
৭০ কোটি টাকা যেভাবে আত্মসাৎ,নবগঠিত পরিচালনা পর্যদ মৃত ফারইষ্টকে জীবিত করতে পারার সম্বাবনা কতটুকু ???
খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
গত দশ বছরে ফারইস্ট লাইফে যেভাবে কয়েক হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে তা দেশের পুরু লাইফ বীমা খাতকে একদিকে যেমন চরম হুমকির মুখে দাড় করিয়েছে অপরদিকে জীবনবীমার প্রতি দেশের মানুষের মনে আস্তাহীনতা সৃষ্টি করার সাথে সাথে জীবনবীমার অনুকুলে জমানো টাকা (প্রিমিয়াম) ফেরত পাওয়ার অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এর স্পেশাল অডিট রিপের্টের সুত্র ধরে পত্র-পত্রিকা, অনলাইন এবং বিভিন্ন সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদনে তা উঠে এসেছে। ফারইস্ট ইসলামী লাইফের নজরুল-খালেক এবং মোশারফ-হেমায়ত গংদের লুটপাট রূপকথার গল্পকেও হার মানিয়েছে। হাজার হাজার বীমা গ্রাহককে খাদের কিনারায় দাড় করিয়ে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে যেন তাসের ঘর বানিয়ে রাখে। নজরুল-খালেক এবং মোশারফ-হেমায়েত গংদের দুর্নীতি ও পাচারের দ্বায় বহন করতে গিয়ে কোম্পানীটির বহুলোককে চাকুরি হারাতে হয়েছে। ফারইস্ট ইসলামী লাইফের চাকুরি হারাদের আহাজারি আকাশে-বাতাশে আর্তনাদ সৃষ্টি করলেও নজরুল-খালেক এবং হেমায়েত-মোশারফ গংদের দুর্নীতির মহাউৎসবের নিকট যেন জলে ভাসমান ব্যাঙ্গের উপর বাচ্ছাদের ডিল নিক্ষেপে ব্যাঙ্গগুলি আর্তনাদ করে বলেছিল “ইট ইজ ফানি পর ইউ, বাট দ্যা ডেথ অব আছ” ঠিক সেরকম নিস্ফল পরিহাসে পরিনত হয়েছে।
যেভাবে ৭০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার দ্বায়ে নজরুল, খালেক এবং সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কতৃক অপসারিত এমডি হেমায়েত উল্লাহসহ মোট ৯জনের বিরুদ্ধে গত ৮মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা দায়ের করে। তথ্য অনুযায়ী, প্রাইম এশিয়া ফাউন্ডেশন এবং পিএফআই প্রোপার্টিজ লিমিটেড, (যে প্রতিষ্ঠান দুটি কখনো আলোর মুখ দেখেনি) নামক দু’টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভেঙ্গে দেয়া পরিচালনা পর্ষদ ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ৭০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)’র অনুসন্ধানে, ফারইস্টের ১৫৮তম পর্ষদ সভার ভুয়া সার-সংক্ষেপ তৈরির মাধ্যমে সে সার-সংক্ষেপের বরাত দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হেমায়েত উল্লাহসহ ৯ পরিচালক-কর্মকর্তা পরস্পর যোগসাজশে এ অর্থ হাতিয়ে নেয়ার প্রমান পাওয়া যায়। দুর্নীতি দমন কমিশন, দুদকের নিজস্ব অনুসন্ধান প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পৃথক ২টি মামলা করছে।
মামলার আসামিরা হলেন, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম, সাবেক পরিচালক কে এম খালেদ, অডিট কমিটির চেয়ারম্যান শাহরিয়ার খালেদ, পরিচালক এম এ খালেক, পরিচালক মো. মিজানুর রহমান, পরিচালক ফরিদউদ্দিন এফসিএ, পরিচালক আসাদ খান, কোম্পানি সেক্রেটারি সৈয়দ আব্দুল আজিজ এবং অপসারিত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হেমায়েত উল্লাহ। যিনি বর্তমানে সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পনি লিমিটেড এর প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে চাকুরিতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ(আইডিআরএ) কতৃক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে উচ্ছ আদালতে রিটের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করিয়ে বহাল তবিয়তে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের সিনিয়র উপ-পরিচালক (অনুসন্ধান ও তদন্ত৩) ড. মোহাম্মদ জহিরুল