সরকারের ১২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকিসহ বছরে ২৬ হাজার কোটি টাকা পাচার!
খোন্দকার জিল্লুর রহমান –
সরকার বহুদিন থেকে দেশীয় কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও বেকারত্ত্ব দুরিকরনের কথা বলে আসলেও বর্তমানে এর যুগপোযুগি কোন ফলাফল লক্ষ করা যায় বলে মনে হয়না। সর্বগ্রাসী দুর্নীতি বাংলাদেশের প্রায় সকল খাতের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বৈশ্বয়ীক মন্দাসহ বিভিন্ন কারনে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতে কর্ম সংস্থানের ক্ষেত্র অনেকটা সংকুচিত হয়ে আসায় আমাদের অনেক কর্মক্ষম, শিক্ষীত ও দক্ষ জনশক্তির অনেকটাই দেশে ফিরে আসছে। তার উপর একদিকে দেশীয় চাকুরিসহ কর্মসংস্থান ব্যাবসা বানিজ্যের উন্নয়ন না হওয়ার কারনে কর্মক্ষেত্র সেভাবে তৈরি না হওয়ার কারনে যে হারে বেকার সমস্যা বাড়ছে অপরদিকে শিক্ষার হার বাড়ার কারনে চাকুরি না পাওয়া শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন খুব দ্রুতগতিতে বেড়ে চলেছে। এমতাবস্থায় দেশে বেকারত্ব রেখে বৈধ-অবৈধভাবে বিদেশিদের কর্মসংস্থান একটা মধ্যম আয়ের দেশ থেকে ঊন্নত দেশ গড়ার ক্ষেত্রে কতটুকু যুক্তিযুক্ত, রাষ্ট্রের সরকারি কর্মকর্তাসহ দায়িত্ত্বশীল ব্যাক্তিরা একবারও কি ভেবে দেখেছেন?
বাংলাদেশে বৈধ ও অবৈধভাবে কর্মরত বিদেশি কর্মীর প্রকৃত সংখ্যা ও পাচার করা অর্থের পরিমাণ নিয়ে নির্ভরযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক কোনো তথ্য না থাকলেও গবেষণার সার্বিক পর্যবেক্ষণে অর্থ পাচার ও রাজস্ব ক্ষতির পরিমাপের যে চিত্র উঠে এসেছে তা উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে বৈধভাবে বিদেশি কর্মী আনা হলে আটটি ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। অন্যদিকে অবৈধভাবে বিদেশি কর্মী আনা হলে তিন ধাপেই নিয়োগ চক্র শেষ হয়ে যায়। কোনো প্রতিষ্ঠানে বিদেশি কর্মী নিয়োগ দিতে হলে নিয়মবহির্ভূতভাবে জনপ্রতি ২৩ থেকে ৩৪ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে পর্যটক ভিসায় আসা লোককে নিয়োগ দেওয়া হয়। সম্প্রতি সরকারি- বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীদের সাক্ষাৎকার এবং আইনি নথি-নীতিমালা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য, গবেষণা প্রতিবেদন ও গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে এসকল তথ্য বেরিয়ে আসে। গবেষণার তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কর্মীর ন্যূনতম সংখ্যা ধরা হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ। যার মাধ্যমে বছরে সরকারের ১২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারানোসহ নুন্যতম ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা পাচার করেন। দেশিয় জনশক্তি কাজে না লাগিয়ে বিদেশি কর্মীদের বৈধ-অবৈধভাবে নিয়োগের মাধ্যমে বেতন-ভাতার নামে প্রতি বছর দেশহতে ২৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হওয়া দেশিয় কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির জন্য অশনি সঙ্কেত।
কর্মানুমতি না নিয়ে পর্যটক ভিসায় এসে বাংলাদেশে কাজ করেন প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার কর্মী। তারা কোনো ধরনের কর না দিয়েই অর্থ নিয়ে চলে যান। এসব বিদেশি কর্মী প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেন। আবার কর্মানুমতি থাকা কর্মীরাও নানা পন্থায় অবৈধভাবে নিজ দেশে অর্থ নিয়ে যান, এভাবেই পাচার হচ্ছে দেশের অর্থ। সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের(টিআইবি) কর্মসূচি ব্যবস্থাপক মনজুর ই খোদা প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে বিদেশিদের কর্মসংস্থান, সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণায়ও এসব তথ্য জানানো হয়েছে। ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ গবেষণা করা হয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনটি রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তুলে ধরেন, অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ নির্বাহী ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের এবং পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান প্রমুখ।
