দারিদ্র্য আর মন্থর প্রবৃদ্ধিতে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ রুশ অর্থনীতির

৩০ দিন ডেস্ক :
সেন্ট পিটার্সবার্গের এক মেট্রো স্টেশনের বাইরে ঘরে সংরক্ষিত টমেটো ও বেগুন বিক্রি করেন ৭০ বছর বয়সী ইরিনা সেমেয়োনোভা। অবসরভাতা পেলেও জীবনধারণের জন্য যথেষ্ট না হওয়ায় এ কাজ বেছে নিয়েছেন তিনি। মাসে ১২ হাজার রুবল (প্রায় ২১১ ডলার) পেনশন ভাতা পান ইরিনা। বিভিন্ন বিল পরিশোধ আর ওষুধ কেনার পর মাত্র ৪ হাজার রুবল (৭০ ডলার) তার হাতে থাকে। কিন্তু সেন্ট পিটার্সবার্গের মতো ব্যয়বহুল শহরে মাত্র ৪ হাজার রুবলে জীবনযাপন অত্যন্ত কষ্টকর বলে অনুযোগ করেন ইরিনা।
বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিগুলোর অন্যতম রাশিয়ার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এমনটা দাঁড়িয়েছে। দেশটির অধিকাংশ জনগণই দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন বিকল্প খুঁজে নিচ্ছে। এ মুহূর্তে ইরিনার বেঁচে থাকার রসদ জোগাচ্ছে সাবেক সাম্রাজ্যের রাজধানীর বাইরে তার গ্রামের বাড়ি। সেখানেই বাগানে সবজি চাষ করেন তিনি। ইরিনা জানান, গ্রীষ্মে গ্রামে চলে যান, সেখানে তার একটি সবজির ক্ষেত রয়েছে। এ ক্ষেতের ফলসই বিক্রি করেন তিনি আর এগুলোই তাকে টিকে থাকতে সাহায্য করছে।
তবে রাশিয়ার অবস্থা বছর পাঁচেক আগেও এত খারাপ ছিল না। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রথম দুই মেয়াদে (২০০০-০৮) রাশিয়া একটি মাঝারি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে গেছে। নব্বইয়ের দশকের আর্থিক অস্থিতিশীলতার পর এ প্রবৃদ্ধি ব্যক্তিগত আয়কে শক্তিশালী করেছে।
২০১২ সালে তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতা গ্রহণ করেন পুতিন। তবে এ মেয়াদে সাধারণ জনগণের জীবনমানের পতন ঘটতে দেখা যায়। ২০১৪ সালে ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রাইমিয়া দখলের পর মস্কোর ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও পরবর্তীতে ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দরপতন রাশিয়ার অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পরবর্তীতে চার বছর ধরে রাশিয়ার ক্রয়ক্ষমতাও ক্রমে হ্রাস পেয়েছে।
এদিকে রাশিয়ার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বদলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা নিয়েছেন পুতিন। আগামীকাল দেশটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচনেও তার জয় এক রকম সুনিশ্চিত বলে ধরে হচ্ছে।
২০১২ সালে রাশিয়ার দারিদ্র্যসীমা ২০০০ সালের ২৯ শতাংশ থেকে কমে ১০ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৬ সালে তা আবার বেড়ে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে গিয়ে পৌঁছে। দেশটির সর্বশেষ বার্ষিক সরকারি পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে। নভেম্বরে বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার মোট জনসংখ্যার ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশ দারিদ্র্য থেকে সুরক্ষিত রয়েছে। ২০১৪ সালে এ হার ছিল তার চেয়ে ১০ শতাংশ কম।
রাশিয়ার প্রদেশগুলোয় পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। সেখানে জনগণকে অত্যন্ত নিম্ন মজুরিতে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। প্রায়ই তরুণ পরিবারগুলোকে অবসরপ্রাপ্তদের সামান্য অবসর ভাতার সহায়তা নিতে হচ্ছে।
মস্কোর দক্ষিণ-পশ্চিমের কালুগা অঞ্চলের মালোয়ারোসøাভেৎস শহরে থাকেন অবসরপ্রাপ্ত মেকানিক ভায়াচেসøাভ। পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দামের কারণে কিছুই কেনা যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।
পার্শ্ববর্তী ইয়েনস্কোয়ে গ্রামে বাস করেন ৪৭ বছর বয়সী তাতিয়ানা কুজেেনসাভা। অবসরের কয়েক বছর বাকি থাকলেও তিনি জানেন তার মাসিক অবসর ভাতা ১০০ ইউরোরও (১২৩ দশমিক ৩৪ ডলার) কম হবে। অথচ শৈশব থেকেই হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করছেন, বর্তমানে মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ খামারে রয়েছেন তিনি। এখানে কাজ করে নিজের পুরনো গাড়িটি বদলানোর মতোও যথেষ্ট অর্থ সঞ্চয় করতে পারেননি।
ক্রেডিট সুইস ব্যাংকের এক সমীক্ষা অনুসারে, রাশিয়ার ১০ শতাংশ ধনী মোট সম্পদের ৭৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে, যা দেশটিকে উন্নত দেশগুলোর বৈষম্যের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি রেখেছে। ম্যাক্রো অ্যাডভাইজরি কনসালট্যান্সির ক্রিস ওয়েফার বলেন, ২০০০ ও ২০১৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে সরকারকে অর্থনীতি নিয়ে ততটা মাথা ঘামাতে হয়নি। বার্ষিক তেলসম্পদ বৃদ্ধির সঙ্গে নিষ্পত্তিযোগ্য আয়ের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ও সহজলভ্য ঋণ মিলে দেশটির অর্থনীতিকে সরকারের প্রায় কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই চালিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু জ্বালানি সম্পদের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিটিকে পথের শেষে এসে দাঁড়াতে হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে গত বছর রুশ অর্থনীতি পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী হলেও মধ্যমেয়াদি প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস ১ বা ২ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়নি, যা চলতি শতকের প্রথম দিকের সাফল্য থেকে বহু দূরে রয়েছে। ওয়েফার বলেন, জনগণের জীবনমান উন্নয়ন বা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদির তহবিল জোগানোর জন্য এটা যথেষ্ট নয়।
দারিদ্র্য আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখলেও তা পুতিনের জনপ্রিয়তায় বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং পার্লামেন্টের শেষ ভাষণে অধিকাংশ সময় ধরে দারিদ্র্য নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। নির্বাচনের আগে এ ভাষণে আগামী ছয় বছরের মধ্যে দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নামিয়ে আনা এবং প্রবৃদ্ধি জোরালো করে ৪ শতাংশে নেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।
এদিকে অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও আবাসনে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিলেও এ অর্থ কোত্থেকে আসবে, সে বিষয়ে বিশদ কিছু জানাননি এবং জনসংখ্যার মতো দেশের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করবেন এমন কোনো ভবিষ্যৎ সংস্কারের উল্লেখ করেননি।
চারপাশের নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকায় আগামী সরকারকে বাজেট স্থিতিশীল করার দিকে মনোযোগী হতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সূত্র : এএফপি