রুহিনা ফেরদৌস :
বলা হয়ে থাকে, কাউকে থামিয়ে দিতে হলে প্রথমে তার স্বপ্নটা কেড়ে নাও। মানুষ স্বপ্ন দেখে। আর সে মানুষটি যদি বয়সে তরুণ হয়, তাহলে তার স্বপ্নের সীমানা থাকে বহুদূর বিস্তৃত, প্রশস্ত; একই সঙ্গে সমৃদ্ধও। খুদে বিজ্ঞানী হিসেবে খ্যাত চট্টগ্রামের ছেলে তারিক আমিন চৌধুরী নয়বার রোবোটিকসে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন। চৌকস ও স্বপ্নবাজ এ কিশোরের স্বপ্ন, একদিন সে নাসায় কাজ করবে। নিজের স্বপ্নের পথ ধরে চলাও শুরু করেছে সে। বাংলাদেশী বিজ্ঞানী মাহমুদা সুলতানা যেমন নতুন নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে নাসার অন্য বিজ্ঞানীদের আগ্রহে পরিণত হয়েছেন, নাসার কাটিং এজ সাময়িকীতে প্রচ্ছদ হয়েছেন; তারিক আমিনও হয়তো একদিন সীমানা ছাড়িয়ে নতুন কোনো উচ্চতা ছুঁয়ে দেবে কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী মমন্থ মাসহাক মন্ময়ের মতো সর্বকনিষ্ঠ বাংলাদেশী গুগলার হিসেবে নাম লেখাবে। গুগলে কাজ করা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিইসি বিভাগের সাদিয়া নাহরিন ও সাকিব সাফায়েত কিংবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিন্দ্য মজুমদারদের সতীর্থ হিসেবে অচিরেই দেশবাসী দেখতে পারে তারিক আমিনও নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের বড় কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে সগৌরবে কাজ করেছে।
কিন্তু স্বপ্নের পথ ধরে তারিকের চলার প্রক্রিয়াটা মসৃণ হলো না। বলা যায়, মসৃণ হতে দেয়া হলো না। আমরা সবাই জানি, পরীক্ষার খাতায় টিক চিহ্ন দেয়ার কারণে তাকে বহিষ্কৃত হতে হয়েছে। তাকে নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখিও কম হচ্ছে না। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয়নি। এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি সে। আহত মনে দেশত্যাগের কথা ভাবছে তারিক। কিন্তু মনে মনে যে অভিমানটুকু নিয়ে সে যাবে, তা কীভাবে মুছবে। তার হাত থেকে পরীক্ষার খাতা কেড়ে নিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ার পীড়িত স্মৃতিটি সে কীভাবে ভুলবে। তারিক কি আর কখনো দেশে ফিরবে? আমরা কি তার ফেরার জায়গা করতে পারব?
দেশজুড়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের যে স্রোত বইছে, তার দায় কার? বারবার নয়, প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রসঙ্গে প্রশাসন হাজারবার ব্যর্থ। অসাধু চক্র, অর্থলোভী কিছু ব্যক্তির যোগসাজশে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সে উৎসব চলছে, তা তো একদিনে হয়নি। এ দুর্নীতি জন্মের শুরুতেই যদি রুখে দেয়া যেত, আঁতুরঘরেই যদি এ অসুখের চিকিৎসা করা হতো, তাহলে সারা শরীরে মরণব্যাধির মতো এ অসুখ ছড়িয়ে পড়ত না। অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের জন্য প্রশ্ন কিনতে ছুটতেন না। স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা অনৈতিকতার উদাহরণ হয়ে আমাদের সামনে হাজির হতেন না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ঘুণপোকা আছে, তা একে একে ক্ষয় করে চলেছে আমাদের নীতি-বোধ-নৈতিকতাকে। স্কুলে পাঠ্যবই থেকে শুরু করে সিলেবাস সব জায়গায় অসামঞ্জস্য, গাফিলতি, বোকামির উদাহরণ আমরা পেয়েছি।