হুদার নেতৃত্বে সহকারি পরিচালক শারিকা ইসলাম ও সহকারি পরিচালক বায়েজিদুর রহমান খানসহ তিন সদস্যের টিম অভিযোগটি অনুসন্ধান করেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রাপ্ত রেকর্ডপত্রের ভিত্তিতে পারষ্পরিক যোগসাজশে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির লিমিটেডের ১৫৮তম পর্ষদ সভার কার্য বিবরণীর ভুয়া সার-সংক্ষেপ তৈরি করে এবং এ সার-সংক্ষেপের বরাত দিয়ে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড এর ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখার, মতিঝিলে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে’র নামে রক্ষিত ২২টি এমটিডিআর জামানত রেখে আত্মসাতের উদ্দেশ্যে পিএফআই প্রপার্টিজ লিমিটেডকে ৪০ কোটি টাকার ঋণ/বিনিয়োগ সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৭০ কোটি ৮৩ লাখ ৬৯ হাজার ৪শ’ ৩৯ টাকা আত্মসাত করেন। যদিও ১৮৬০ সালের দন্ডবিধি ১০৯ ও ৪০৯ ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন,২০১২ এর ৪(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এম এ খালেক, কে এম খালেদ, ফরিদউদ্দিন, মিজানুর রহমান, আসাদ খান এবং এম এ খালেকের পুত্র শাহরিয়ার খালেদ একই সঙ্গে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড এবং প্রাইম এশিয়া ফাউন্ডেশনের পরিচালনা পর্ষদ সদস্য। সুতরাং ফারইস্টের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম, মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হেমায়তে উল্লাহ, কোম্পানি সেক্রেটারি সৈয়দ আবদুল আজিজ এবং ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ও প্রাইম এশিয়া ফাউন্ডেশনের পরিচালক এম এ খালেক, কে এম খালেদ, ফরিদউদ্দিন, মিজানুর রহমান, আসাদ খান ও শাহরিয়ার খালেদ পরষ্পর যোগসাজশের মাধ্যমে আত্মসাতের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রতিষ্ঠানটির ৪০ কোটি টাকা তাদেরই মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান পিএফআই প্রোপার্টিজ লিমিটেডকে ঋণ দিয়েছেন। পরবর্তীতে এ ঋণ পরিশোধ না করে আত্মসাত করেন, যার কারনে ফারইস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের মোট ৭০ কোটি ৮৩ লাখ ৬৯ হাজার ৩৪৯ টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।
২০১৫ থেকে ২০১৮ সালে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের আর্থিক প্রতিবেদনে দেয়া আয় ব্যয়ের তথ্য পর্যালোচনা করে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের গ্রাহকরা বীমার দাবি পাচ্ছে না। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে বিভিন্ন পত্র পত্রিকা এবং অনলাইনে, আয় ও বিনিয়োগের ১৪শ’ কোটি টাকার হদিস নেই এবং জুনে ‘সাড়ে ১৪ কোটি টাকার জমিতে বালু ফেলতেই খরচ ১৪২ কোটি টাকা’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
এসব সংবাদ আমলে নিয়ে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে বিশেষ নিরীক্ষক নিয়োগ ও দুর্নীতির তদন্ত শুরু করে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং সরকারের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এরই ধারাবাহিকতায় ১ সেপ্টেম্বর ২০২১ বীমা কোম্পানিটিতে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।
এখন প্রশ্ন একটাই যে, নবগঠিত পরিচালনা পর্যদ মৃত ফারইষ্টকে জীবিত করতে পারার সম্বাবনা কতটুকু ??? এবং গ্রহক থেকে শুরু করে চাকুরি হারানো কর্মকর্তা কর্মচারিরাসহ অবস্থান হারানো পরিচালকরা কি ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির পুর্ববস্থায় ফিরে যেতে পারবে? নাকি নিজেরা আবার পুর্বসুরিদের পথেই নিজেদের তৈরি করার অবস্থান সৃষ্টি করবে….












