“বিচ্ছেদ”

খোন্দকার তাজরি রহমান :
Divorce (বিচ্ছেদ) – বিষয়টা শুনলেই কেন যেন মানুষ একটু আড়ঁচোখে তাকায়, হোক সে নারী অথবা পুরুষ। আমরা সভ্য সমাজ কেন যেন মনে করি ডিভোর্স একটি খারাপ বিষয় এবং যার সাথে হয় সে ব্যক্তিটিও নিশ্চয়ই খারাপ।
আসলে আমাদের সমাজে ডিভোর্স কনসেপ্টটা তেমনভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি এখনো। ডিভোর্স একটা ভালো সম্পর্ককে যেমন খারাপ করতে পারে, তেমনি একটা খারাপ সম্পর্ক থেকে একটা ভালো সম্পকের্র সূচনাও করতে পারে। জীবনের নেওয়া সকল সিদ্ধান্তই যে সঠিক তা কখনোই বলা সম্ভব নয়। জীবনে চলার পথে বাধা আসবেই। আর সেই বাধাকে যদি সভ্য সমাজের আড়ঁচোখের ভয়ে মুখ বুঝে সহ্য করা হয়, তবে কোথায় যেন জীবনের মূল্য হারিয়ে যায়।
আমরা সব সময় ডিভোর্সের ক্ষেত্রে নারীকে দোষারোপ করে থাকি। কেন যেন মনে করি যে নারীদের দোষের কারণেই একটা সংসারে ডিভোর্স হয়ে থাকে। আমাদের সমাজের কিছু তথাকথিত মানুষ আছেন যারা মনে করেন যে, যা কিছু ঘটুক না কেন সব কিছুর মূলে নারীরই দোষ থাকে এবং সমাজের যে মানুষগুলো এ কথাগুলো বলে থাকে তাদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী থাকেন। একজন নারী আরেকজন নারীকে কিছু বলার সময় একটিবারও চিন্তা করে না যে সে নিজেও একজন নারী। আসলেই কি সকল দোষ নারীরই থাকে। আমাদের সমাজের সেসব তথাকথিত মানুষগুলো আসলে কেন যেন নারীদেরকে মেনে নিতে পারেন না। অথচ তাদের জীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে নারীর উপস্থিতিটাই অনেক বেশি। আমরা যখনই ডিভোর্স কনসেপ্টটা শুনি কেন যেন অজান্তেই বলে বসি যে নিশ্চয়ই এখানে নারীরই দোষ আছে। কিন্তু না সব ক্ষেত্রে আসলে নারীর দোষ হয়ে থাকে না। একটা সুন্দর সংসার গঠন করতে যেমন নারী এবং পুরুষ উভয়ের প্রয়োজন, তেমনি একটা ডিভোর্র্র্সের ক্ষেত্রেও নারী-পুরুষ উভয়েরই দোষ থাকে। কখনো নারীর, কখনো বা পুরুষের।
আমাদের মধ্যে ডিভোর্স সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা কাজ করে, যেমন – অনেক সময় অনেকে মনে করেন যত-যাই হোক না কেন ডিভোর্স দেওয়া যাবে না। ডিভোর্স সম্পর্কে আমাদরে ধর্ম কি বলে, ধর্মকি ডিভোর্সের ব্যাপারে উৎসাহিত করে? না… ডিভোর্সকে আমাদের ধর্ম উৎসাহিত করে না আবার নিরুউৎসাহিত বা হারামও করে নাই। আমাদের ধর্মে ডিভোর্সকে একটি সমাধানের পথ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র আল কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বয়ং সূরা আত তালাক নাযিল করেছেন। সেই সাথে অসংখ্য হাদিসের ব্যাখ্যা দিয়ে গিয়েছেন আমাদের নবী রসূলগন। যেমন, ইব্রাহিম (আঃ) এর হুকুমে ইসমাইল(আঃ)এর ডিভোর্স, ওমর(রাঃ) একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে সে তার ছেলেকে ডিভোর্স দিতে বলেছে, সেই সাথে অনেক সাহাবাদের মধ্যেও ডিভোর্স হয়েছে। আমাদের ধর্মে ডিভোর্স কে প্রয়োজন মতে প্রয়োজনীয় করা হয়েছে। যখন সময়কালে আর কোনভাবেই সম্পর্কের বন্ধন বেঁধে রাখা যায় না তখন ডিভোর্সের হুকুম দেওয়া হয়েছে।
আমাদের মধ্যে একটা Norm কাজ করে যে- মেনে নিতে হবে, সহ্য করতে হবে, দেখেও না দেখার মত চলতে হবে বা ধৈর্য ধারণ করতে হবে। নিশ্চয়ই আমাদের ধর্ম বারবার বলেছেন ধৈর্য ধারণ কর, তোমরা ধৈর্যের সাথে তোমাদের একে অপরের প্রতি নমনীয় হও, তোমরা আল্লহর সন্তুষ্টি ও রহমতের মাধ্যমে ভালোবাসা ও সমঝোতা দ্বারা স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র সম্পর্ককে সমন্বয় কর। কিন্তু আল্লহ রাব্বুল আলামীন এও বলেছেন, তোমরা নিজেকে কষ্ট দিও না কারন তোমরা নিজেদের কষ্ট দেওয়া অর্থ আমাকে কষ্ট দেওয়া।

