পর ছুটির দিনে হঠাৎ করে কাউকে না বলেই মনিকাকে দেখতে চলে আসে। দুপুরে খাবার টেবিলে বসে স্বামী-শ্বাশুড়ির সামনে মনিকাকে বললো, “মা রে, আমার বয়স হয়েছে। কখন কি হয় বলা যায় না। তুই তোর প্রাপ্য সম্পত্তিগুলো বুঝে নে।” বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘কিসের সম্পত্তি বাবা? তুমি জানো না, মেয়েরা বিয়ের পরে পর হয়ে যায়? তুমি যেদিন আমায় বিয়ে দিয়েছো, সেদিনের পর থেকেই আমার প্রতি তোমার দায়িত্ব শেষ! আর আমি যখন শ্বশুরবাড়িতে পা রেখেছি, তখনই তোমার প্রতিও আমার দায়িত্ব শেষ! আমার স্বামী-শ্বাশুড়ি আমাকে সেটাই শিখিয়েছে!
মনিকার এমন কথায় বাবা অবাক হয়ে বললো, “মা, এসব তুই কি বলছিস?” মনিকা একটু অভিমানের সুরেই বলল, বাবা আমি যা বলেছি, ঠিকই বলেছি বাবা, তোমার সম্পদের কানাকড়ি, আমার কিছুই লাগবে না। নেহায়েত বোকা না হলেও শাহেদ একটু আমতা আমতা করে আমাকে বললো, “তুমি আমাদের ভুল বুঝেছো কেনো? মুলত বিষয়টা এমন না!”
শিক্ষিত এবং বুদ্ধীদিপ্ত মনিকা অত্যন্ত শান্ত গলায় শাহেদকে বলল, তাইলে তুমিই বলো বিষয়টা কেমন? আমার কি ইচ্ছে হতে পারে না, যে মানুষটা দীর্ঘ ২৫/২৬ বছর আমাকে লালন-পালন করে এতো বড় করলো, নিজের সখ-আহ্লাদ পরিহার করে পড়াশোনা শিখিয়ে তোমার মত একজন যোগ্য পাত্রের সাথে বিয়েও দিলো, তার জন্য নুন্যতম কিছু করতে? আজ আমার লেখাপড়া, চাকুরি বিয়ে সবকিছুর মূলতো বাবারই জন্য। উনিতো চাইলেই পারতেন উনার মেয়েকে পড়াশোনা না করাতে। আমার বিয়ে হয়ে গেছে বলে উনার প্রতি আমার সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে? মেয়ে বিয়ে দিলেই যদি বাবা-মায়ের দায়িত্ব শেষ হয়ে যেতো, তাহলে আমার বাবা এখানে আসতো না আমার প্রাপ্য আমাকে বুঝিয়ে দিবার জন্য বলতে, সুদুর পথ পাড়ি দিয়ে। নিজের বিবেকের নিকট ধরাশায়ী শাহেদ আর কোন কথা না বলে মাথা নিচু করে রইলো।
আহ্লাদি মনিকা তখন শ্বাশুড়িকে বলল, এক মাকে ছেড়ে আরেক মায়ের কাছে এসেছি। আমার দুই-দুইটা মা! যে মেয়ের দুই-দুইটা মা থাকে, সেতো একটু আদরের হবেই। আমি এক মায়ের জন্য কিছু কিনবো, আরেক মায়ের জন্য কিনবো না, সেটা কিভাবে হয়? আমিতো কোন মাকেই ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে চাই না। আপনিই বলুন, আপনি ছাড়া আমার কেই বা আছে? শ্বাশুড়ির হৃদয় যেন এক অজানা মমতায় ভরে গেল মনিকার প্রতি।
শাহেদ মনিকাকে জড়িয়ে ধরে বললো, “তুমি তোমার সম্পত্তি নাও কিংবা না নাও, এতে আমার বিন্দুমাত্রও আপত্তি নেই। কিন্তু তুমি আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না, আমার ভুলটা আমি বুঝতে পেরেছি। আসলে শ্বাশুড়ি ও বউয়ের স্থান কখনো প্রতিযোগিতায় বা প্রতিহিংশায় না গিয়ে মাতৃস্নেহের ভুমিকায় সম্পর্কের সমতা এবং দৃঢ়তার জন্য মন-মানসিকতার পরিবর্তন হোক প্রতিটি ঘরেঘরে।” আসলে প্রতিটি ঘরে ঘরে শ্বাশুড়িদের প্রতিটি পুত্রবধুকে নিজের মেয়ের স্থানে জায়গা করে দেওয়া এবং প্রতিটি পুত্র বধুর উচিত শ্বাশুড়িদের নিজের মায়ের জায়গায় স্থান করে দেয়ার মাধ্যমে প্রতিটি পরিবার ভারসাম্যহীন সুখী পরিবার গড়ে তোলা।
মনিকার বাবা একটু অপ্রস্তুুত হলেও মেয়ের কৌশলি কথা ও কাজের কারনে সেটা সমাধান হয়ে গেলো। মনিকা শ্বাশুড়ির গলা জড়িয়ে ধরে, “তুমিতো আমার মা, শাড়িটা আসলে আমারও পছন্দ হয়েছিল, তাই লোভ সামলাতে পারছিলাম না বলে শাড়িটা নিয়ে গেলাম তাই…
শ্বাশুড়ি মনিকার কপালে দুটো চুমু দিয়ে…, “দেখনা কেমন পাজি মেয়ে, মায়ের সাথে ঢং, আসলে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম, আমি এক মেয়েকে বিয়ে দিয়ে আরেকটা মেয়ে পেয়েছি, আজ আমার কি যে ভাল লাগছে।” মানুষ কখনো ভুলের উর্ধ্বে নয়। সংসার জীবনে এমন সমস্যা হতেই পারে। আপনার প্রতিবাদের কৌশলটা শুধু একটু অন্য রকম হোক…
লেখক : কবি, সব্যসাচী লেখক, কথাসাহিত্যিক, সম্পাদক প্রখাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন ।












