
অর্থনীতির ৩০ দিন ডেস্ক :
দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াট। ২০৪১ সালের মধ্যে তা ৬০ হাজার মেগাওয়াটে তোলার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এজন্য স্থানীয় ও বিদেশী বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে বেশকিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুৎ খাত পরিচালনা করতে গিয়ে সরকারি কোম্পানিগুলোর দায়-দেনাও বেড়েছে। সব মিলিয়ে গত এক দশকে বিদ্যুৎ খাতের প্রকল্প বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো পরিচালনা করতে গিয়ে খাতটিতে মোট দায়-দেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি।
বিদ্যুৎ খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন কোম্পানিকে এখন এসব দায়-দেনার ভার বহন করতে হচ্ছে। বিদ্যুতের ক্রয়-বিক্রয় মূল্যের অসামঞ্জস্য ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার চার্জ পরিশোধ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। দিনে দিনে ঋণের বোঝা বাড়ছে সংস্থাটির। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ বিল বকেয়া পড়ে যাওয়ার পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক সামঞ্জস্যের অভাব বিতরণ কোম্পানিগুলোর আর্থিক ক্ষতি বাড়াচ্ছে। সরকারের কাছ থেকে নেয়া ঋণের ওপর ভর করতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। বিদ্যুৎ খাতের কার্যকর পরিকল্পনার অভাবই খাতটিকে দিনে দিনে আরো দায়গ্রস্ত করে তুলছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
দেশের বিদ্যুৎ খাতে মোট দায়-দেনার বৃহদাংশই তৈরি হয়েছে বিদেশী ঋণে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে গিয়ে। সরকারের কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দেনার পরিমাণ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য গৃহীত বিদেশী ঋণের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ খাতে রাষ্ট্রীয় মোট দায়-দেনার পরিমাণ ২ লাখ ১৮ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সরকারি বকেয়া পরিশোধ বাকি রয়েছে ৭৮ হাজার ৯১ কোটি টাকা। ১ লাখ ৪০ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকার দায় তৈরি হয়েছে বিদেশী ঋণে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে গিয়ে।
দেশে বিদ্যুৎ খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকায়। ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সিংহভাগ অর্থায়ন করেছে রাশিয়া। প্রকল্পে দেশটির দেয়া ঋণের পরিমাণ ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ প্রকল্পের প্রথম ইউনিট উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে। প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৭ সাল নাগাদ। বিদ্যুৎ খাতের অব্যবস্থাপনাগুলো নিয়ন্ত্রণে আনার আগেই এ ধরনের কেন্দ্র উৎপাদন এলে তা সার্বিকভাবে গোটা খাতেই আর্থিক দুরবস্থা বাড়িয়ে তুলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশী বিভিন্ন ব্যাংক ও সংস্থার কাছ থেকে নেয়া ঋণের ভিত্তিতে বর্তমানে দেশে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ চলছে। এর মধ্যে পটুয়াখালীর পায়রায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হয়েছে চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতার ভিত্তিতে। মোট ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে এ প্রকল্পে চীনের এক্সিম ব্যাংক ঋণ দিয়েছে ১৫ হাজার ৪৮ কোটি টাকা। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির দুটি ইউনিট এরই মধ্যে উৎপাদনে এসেছে। যদিও এখনই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারছে না বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।
সমান সক্ষমতার আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে বাগেরহাটের রামপালে। এজন্য ভারতের এক্সিম ব্যাংক ঋণ দিয়েছে ১০ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। বিদেশী ঋণে পটুয়াখালীতে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড ও নরিনকো। এ প্রকল্পে চীনা ঋণ ৭ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) শাহজিবাজার, শ্রীপুর, বিবিয়ানা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। এসব প্রকল্পে সংস্থাটির দেনা তৈরি রয়েছে ৩ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা। এছাড়া আশুগঞ্জ পাওয়ারে দুই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ২ হাজার ১০৮ কোটি টাকা, ঘোড়াশালে দুই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ২ হাজার ৯১৭ কোটি ও নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেডের (এনডব্লিউপিজিসিএল) দুই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ২ হাজার ৩৩১ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের তৃতীয় ইউনিট, কড্ডা, সৈয়দপুর, খুলনা ও ময়মনসিংহে পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বিদেশী ঋণ রয়েছে ৪ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো এসব ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সে দায়-দেনা মেটাতে হবে সরকারকেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করছে সরকার। এগুলোর আর্থিক সুফল পাওয়া না গেলে সার্বিক অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ভারসাম্য আনা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। খাতটিতে এখন চাহিদার তুলনায় সক্ষমতায় বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে না। এতে করে সরকারও খাতটিতে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারছে না।