একসময় বার্ষিক পরীক্ষা শেষে স্কুলে স্কুলে নতুন বই বিতরণের যেমন উৎসব লেগে যেত, এখনো তেমন হয়। এখনো নতুন বইয়ের জন্য আগ্রহের কমতি নেই কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে। কিন্তু বইয়ের ভেতরের পাতা উল্টিয়ে শিক্ষার্থীরা কী পাবে তা নিয়ে অস্বস্তি থাকে আমাদের। কোথাও ছাপার ভুল তো কোথাও লেখার। ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিভাবকের অস্বস্তি দূর হয় না। এমন পরিস্থিতি সামলে, চড়াই-উতরাই পেরিয়ে হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষার্থী যখন ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠে, প্রচলিত পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও নিজের সৃষ্টিশীলতা, পরিশ্রম আর মেধাকে কাজে লাগিয়ে বিস্ময় সৃষ্টি করে, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব ওই শিক্ষার্থীর দেখভাল করা। কিন্তু এখানেও রাষ্ট্র হিসেবে আমরা ব্যতিক্রম। আমরা আমাদের তরুণদের স্বপ্ন দেখাতে পারি না; বরং কেউ যদি স্বপ্ন দেখে, নিজের
মেধা-জ্ঞান-প্রজ্ঞাকে কাজে লাগায়, তাহলেও আমরা তার সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ। আমাদের প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের ক্ষমতা অসীম। আমরা মন্দের বিচার করতে পারি না; বরং সুন্দরের গলা টিপে ধরতে পারি। আমাদের শ্রদ্ধেয় ম্যাজিস্ট্রেট মহাশয় ক্ষমতাবলে যেকোনো ছাত্রকে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছাড়াই গলাধাক্কা দিয়ে পরীক্ষা হল থেকে বের করে দিতে পারেন, সে ছাত্রের অতীত রেকর্ড যতই ভালো হোক না কেন। তার কৃতিত্বের ঝুলি যতই ভারী হোক না কেন, কুচ পরোয়া নেহি ভঙ্গিতে তিনি তার সিদ্ধান্তে অটুট থাকতে পারেন।
এই তো কিছুদিন আগেও দেশের বড় সব পত্রিকার শিরোনামে জ্বলজ্বল করেছে তারিক আমিনের নাম। বিএমসি সুপার স্মার্ট বাল্ব আবিষ্কার করে রীতিমতো আলোচনা তৈরি করেছে সে। বাল্বে এমন কিছু সেন্সর লাগিয়েছে তারিক, যেগুলোর মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে নির্দিষ্ট অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে মোবাইলের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। বাল্বটি যে ঘরে লাগানো হবে, তার ১০ মিটার এলাকার মধ্যে কী ঘটছে, সেই তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে এ সেন্সর। ব্যবহারকারী এটি মোবাইলের স্ক্রিনে দেখতে পারবে। বাল্বে সংযুক্ত সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে ঘরে অপরিচিত কেউ ঢুকেছে কিনা তা যেমন দেখা যাবে, তেমনি ঘরের কোথাও আগুন ধরেছে কিনা কিংবা গ্যাস ছড়াচ্ছে কিনা, তাও দেখা যাবে। বাল্বে সেন্সর বসিয়ে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার আগে সে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় মাইন্ড ওয়েব ডিভাইসের সঙ্গে। মাইন্ড ওয়েব ডিভাইস মনের চিন্তাকে কাজে রূপান্তর করে। এ যন্ত্রটি তৈরির আগে ২০১৫ সালের দিকে দুই সতীর্থকে নিয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি রোবট উদ্ভাবন করে তারিক। রোবটটি নিয়ে সে সময় বেশ আলোচনাও হয়। রোবোটিকসের ডেভেলপিং নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠন রোবো ল্যাব বিডি, আলফা বাইটের সঙ্গে সংযুক্ত তারিক। ইউটিউবে নিজের চ্যানেল রয়েছে তার। অথচ খুদে এ বিজ্ঞানীকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় রসায়নের প্রশ্নপত্রে দাগ দেয়ার অপরাধে বহিষ্কৃত হতে হয়। তার জন্য এখন মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনো দুঃসাধ্য।