বাংলাদেশে কর্মরত বৈধ বিদেশি কর্মচারির হিসাব নিয়ে সরকারি সংস্থার মধ্যে সঠিক কোন মিল খুজে
পাওয়া যায় না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া তথ্যে দেশে বিদেশি কর্মীর সংখ্যা ৮৫ হাজার ৪৮৬ জন বললেও ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতরের হিসাবে কর্মোপযোগী ভিসার সংখ্যা ৩৩ হাজার ৪০৫। তিন সংস্থা (বিডা, বেপজা ও এনজিও ব্যুরো) এর দেওয়া বৈধ কর্মানুমতির সংখ্যা ১১ হাজার ১৮০। বাংলাদেশে বিদেশি কর্মী নিয়োগের সঠিক কোন নীতিমালা ও দায়িত্ব প্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ না থাকার কারনে বিদেশি কর্মী নিয়ন্ত্রণে নিয়োগকারি সংস্থাও নিয়ন্ত্রন সংস্থার মধ্যে কোন মিল খুজে পাওয়া যায় না।
পর্যটন করপোরেশনের এক জরিপে দেখা যায় ওই বছর ৮ লাখ পর্যটক ভিসা নিয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বা ৪ লাখ ভিসা অবৈধভাবে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন যদিও পর্যটক ভিসায় কাজ করা নিষিদ্ধ। পর্যটক ভিসার মেয়াদ সর্বোচ্চ তিন মাস হলেও তিন মাস পরপর দেশে গিয়ে একই নিয়মে ভিসা নিয়ে আবার আসেন। অর্থাৎ পুন: পুন: ভিসার হিসাবে পর্যটক ভিসায় প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি (৪ লাখ/২.৫)অবৈধ বিদেশিসহ বৈধ বিদেশি কর্মী প্রায় ৯০ হাজার যোগ করে মোট বিদেশি কর্মীর সংখ্যা নুন্যতম আড়াই লাখ ধরা হয়েছে। প্রতিমাসে জনপ্রতি দেড় হাজার ডলার ধরা হলেও বিদেশি কর্মীদের মোট বার্ষিক আয় ৪৫০ কোটি ডলার। এ থেকে ৩০ ভাগ স্থানীয় ব্যয় বাদ দিলে মোট পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩১৫ কোটি ডলার, যা দেশিয় মুদ্রায় ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। বিদেশিদের ৩০ শতাংশ করহার ধরে নুন্যতম রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ দাড়ায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা অর্থ্যাৎ ডলারে ১৩৫ কোটি ডলার সমতুল্য যা আমাদের মধ্যম আয়ের দেশ হতে উন্নত দেশে অগ্রসর হওয়ার পথে আর্থীক খাতে বিরাট ধাক্কা বলে মনে হয়।
বাংলাদেশে প্রায় ৪৪টি দেশ থেকে আসা বিদেশি কর্মীরা বিভিন্ন খাতে কর্মরত আছে। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভারতীয় নাগরিক, দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চীন, ক্রমান্ময়ে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক, নরওয়ে ও নাইজেরিয়া। সরকারিসেবা খাতে ওয়ানস্টপ সার্ভিস না থাকার কারনে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া কাজ করছেন। এসব বিদেশি কর্মীদের ভিসার সুপারিশপত্র, নিরাপত্তা ছাড়, ওয়ার্ক পারমিট ও ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধিসংক্রান্ত সঠিক নীতিমালা না থাকার কারনে তাদের সঠিক বেতন কত তা জানান না। সরকারের সদিচ্ছার অভাবে দেশে বৈধ-অবৈধ বিদেশি কর্মীদের মোটসংখ্যা, ন্যূনতম বেতনসীমার সঠিক তথ্যাদি হালনাগাদ, ভ্রমন ভিসায় নিয়োগ না দেয়ার তথ্যানুসন্ধানে বিভিন্ন অফিস/কারখানায় এনবিআর, বিডা, এসবি এবং ডিবি এর সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে অভিযান চালিয়ে, স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিতের অভাব রয়েছে। সরকারের এসব মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা তাদের অফিসের কিছু কর্মচারি ও দালালদের