“শেষ পর্যন্ত রেহাই হলনা ফারইস্ট লাইফের সাবেক মুখ্য নির্বাহী হেমায়েত উল্লাহর”

খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
অবশেষে রেহাই হলনা ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হেমায়েত উল্লাহর। গ্রেফতার তাকে হতেই হল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। আজ সোমবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ বিকেলে পদ্মা ইসলামী লাইফের কার্যালয় থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয় বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
শাহবাগ থানায় দায়েরকৃত ৮শ’ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও সাবেক দুই পরিচালক এম এ খালেক ও তার ছেলে রুবাইয়াত খালেককে গ্রেফতার করে আইন-শৃংখলা বাহিনী। এই মামলার ১০ নং এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন হেমায়েত উল্লাহ।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর মো. নজরুল ইসলাম, এম এ খালেক ও রুবাইয়াত খালেককে আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত নজরুল ইসলামকে ২ দিনের রিমান্ড ও এম এ খালেক ও রুবাইয়াত খালেককে জেলে গেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেয় ।
এদিকে আজ সোমবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ আদালত এম এ খালেক ও রুবাইয়াত খালেককে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদের আদালতে তাদের হাজির করে পুলিশ। এরপর শাহবাগ থানায় করা মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তা তাদের ১৫ দিনের রিমান্ডের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুনানি শেষে আদালতের বিচারক তাদের প্রত্যেকের ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ইতিপুর্বে দ্বিতীয় দফায় একদিনের রিমান্ড শেষে রোববার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলামকে আদালতে হাজির করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহীনি। পরবর্তিতে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাকে পুনরায় ১২ দিনের রিমান্ডের আবেদন করলে শুনানি শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল ইসলামের আদালত তার ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
উল্লখ্য যে গত ১৬ সেপ্টেম্বর তার একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন এবং একইদিন মামলার আসামি কোম্পানিটির সাবেক পরিচালক এম এ খালেক এবং তার ছেলে রুবাইয়াত খালেককে আদালতে হাজির করে তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাদের ১৫ দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন ।
আসামির পক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করলে উভয়পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে দু’দিন জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন।
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বীমা গ্রাহকদের খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে অবৈধভাবে গ্রাহকদের জমাকৃত ৮শ’ কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগে সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে শাহবাগ থানায় করা উল্লেখিত মামলা নং ১৫(৯)২২ দায়ের করা হয়। উক্ত মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহীনি। সম্প্রতি ফারইস্ট ইসলামী বিশ্ববিদ্যলয়ের অপর এক মামলায় এম এ খালেক গ্রেপ্তার হলেও পরবর্তিতে জামিনে বেরিয়ে আসেন।
চলতি বছরের ৮ মার্চ ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ও সাবেক পরিচালক এম এ খালেকসহ কোম্পানিটির ৯ পরিচালক-কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পৃথক পৃথক দু’টি মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আসামীরা হলেন, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম, সাবেক পরিচালক কে এম খালেদ, অডিট কমিটির চেয়ারম্যান শাহরিয়ার খালেদ, পরিচালক এম এ খালেক, পরিচালক মো. মিজানুর রহমান, পরিচালক ফরিদউদ্দিন এফসিএ, পরিচালক আসাদ খান, কোম্পানি সেক্রেটারি সৈয়দ আবদুল আজিজ এবং অপসারিত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হেমায়েত উল্লাহ।
