
খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ(আইডিআরএ)’র নতুন ওয়েবসাইট এবং ডিজিটাল বীমা মেনুয়েল উন্মোচন অনুষ্ঠান রাজধানির বিয়াম অডিটোরিয়ামে লাইফ এবং নন-লাইফ বীমা কোম্পানি সমুহের ছেয়ারম্যান, পরিচালক, এমডি/সিইও বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েসন, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে আইডিআরএ’র নিজস্ব ব্যাবস্তাপনায় পরিচালিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড.আহসান এইচ মনসুর। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ড. এম আসলাম আলম, চেয়ারম্যান আইডিআরএ। সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন আইডিআরএ‘র লাইফ, নন-লাইফ সদস্যসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তাগন। দেশের বীমাখাতকে আধুনিকায়ন এবং তথ্য আদান প্রদানে নতুন ওয়েবসাইটে ৪খন্ডের ডিজিটাল বীমা মেনুয়েল সংযোযন করা হয়।
নতুন ওয়েবসাইট এবং ডিজিটাল বীমা মেনুয়েল উন্মোচন অনুষ্ঠানে আজকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সাথে মিটিং এবং বীমা উন্নয়ন আলোচনায় বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের পক্ষ থেকে ব্যাংকিং কার্যক্রমের পদক্ষেপ হিসেবে যে প্রস্তাবগুলো দেয়া হয়েছে, যা ইন্স্যুরেন্স সংক্রান্ত অনিয়ম ও বৈষম্য এবং বীমা কোম্পানি সমুহের ব্যাংকিং কাজে ব্যাংক, আইডিআরএ এবং বাংলাদেশব্যাংকের সমন্ময়হীনতা দুর করে দেশের বীমাখাতকে জিডিপিতে অবদান রাখার ক্ষেত্রে সফল ভুমিকা রাখবে। আলোচ্য পয়েন্টসমূহ:
১। নির্দিষ্ট ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি চাপিয়ে দেওয়া
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো গ্রাহক যখন ব্যাংকে লোন (CC/Term Loan) বা এলসি খোলার জন্য যান, তখন ব্যাংক কর্মকর্তারা তাদের নিজস্ব পছন্দনীয় কিছু ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি থেকে পলিসি নেওয়ার শর্ত আরোপ করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রাহকের সম্মতি ছাড়াই তারা নিজ উদ্যোগে ইন্স্যুরেন্স গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন, যা গ্রাহকের স্বাধীন পছন্দের অধিকারকে ক্ষুন্ন করে।
২। প্রিমিয়াম পরিশোধ যাচাই ব্যতীত লোন ডিসবার্স ও এলসি
যে ইন্স্যুরেন্স কভারের বিপরীতে লোন ডিসবার্স বা এলসি থ্রো করা হয়, সেই কভারের বিপরীতে প্রিমিয়াম পরিশোধ হয়েছে কি না-তা অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথভাবে যাচাই করা হয় না। অথচ প্রিমিয়াম পরিশোধ ছাড়া কোনো ইন্স্যুরেন্স পলিসির বিপরীতে আইনগতভাবে ক্লেইম পরিশোধযোগ্য নয়। এই অবহেলা ব্যাংক, গ্রাহক এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি করে।
৩। এনলিস্টমেন্টের নামে হয়রানি ও মুক্ত প্রতিযোগিতা ব্যাহত করা
বাংলাদেশ সরকারের বৈধ লাইসেন্সপ্রাপ্ত বহু ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি থাকা সত্ত্বেও অনেক ব্যাংক নিজেদের তৈরি করা এনলিস্টমেন্ট প্রক্রিয়াকে বাধ্যতামূলক করেছে। এই এনলিস্টমেন্ট প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে অযৌক্তিক, দীর্ঘসূত্রতাপূর্ণ ও হয়রানিমূলক, যা মুক্ত প্রতিযোগিতা এবং সমান সুযোগের নীতির পরিপন্থী।
৪। অনেক লিজিং ও ফাইন্যান্স কোম্পানি মাত্র ২/৩টি নির্দিষ্ট পছন্দনীয় ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানি থেকে বীমা গ্রহণে অনিচ্ছুক। এর ফলে সরকার কর্তৃক লাইসেন্সপ্রাপ্ত বহু ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ব্যবসায়িক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা স্পষ্টতই বৈষম্যমূলক আচরণ বলে পরিগনিত।
৫। স্বার্থসংঘাত ও পারিবারিক কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ এমন অনেক তথ্য ও অভিযোগ রয়েছে যে, কিছু ব্যাংক কর্মকর্তা তাদের স্ত্রী, সন্তান বা নিকট আত্মীয়দের নামে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে এপয়েন্টমেন্ট গ্রহণ করে কমিশন বা আর্থিক সুবিধা ভোগ করছেন। এটি সরাসরি স্বার্থসংঘাত (Conflict of Interest) এবং আর্থিক অনৈতিকতার শামিল।
৬। ইন্স্যুরেন্স খাতে কমিশনভিত্তিক অনিয়মের পেছনে ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভূমিকা
ইন্স্যুরেন্স খাতে দীর্ঘদিন ধরে যে কমিশনভিত্তিক অনিয়ম, বিকৃতি ও আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তার একটি বড় অংশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকার ফল।
ব্যাংকের ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যবহার করেই এই অনিয়ম দীর্ঘস্থায়ী রূপ পেয়েছে।
৭। ভুয়া/সন্দেহজনক ইন্স্যুরেন্স কভার
উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, একটি চক্র বড় কিছু গ্রাহকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইন্স্যুরেন্স পলিসি বা কভার নোট বিকল্প সার্ভারে ইস্যু করছে যে আইডিআরএ ডাটাবেসে লিপিবদ্ধ থাকে না। এ প্রেক্ষিতে আমাদের প্রস্তাব হলো-কোনো ইন্স্যুরেন্স পলিসি বা কভার নোট ব্যাংকে জমা দেওয়ার সময় ব্যাংক যেন নিজ দায়িত্বে কিউআর কোড স্ক্যান করে আইডিআরএ-এর (IDRA) সার্ভারের সাথে মিল যাচাই করে নেয়, যাতে ভুয়া বা অকার্যকর কভার গ্রহণের ঝুঁকি না থাকে।
৮. প্রিমিয়াম পরিশোধ নিশ্চিতকরণে প্রস্তাব
ইন্স্যুরেন্স কভার নোট বা পলিসির প্রিমিয়াম জমা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রস্তাব করা হচ্ছে-
লোন ডিসবার্স বা এলসি খোলার সময় ব্যাংক যেন সরাসরি গ্রাহকের হিসাব থেকে প্রিমিয়াম ডেবিট করে সংশ্লিষ্ট ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির হিসাবে ক্রেডিট করে। এতে ভুয়া কভার, প্রিমিয়াম অনাদায় ও পরবর্তী ক্লেইম জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।