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে দেখলাম হতাশার সুরে তারিক বলেছে, সেসহ তিনজন শিক্ষার্থীকে যখন পরীক্ষার হল থেকে বহিষ্কার করা হয়, তখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে। উঁচু পদবির কর্মকর্তারা সুপারিশ করেছে তাকে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ দিতে। কিন্তু পুনরায় পর্যবেক্ষণ করা হয়নি। তারিকের ভাষ্য, এত কিছুর পরও যেখানে কিছু হয়নি, সেই দেশে থাকতেও ইচ্ছে করছে না। তাই আগামীতে আমেরিকা অথবা কানাডায় চলে যাওয়ার কথা ভাবছে সে। তাছাড়া নিজের শিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চাকে এগিয়ে নিতে দেশের বাইরে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই তার সামনে। তাকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের নিচে অনলাইনে পাঠকদের মন্তব্যগুলোয় কেউ লিখেছেন, এ দেশে আগামী প্রজন্ম বলতে কিছু নেই। কেউ লিখেছেন, এটা স্রেফ ম্যাজিস্ট্রেটের দাম্ভিকতা। কেউ আবার অনুরোধ করে বলছেন, ‘তারিক, একজনের ওপর অভিমান করে তুমি দেশ ছেড়ে যেও না।’ হতাশার সুরে কেউ বলছেন, একটা স্বপ্ন নষ্ট হলো আর কি!
আমরা চাই অন্যায়ের বিচার হোক। প্রশ্নপত্র ফাঁসের দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা হোক, প্রশাসন কঠোর হোক, সরকারি কর্মকর্তারা আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে সক্ষম হোক। একই সঙ্গে প্রত্যাশা করি, অপরাধীদের প্রতিরোধে কোনো নিরপরাধ লোক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। বিশেষ করে সে যদি একজন শিক্ষার্থী হয়। প্রশ্নপত্রে দাগ দেয়ার জন্য পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করার আইন এখানে কোনোভাবেই কার্যকর হতে পারে না। প্রশাসনের উচিত প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া; শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও না হওয়া।
ভয় হয়, তারিক আমিন বাংলাদেশের চলমান শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতার একটি ভবিষ্যৎ উদাহরণ হয়ে থাকবে না তো? বর্তমান অবস্থায় এ দেশে সৃজনশীল মেধাবী শিক্ষার্থীরা কতটা নিরাপদ? এ নিরাপত্তাহীনতা কি আগামীতে আমাদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, পরীক্ষা পদ্ধতির ওপর আস্থাহীন করে তুলবে? আগাম আশঙ্কার পরিণতি হিসেবে তারা দেশ ছেড়ে ঠাঁই নেবে বিদেশ-বিভূঁইয়ে। তাদের মেধা, শ্রম, সামর্থ্য দিয়ে তারা একের পর এক সমৃদ্ধ করে যাবে বিদেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি, সংস্থাকে। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় কাজ করছেন আমাদের দেশের অনেক মেধাবী, কৃতিত্ববান ব্যক্তি। তাদের মেধাকে আমরা নিজেদের দেশে কাজে লাগাতে পারিনি। আমরা মেধা পাচার হয়ে যাওয়া নিয়ে হা-হুতাশ করি কিন্তু তাদের ধরে রাখার ক্ষেত্রে কার্যকর পরিবেশ কিংবা সুযোগ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হই। তেমনি প্রশাসনের ব্যর্থতা ঢাকতে তাদের প্রতিনিধিরা কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়া কারো কাছ থেকে ছোঁ মেরে তার স্বপ্নটা কেড়ে নিতে পারেন না। আমরা যারা তারিক আমিনকে নিয়ে কথা বলছি, তারা জানি মেধাবী এ ছেলেটি ঠিকই নিজের মেধা ও যোগ্যতার প্রমাণ দেবে। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁস নিয়ন্ত্রণের নামে আগামীতে তারিক আমিনের মতো অন্য কোনো শিক্ষার্থী যেন এমন পরিস্থিতির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে কথা বলতে হবে। ওই সময় পরীক্ষা কেন্দ্রে কর্তব্যরত শিক্ষকদের কথাও শুনতে হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধের ব্যর্থতার দায় কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের নয়।
সৌজন্যে : বণিক বার্তা