মামলা দুটি প্রাইম এশিয়া ফাউন্ডেশন এবং পিএফআই প্রোপার্টিজ লিমিটেড নামক দু’টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ১৫৮তম পর্ষদ সভার ভুয়া সার-সংক্ষেপ তৈরি করে সেটির বরাত দিয়ে কোম্পানিটির ৭০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে এই মামলা দায়ের করে দুদক।
এখানে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য যে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের আর্থিক প্রতিবেদনের বর্নিত আয় ব্যয়ের তথ্য পর্যালোচনা করে ২০২০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ‘বীমা দাবি পাচ্ছে না ফারইস্ট ইসলামী লাইফের গ্রাহকরা’ অফিসে গ্রাহকদের উপস্থিতিতে সিকিউরিটি কতৃক নিরিহ গ্রাহকদের মারপিট ও তাড়িয়ে দেওয়াসহ একই বছরে কোম্পানীর ‘সাড়ে ১৪ কোটি টাকার জমিতে বালু ফেলতেই খরচ ১৪২ কোটি টাকা’ খরচ দেখানো মিলিয়ে বিভিন্ন শিরোনামে অনলাইন পোর্টাল অর্থনতির ৩০ দিনবিডিটকম ধারাবাহিক ভাবে ১০/১১টি সংবাদ প্রকাশ করে এবং এসব সংবাদ আমলে নিয়ে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে বিশেষ নিরীক্ষক নিয়োগ ও দুর্নীতির তদন্ত শুরু করে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), সরকারের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) যার ধারাবাহিকতায় ১ সেপ্টেম্বর ২০২১ বীমা কোম্পানিটিতে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ না করলে নয় যে, ২০১২ থেকে ২০১৭সাল পর্যন্ত ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীটিতে লুটপাট, গ্রাহক হয়রানি, অর্থপাচার এবং আত্মস্বাতের মহা উৎসব চলছিল তখন কোম্পানীটির অডিট কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন সম্প্রতি পদত্যাগ করা আইডিআরএ’র সাবেক চেয়ারম্যান ডঃ মোশারফ হোসেন এফসিএ, যিনি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (সিএফও) ছিলেন হেমায়েত উল্লাহ,অদ্য গ্রেফতারকৃত।
২০১২ থেকে ২০১৭সাল পর্যন্ত ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীটিতে লুটপাট, গ্রাহক হয়রানি, অর্থপাচার এবং আত্মস্বাত করে তার সংগ্রহিত অর্থের মাধ্যমেই নজরুল ইসলাম কৌশলে প্রাইম ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যানের পদ অর্জন করেন, এবং ফারইষ্ট ইসলামি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকা নিজস্ব বলয়ের সবাইকে নিয়ে প্রাইম ইন্সু্যরেন্সেও পরিকল্পিত টিম তৈরি করেন।কিন্তু এই পরিকল্না সফল হ্ওয়ার পুর্বেই আইনশৃঙ্খলা বাহীনির হাতে গ্রেফতারের মধ্যমে তার সব পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পরিত হয়।
এখােন সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হল, নজরুল কতৃক ফারইষ্ট লাইফ যেভাবে দেউলিয়া হয়েছে, নজরুল খালেক গং গ্রেফতারের পর কান্ডারি বিহীন প্রাইম ইন্স্যুরেন্সের কি হালবস্থা হবে?
সম্প্রতি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম কতৃক প্রাইম ইন্স্যুরেন্সের জমকালোভাবে উদ্বোদনকৃত (ছবি সংযোজিত) ১০০কোটি টাকার বিনিয়োগের কি অবস্থা তাও খতিয়ে দেখার ব্যপার হয়ে দাড়িয়েছে। গত ৫জুন ২০২২ অর্থনীতির ৩০ দিন বিডিডটকম নিউজ পোর্টালে “প্রাইম ইন্সুরেন্স কোম্পানী কি ফারইষ্ট ইসলামি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পথেই হাঁটছে???” শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর প্রাইম ইন্সুরেন্স কতৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে, এবং আইডিআরএ ও আইনশুঙ্খলা বাহীনির তৎপরতা শুরু হয়, যার ফলশ্রুতিতে বর্তমানের গ্রেফতারের হিড়িক চলে। বর্তমানে নজরুল, খালেক, খালেকপুত্র রুবাইয়াত খালেক এবং হেমায়েত উল্লাহ গ্রেফার হলেও উল্লেখিত বাকিরা কবে নাগাদ গ্রেফতার হবে সেটাই দেখার বিষয়।চিহ্নিত বাকিদের অবস্থা অবস্থান নিয়ে বিস্তারিত আসতেছে….