বর্তমানে রূপপুর বাদে অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সরকারের নেয়া ঋণের মোট স্থিতি ৪৯ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা। প্রকল্পগুলোর অর্থায়নকালে গ্যারান্টার হিসেবে মুনাফার নিশ্চয়তা দিয়েছে সরকার। যদিও প্রকল্পগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
ঋণ নিয়ে করা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর আর্থিক সুবিধা না পেলে দেনার পরিমাণ বাড়বেই বলে মনে করছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর। খাতটিতে আর্থিক চাপ ও ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার ভারসাম্যহীনতা এবং বিদ্যুৎ ক্রয়-নির্মাণ চুক্তির সংস্কারহীনতাকে দায়ী করছেন তিনি।
তিনি বলেন, বিদ্যুতের উৎপাদন খাতকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে সঞ্চালন ও বিতরণ খাত ঝিমিয়ে পড়েছে। দেশের অনেক বিদ্যুৎ প্রকল্পে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে এসব প্রকল্প উৎপাদনে আসেনি। কিন্তু ঋণের কিস্তি, সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে সময়মতো। বিনিয়োগের আর্থিক সুবিধা না পাওয়া গেলে দেনা বাড়বে, এটিই স্বাভাবিক। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সরকারের বেশকিছু নীতি সংস্কার জরুরি।
সরকারের কাছে ভর্তুকি ও ঋণ বাবদ খাতসংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর দেনার (ডিএসএল বকেয়া) পরিমাণ দিন দিন বেড়ে চলেছে। গত বছরের জুন পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতের ১১ কোম্পানির ডিএসএল বকেয়ার পরিমাণ ৭৮ হাজার ৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বকেয়া বিপিডিবির। বিশেষ করে বেশি মূল্যে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতার চার্জ ও জ্বালানি খরচ পরিশোধ গিয়ে আর্থিক চাপে পড়েছে সংস্থাটি। বিদ্যুৎ খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে সরকারের কাছে বিপিডিবির বকেয়ার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।
সরকারকে দায়গ্রস্ত করে তোলার ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ খাতে দক্ষতার অভাবকে বড় একটি অনুঘটক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ খাতে দক্ষতা দেখানো না গেলে নানা ধরনের খরচ বাড়বে। এতে করে খাতটিতে ঋণের বোঝাও বেড়ে যাবে। সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতেই এর চাপ সৃষ্টি হবে। বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে এমন লক্ষ্যকে সামনে রেখে সক্ষমতা বাড়ানো হলেও আশানুরূপ ব্যবহার বাড়ানো যায়নি। যে কারণে এ খাতের লোকসান বাড়ছে। ঋণের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যুৎ খাতের দক্ষতাও বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের জুন পর্যন্ত সরকারের কাছে বিপিডিবির বকেয়ার পরিমাণ ৫৯ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এছাড়া বিদ্যুতের বিতরণ কোম্পানি পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ৪ হাজার ৩১ কোটি, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) ৩ হাজার ৩১৭ কোটি, রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিসিএল) ৮৫ কোটি, সঞ্চালন খাতে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) ৬ হাজার ৯৬২ কোটি, ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) ১ হাজার ৩১১ কোটি, ইলেক্ট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশের (ইজিসিবি) ১ হাজার ২৭০ কোটি, আশুগঞ্জ পাওয়ারের ৬৪২ কোটি, নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশের (এনডব্লিউপিজিসিএল) ২৭৯ কোটি, কয়লাবিদ্যুৎ উৎপাদন সংস্থার ২৪৪ কোটি, নর্দান ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (নেসকো) ৩ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিদ্যুতের প্রাপ্যতা বিবেচনায় এ খাতে যে বিনিয়োগ হয়েছে, সেটি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এখন আমাদের বিদ্যুতের অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এখন এ বিনিয়োগ সঞ্চালন ও বিতরণ খাতে সম্প্রসারণ হওয়া দরকার। তাতে বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্নতা তৈরি করা গেলে ব্যবহার বাড়বে। ঋণনির্ভর বাড়তি এ বিনিয়োগে আবার আরেক ধরনের ব্যয়ও তৈরি হচ্ছে। যেমন বিদ্যুতের অতিরিক্ত সক্ষমতা বাড়ায় বিপিডিবিকে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি বিপিডিবিকেও চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
বিদ্যুৎ খাতে সুপরিকল্পিতভাবেই বিনিয়োগ করা হয়েছে উল্লেখ করে খাতসংশ্লিষ্ট সরকারি নীতিগবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ হয়েছে আগামীর অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে। দেশে শিল্পপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে, সেখানে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়বে। ফলে এ খাতে অর্থনৈতিক কার্যক্রমও গতি পাবে। ফলে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ হয়েছে সুপরিকল্পিত। বর্তমানে এ বিনিয়োগকে আমরা দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি। আমরা এখন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি।
সুত্র : বনিকবার্তা