Fake it until you make it – সব সময় আসলে Fake ভেবে চলা যায় না আবার কিছু বলতে গিয়ে না বলা বা সবকিছু দেখেও না দেখার মতো থাকা যায় না। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, কলিগস্ বা প্রতিবেশীরা কি বলবে ভেবে এই Fake ভাব নিয়ে কোন কিছু Make করা যায় না। কারণ নিজেদের ভেতরে ভেতরে ফ্রাস্টেশন আমাদেরকে স্লো-পয়জনের মত অবসাদ করে তোলে।
বর্তমান সময়ে এত বিবাহ বিচ্ছেদ এর কারণ কি? আমরা কি কোন ট্রেন্ড ফলো করছি নাকি যথোপযুক্ত কারণের জন্য করছি। আসলে কথাটি এভাবে বলা উচিত যে, বিয়ে আসলে টিকবে কেন।আমরা বর্তমান সময়ে আধুনিকতার নামে আমাদের স্থায়ী নীতি নৈতিকতা মূল্যবোধ সব বিলিন করে ফেলছি। বর্তমান আধুনিকায়নের সহজলভ্যতা আমাদের সক্ষমতাকে অক্ষমতায় পরিণত করছে। অল্পতেই আমরা হাপিয়ে উঠছি। অল্পতেই সে টক্সিক-ওকে বাদ দিয়ে দাও… ও Unbearable, সহ্য করা যাচ্ছে না- বাদ দিয়ে দাও…, একা থাকো, ঘুরো-ফিরো Enjoy করো। কেন নিজেকে বন্দী করে রাখবা ? You are capable of doing what you want and like to do. এই যে বাদ দিয়ে দাও কনসেপ্টাকে আমরা আমাদের মস্তিকে এমন ভাবে স্থাপন করেছি যে জীবনের একটি পর্যায়ে রিগ্রেট করা ছাড়া সে সময়ে গিয়ে ঠিক করার কোন উপায় থাকে না।
কতটুকু ধৈর্য ধারণ করব বা কখন ডিভোর্স একটা সমাধান হতে পারে এ প্রশ্নে প্রথমত যখন আপনি লক্ষ্য করবেন আপনার হাজবেন্ড বা ওয়াইফ বারবার একাধিক পরকীয়ায় লিপ্ত, দ্বিতীয়ত যখন আপনাদের মধ্যে Verbal এবং Physical অ্যাবিউজ হচ্ছে বা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে, এবং তৃতীয় যখন আপনার পার্টনারের মধ্যে অসম্ভব রকমের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা থাকবে যেমন কোন কিছুর প্রতি কোন গুরুত্ব না থাকা ইত্যাদি…। তখন আপনাকে ডিভোর্সের চিন্তা করতে হবে। আপনার অ্যাবিউজের সময়ে নেওয়া ডিভোর্স এর সিদ্ধান্ত, আপনার বয়স যখন পঞ্চাশ পার হয়ে যাবে তখন যেয়ে নেওয়া থেকে যথেষ্ট হবে। যার জন্য সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত একটা সঠিক সমাধান হতে পারে।
প্রত্যেক ক্রিয়ারই প্রতিক্রিয়া আছে; তেমনি ডিভোর্সেরও ভালো এবং খারাপ আছে। কখন ডিভোর্সকে আমরা ভালো বলে গ্রহণ করব – যখন আমরা পেছনে কোন যথোপযুক্ত কারণ দেখবো, আর খারাপ তখনই যখন তা কোন রংতামাশার, ট্রেন্ড বা Desparacy-র কারণে হয়ে থাকে। তবুও এটাই বলব, “দিনশেষে সবটুকু মূল্যবোধ নিজেকেই তৈরি করে নিতে হবে।”

লেখক : ছাত্রী, এলএলবি সম্মান, ষ্টেট ইউনিভার্সিটি, ধানমন্ডি,ঢাকা।