জোগসাজসে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে কাজ করছেন, ভিসার মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে, বৈধ-অবৈধ বিদেশি নাগরিকের বেতনের সঠিক তথ্যসহ যারা রিটার্ন দিচ্ছেন, তারা সঠিক ভাবে দিচ্ছেন কিনা তা গোপন করা হচ্ছে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে কর অঞ্চল ১১- তে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন সাড়ে ৯ হাজার বিদেশি, যাদের বার্ষিক আয় ৬০৩ কোটি টাকা। তাতে কর পাওয়া গেছে ১৮১ কোটি টাকা। তৈরি পোশাক খাতে কর্মরত বিদেশিদের আয়ের হিসাবে দেখাগেছে একটি প্রতিষ্ঠানের বিদেশি প্রধান নির্বাহীর মাসিক বেতন ১০ থেকে ১২ হাজার মার্কিন ডলার। কিন্তু দেখানো হয়েছে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার ডলার। আর একজন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারের মাসিক বেতন ৩-৬ হাজার ডলার হলেও দেখানো হয় ১-২ হাজার ডলার। এভাবে অবৈধ কর্মসংস্থান, বেতন-ভাতা কম দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া, বিদেশে অর্থ পাচার, দেশের এক শ্রেণীর দায়ীত্বশীল লোকের দায়ীত্ত্বহীনতা,দেশপ্রেমের অভাব ও অনৈতিক কর্মকান্ডের প্রমান ছাড়া কিছুই নয় বলে প্রমানিত হয়।
টিআইবি সহ বিভিন্ন সংস্থার জরিপে যে তথ্য পাওয়া গিয়েছে তাতে দেখ াযায়, বাংলাদেশে বৈধ প্রক্রিয়ায়
বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার কিছু অনিয়ম পেয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পদে
যোগ্য দেশি কর্মী না খোঁজে নিয়ম রক্ষার তাগিদে নামেমাত্র বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিক ভাবে সারা হয়। এসব কর্মী নিয়োগে ভিসার সুপারিশপত্রের জন্য ৫-৭ হাজার টাকা অবৈধ লেনদেন হয়। বিদেশে বাংলাদেশ মিশন থেকে ভিসা নিতে ৪ থেকে সাড়ে ৮ হাজার, কাজের অনুমতি নিতে ৫-৭ হাজার, পুলিশের বিশেষ শাখার ছাড়পত্র পেতে ৫-৭ হাজার, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) ছাড়পত্রের জন্য ৩-৫ হাজার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ছাড়ের জন্য ২-৩ হাজার ও ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য ৩-৫ হাজার টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে দিতে হয়।
দেশের বেকারত্ব দুর করা, বহুমুখি কর্মসংস্থান, দ্রুত শিল্পোউন্নয়ন, রাজস্ব আয়ের লক্ষমাত্রা অর্জনসহ জীবনমান উন্নয়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষনা অনুযায়ী ভীষন ২০২০ থেকে ২০৪১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ থেকে ঊন্নত দেশ গড়ার যে মহাপরিকল্পনা সেটিকে এক শ্রেণীর কিছু দুর্নীতিবাজ লোক লেজুড় বিত্তির মাধ্যমে সরকারের ভিতর আরেক অদৃশ্য সরকার তৈরি করে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কৌশলে প্রশাসনের দুর্বল স্থানগুলিকে কাজে লাগিয়ে সরকারের বহুমুখি ঊন্নয়নকে ম্লান করে দিয়ে রাজস্ব ফাঁকি, দুর্নীতি, অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অপকর্মের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মস্বাদ করে নিজেকে আঙ্গুলফুলে কলাগাছ বানিয়েছেন।
মুজিব বর্ষে জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু কণ্যা মাননিয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন সফল রাষ্ট্র নায়ক হিসাবে কোন রকম লেজুড়বিত্তি এবং ভয় ভীতির তোয়াক্কা না করে সরকারের ভিতর ঘাপটি মেরে থাকা নাটের গুরুদের আইন ও বিচারের আওতায় এনে শাস্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দেশীয় কর্মসংস্থানসহ ঊন্নয়ন অবকাঠামো ঠিক রেখে বিশ্বায়নের ক্ষেত্রে দেশকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবেন বলে দেশের সতের কোটি মানুষের বিশ্বাষ।
লেখক: সম্পাদক প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন ও মানবাধিকার কর্মী।











